মাওলানা মওদুদী রহঃ ও আয়তুল্লাহ খোমেইনি রহঃ একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
রাষ্ট্রচিন্তা, বিপ্লব-কৌশল, ইসলামি আইন এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
সাইফুল খান
ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে মাওলানা সাইয়িদ আবুল আ’লা মওদুদী (১৯০৩–১৯৭৯) এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি (আনু. ১৯০২–১৯৮৯) দুটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পর-সংলাপী মেরু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন সুন্নি উপমহাদেশীয় আলেম ও সংগঠক, অন্যজন শিয়া ইরানি ফকিহ ও ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ।
উভয়ই একই ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের চ্যালেঞ্জের বিপরীতে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন।
তাঁদের মধ্যে সাদৃশ্য এতটাই গভীর যে অনেক গবেষক মনে করেন খোমেইনি, মওদুদীর চিন্তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। যদিও প্রত্যক্ষ প্রভাবের প্রমাণ খুবই সীমিত এবং বহু গবেষক একে ‘সমান্তরাল বিকাশ’ বলতে বেশি পছন্দ করেন। পার্থক্যও তেমনই তীক্ষ্ণ। সুন্নি-শিয়া ধর্মতত্ত্বের ভিন্ন ভিত্তি, রাজনৈতিক কৌশলের ভিন্ন পথ এবং ক্ষমতা অর্জনের ভিন্ন পরিণতি তাঁদের দুটি আলাদা কিন্তু সমান্তরাল বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি করে তুলেছে। তবে এখানে একটি জরুরি কথা বলে নেওয়া দরকার। দুই চিন্তাবিদের মধ্যে যে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়, তা প্রায়ই একটি সাম্প্রদায়িক বৈরিতার আয়নায় দেখা হয়। যেখানে মওদুদীকে সুন্নি বিশ্বের ‘আদর্শ’ আর খোমেইনিকে শিয়া বিশ্বের ‘আদর্শ’ হিসেবে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রবন্ধে আমরা সেই কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে দেখার চেষ্টা করবো। দুজনেই মুসলিম সভ্যতার সংকটের সন্তান। দুজনেই ইসলামি চিন্তার গভীর ঐতিহ্য থেকে জ্ঞান সুধা পান করেছেন এবং দুজনেই নিজ নিজ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আধুনিক মুসলিম চিন্তার ইতিহাসে অবিসংবাদিত মহামূল্যের দুটি কণ্ঠস্বর।
এই প্রবন্ধে আমরা চারটি মূল অক্ষ বরাবর এই দুই চিন্তাবিদকে তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করব: রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব; বিপ্লব ও পরিবর্তনের কৌশল; ইসলামি আইন ও শাসনব্যবস্থার রূপকল্প; এবং দুজনের ঐতিহাসিক প্রভাব ও উত্তরাধিকার।
প্রথম অধ্যায়: রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব
মওদুদীর ‘হাকিমিয়্যাহ’ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব
মাওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ‘হাকিমিয়্যাহ’ বা সার্বভৌমত্বের ধারণা। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। কোনো ব্যক্তি, দল বা জাতি-রাষ্ট্রের নয়। তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘ইসলামি রিয়াসত’-সহ একাধিক রচনায় যুক্তি দেন যে গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র এবং কমিউনিজম সবই মানবিক সার্বভৌমত্বের দাবিদার। তাই সবই ইসলামের সাথে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
মাওলানা মওদুদী ‘থিওডেমোক্র্যাসি’ বা ‘ইলাহি গণতন্ত্র’ ধারনা দেন। যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর সীমার মধ্যে থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠী নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারবে, কিন্তু আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত উৎস থাকবে ঐশীগ্রন্থ। এটি বিশুদ্ধ জনগণতন্ত্রও নয়, আবার কোনো ধর্মীয় অভিজাততন্ত্রও নয়। বরং একটি মধ্যবর্তী মডেল, যেখানে খিলাফতের ধারণাটি আধুনিক সাংবিধানিক কাঠামোয় পুনর্নির্মিত।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, মওদুদী কোনো বিশেষ আলেম-শ্রেণির একচেটিয়া শাসনাধিকারকেও স্বীকৃতি দেননি। যদিও সমালোচকরা বলেন মওদুদীর ইসলাম বা মওদুদীবাদ। যেহেতু তিনি কাউকেই একচেটিয়া স্বীকৃতি দেননি এমনকি তার দলের আলেমদেরকেও নয়। তাহলে আক্বিদার নামে তার প্রতি ঘৃনা ছড়ানোকে দুইভাবে দেখা যেতে পারে। এক. মওদুদীর কমিউনাল ইসলাম বিরোধী মনোভাব কমিউনাল ইসলামিষ্টদের স্বার্থে আঘাত করে। দুই. মওদুদী সম্পর্কে তাদের গভীর পড়াশোনা নেই। মাওলানা মওদুদীর মতে, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যে কোনো যোগ্য মুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ নিতে পারেন। এই দিকটিই তাঁকে খোমেইনির চিন্তা থেকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে আলাদা করে। মওদুদী মনে করতেন, ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয় স্বয়ং শরিয়া। এই কারণেই তাঁর দর্শনকে অনেকে ‘আইনের শাসন’-এর ইসলামি সংস্করণ বলে মূল্যায়ন করেন।
খোমেইনির ‘ভেলায়েতে ফকিহ’ ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্ব
খোমেইনির রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর হলো ‘ভেলায়েত-এ ফকিহ’ বা ‘ফকিহের অভিভাবকত্ব’। ১৯৭০ সালে নাজাফে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতামালায় (২১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০; পরে ‘হুকুমত-এ ইসলামি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত) তিনি যুক্তি দেন যে ইমামের অনুপস্থিতিতে শিয়া ধর্মতত্ত্বে ‘গায়বতের যুগে’ সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে সর্বোচ্চ যোগ্য ইসলামি আইনজ্ঞের হাতে। এই ধারণাটি শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি বৈপ্লবিক পুনর্ব্যাখ্যা। ঐতিহ্যগতভাবে শিয়া ফকিহরা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতেন। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল অনুপস্থিত ইমামের অধিকার। খোমেইনি এই ঐতিহ্যকে উল্টে দিয়ে বললেন: ইমামের অনুপস্থিতিই রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য ফকিহের অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে তোলে। এই যুক্তির মূল শক্তি শিয়া চিন্তার ভেতর থেকেই উঠে এসেছে। এটি বাইরে থেকে আমদানি করা ধারণা নয়। এই তত্ত্বটি ১৯৭৯ সালের ইরানি সংবিধানে রূপান্তরিত হয় এবং সর্বোচ্চ নেতার (রাহবার) পদটি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির উপরে স্থাপিত হয়। এই নতুন ধারনাটি অনন্য সাংবিধানিক কাঠামো যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তুলনাহীন
তুলনামূলক পর্যালোচনা
দুটি তত্ত্বই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ঐশী কর্তৃত্বকে রাজনীতির কেন্দ্রে রাখে। এই মৌলিক ঐক্যটুকু বোঝা দরকার। তবে পার্থক্য গভীর। মওদুদীর ‘হাকিমিয়্যাহ’ তত্ত্বে কোনো বিশেষ মানবীয় কর্তৃপক্ষকে সার্বভৌম করা হয়নি, বরং আইন (কুরআন-সুন্নাহ) সার্বভৌম। যা একটি আইনের শাসনের ধারণার কাছাকাছি। পক্ষান্তরে, খোমেইনির তত্ত্বে ফকিহ নামক একটি মানবীয় প্রতিষ্ঠান সার্বভৌম ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে। যা একটি ধর্মীয় অভিজাততন্ত্রের কাছাকাছি।
তবে এই পার্থক্যকে ‘ভালো বনাম খারাপ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মওদুদীর দর্শনে প্রশ্ন থাকে: শরিয়ার ব্যাখ্যার দায়িত্ব কে নেবে, যদি কোনো বিশেষ শ্রেণি না থাকে? খোমেইনির দর্শনে প্রশ্ন থাকে: ফকিহের ক্ষমতার জবাবদিহিতার কাঠামো কী? এই দুটি প্রশ্নই আজও প্রাসঙ্গিক এবং উভয় চিন্তাবিদই নিজ নিজ কাঠামোয় এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাদের উত্তর একই ছিল না, কিন্তু প্রশ্নটি ছিল এক।
বিখ্যাত গবেষক Seyyed Vali Reza Nasr তাঁর ‘Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism’ (১৯৯৬) গ্রন্থে দেখান যে মওদুদীর হাকিমিয়্যাহ ধারণা পরবর্তীকালে সাইয়্যিদ কুতুবের মাধ্যমে আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে জিহাদি মতাদর্শ একটি অংশে পৌঁছায় যা মওদুদী নিজে কখনো চাননি। বরং সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করতেন। অন্যদিকে খোমেইনির ভেলায়েত-এ ফকিহ একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক রূপ পেয়েছে এবং ইরান ছাড়া অন্য কোনো দেশে সরাসরি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বিপ্লব ও পরিবর্তনের কৌশল
মওদুদীর সংস্কার-পথ: ধৈর্যশীল সভ্যতামূলক রূপান্তর
মওদুদী বিশ্বাস করতেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো মুসলিম সমাজের আদর্শিক ও নৈতিক পুনর্গঠন। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের পথ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ‘দাওয়াহ’ ও ‘তারবিয়াহ’ অর্থাৎ প্রচার ও প্রশিক্ষণ কে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার মনে করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, পরিবর্তন যত দ্রুত হয়, তা তত স্বল্পস্থায়ী। তাই ‘ধাপে ধাপে’ এবং ‘ধৈর্যের সাথে’ পথ চলার কথা বলেছেন।
১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী এই দর্শনের সাংগঠনিক প্রকাশ। মওদুদী সংগঠনটিকে একটি অভিজাত ক্যাডার-দল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে সদস্যপদ কঠোর মানদণ্ডের বিষয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রথমে একটি ইসলামি-মানস সম্পন্ন মধ্যবর্তী শ্রেণি তৈরি করা, যারা ক্রমে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনে ভূমিকা নেবে। এই কৌশল সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে এর নিজস্ব যুক্তি আছে। এই প্রকল্প বাংলাদেশে মোটামুটি সফল।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে মওদুদী মুসলিম লীগের বিষয়ে সংশয়ী ছিলেন এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা মনে করতেন, মূল লক্ষ্য নয়। তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতামূলক প্রকল্প। কোনো নির্বাচনে জেতার বিষয় নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে কখনো কখনো অবাস্তববাদী মনে করিয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ছিল।
খোমেইনির বিপ্লবী কৌশল: জনআন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় রূপান্তর
খোমেইনির রাজনৈতিক কৌশল ছিল মওদুদীর তুলনায় অনেক বেশি সরাসরি এবং বিপ্লবমুখী। তিনি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে শাহের স্বৈরতন্ত্রকে সরাসরি ‘তাগুত’ (অন্যায় শাসন) হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তার পতন ঘটানোকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
১৯৬৪ সালে নভেম্বরে ইরান থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর থেকে ১৯৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নির্বাসনে থেকেও খোমেইনি ক্যাসেট টেপ ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানে তাঁর বার্তা পাঠিয়েছেন। এমন একটি উদ্ভাবনী কৌশল যা আধুনিক মিডিয়ার রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি প্রাথমিক উদাহরণ। তিনি প্রথমে তুরস্কে, পরে ইরাকের নাজাফে এবং সবশেষে ফ্রান্সের নভোফল-লে-শাতোতে অবস্থান করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি যে গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, তাতে ধর্মীয় আলেম, বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং বাজারি ব্যবসায়ী সবাই একসাথে ছিলেন।
এখানে খোমেইনির অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভার কথা বলা দরকার। তিনি বিপরীত মেরুর শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন শাহ-বিরোধিতার একটি সাধারণ ছাদের নিচে। এটি নিছক চালাকি ছিল না। ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রকাশ যা শিয়া ঐতিহ্যের মজলুম-কেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বকে আধুনিক বিপ্লবী রাজনীতির সাথে সফলভাবে মিলিয়েছিল।
খোমেইনির সাফল্যের পরে বিপ্লবের ফল ক্রমে ইসলামপন্থীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। যা পরবর্তীতে বাম ও উদারপন্থী মিত্রদের সাথে তীব্র দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। এই ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনা যেমন ন্যায়সঙ্গত, তেমনি এটাও বোঝা দরকার। যে যেকোনো বিপ্লবের পরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া। যা বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তির সাথে সবসময় সংগতিপূর্ণ থাকে না।
তুলনামূলক পর্যালোচনা
দুজনের কৌশলের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো: মওদুদী সমাজকে প্রস্তুত করে তারপর রাষ্ট্র পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন ‘নিচ থেকে উপরের’ পরিবর্তন। খোমেইনি রাষ্ট্রকে আগে দখল করে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন ‘উপর থেকে নিচে’। মওদুদী তাঁর জীবদ্দশায় রাষ্ট্রক্ষমতা পাননি; খোমেইনি পেয়েছিলেন এবং এই পার্থক্যটিই তাঁদের আদর্শের বাস্তব পরীক্ষার ভিন্ন শর্ত তৈরি করেছে।
অ্যামেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী (John Esposito, Islam & politics ১৯৮৪) রচনায় এই পার্থক্যকে ইসলামি আন্দোলনের দুটি মূল ধারার প্রতীক হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন: সংস্কারবাদী ও বিপ্লববাদী। মওদুদীর উত্তরসূরিরা মূলত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন; খোমেইনির উত্তরসূরিরা একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।
কিন্তু এখানে অতি-সরলীকরণের বিপদ আছে। মওদুদী কৌশলগতভাবে সংস্কারবাদী ছিলেন, কিন্তু মতাদর্শগতভাবে তিনিও বিপ্লবী ছিলেন। তিনি সমগ্র জাহিলিয়া-ব্যবস্থার উচ্ছেদ চাইতেন। আবার খোমেইনি বিপ্লবী ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাঁকে অনেক বাস্তববাদী আপোষ করতে হয়েছিল। তাই ‘সংস্কারবাদী বনাম বিপ্লববাদী’ বিভাজনটি বিশ্লেষণের শুরু, শেষ নয়। বিপ্লবের পরে অনেক সংস্কার তিনি করেছেন।
তৃতীয় অধ্যায়: ইসলামি আইন ও শাসনব্যবস্থার রূপকল্প
মওদুদীর ইসলামি রাষ্ট্রের কাঠামো
মওদুদীর কল্পিত ইসলামি রাষ্ট্রে শরিয়া হবে সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু শরিয়ার ব্যাখ্যার জন্য তিনি কোনো নির্দিষ্ট আলেম-শ্রেণিকে একচেটিয়া অধিকার দিতে চাননি। তাঁর মতে, উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো মুসলিম ইজতিহাদ করতে পারেন। এটি একটি অপেক্ষাকৃত উদার এবং গণতান্ত্রিক অবস্থান।
তিনি একটি নির্বাচিত আইনসভার পক্ষে ছিলেন। তবে সেই আইনসভার সকল আইন কুরআন-সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা যাচাই করার জন্য একটি স্বাধীন ইসলামি আদালতের কথা বলেছেন। যা আধুনিক সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মওদুদীর এই কাঠামো পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়াত আদালতের ধারণাকে আংশিকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, যদিও সেই প্রতিষ্ঠানটি মওদুদীর কল্পনা থেকে ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে।
তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনে সুদ নিষিদ্ধ। জাকাত বাধ্যতামূলক এবং ব্যক্তিগত সম্পদের স্বীকৃতি আছে। তবে ধনী-দরিদ্রের অত্যধিক বৈষম্যকে তিনি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য মনে করতেন। এই দিক থেকে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তায় একটি ন্যায়বিচারমুখী মাত্রা আছে যা অনেক সময় সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় না।
খোমেইনির শাসন-মডেল: দ্বৈত কর্তৃত্বের কাঠামো
ইরানের ১৯৭৯ সালের সংবিধান যা মূলত খোমেইনির তত্ত্বের সাংবিধানিক রূপায়ণ একটি অনন্য দ্বৈত কাঠামো তৈরি করেছে। একদিকে রয়েছে নির্বাচিত সরকার (রাষ্ট্রপতি, সংসদ), অন্যদিকে রয়েছে নিয়োগপ্রাপ্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (সর্বোচ্চ নেতা বা রাহবার, অভিভাবক পরিষদ) এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির উপরে।
শুরায়ে নেগাহবান বা অভিভাবক পরিষদ যেকোনো সংসদীয় আইনকে ইসলামি মানদণ্ডে বাতিল করতে পারে। সর্বোচ্চ নেতা সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ এবং সম্প্রচার মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ধর্মীয় অভিজাত শ্রেণি কার্যত অনির্বাচনযোগ্য।
খোমেইনি তাঁর শেষ বছরগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণের প্রয়োজনে (মাসলাহাত) প্রথাগত শরিয়ার কিছু বিধান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে মজমা-এ তাশখিস-এ মাসলাহাত (রাষ্ট্রীয় কল্যাণ পরিষদ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই নমনীয়তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এটি ছিল ঐতিহ্যবাদী আলেমদের জন্য একটি চমকের মতো এবং দেখায় যে ক্ষমতায় থেকে খোমেইনি কতটা বাস্তববাদী হয়ে উঠেছিলেন। এটা ছিলো এক ধরনের সংস্কার।
তুলনামূলক পর্যালোচনা
উভয় চিন্তাবিদই ইসলামি আইনের আধুনিক রাষ্ট্রে প্রয়োগের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে তাঁদের ভিশন স্পষ্টতই আলাদা। মওদুদীর মডেলে শরিয়া একটি সাংবিধানিক সীমা হিসেবে কাজ করে, নির্বাচিত সরকার সেই সীমার মধ্যে কাজ করে। খোমেইনির মডেলে শরিয়ার ব্যাখ্যাকারী ফকিহ নিজেই রাষ্ট্রপ্রধানের উপরে এবং কার্যত অপ্রশ্নযোগ্য।
গবেষক Abdulaziz Sachedina ‘The Just Ruler in Shia Islam’ (১৯৮৮) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে খোমেইনির ভেলায়েত-এ ফকিহ শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি নতুন, বিতর্কিত এবং ঐতিহ্যের সাথে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কে দাঁড়ানো ব্যাখ্যা। নাজাফের প্রভাবশালী শিয়া মারজা যেমন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবুল কাসেম আল-খুই এবং পরে আলি সিস্তানি ভেলায়েত-এ ফকিহের এই রাজনৈতিক রূপটিকে স্বীকার করেননি। এই বিষয়ে শিয়া মারজাদের মধ্যে এখনো গভীর মতবিরোধ বিদ্যমান। তারা সংস্কার মানতে পারেননি। যেমনটা মওদুদীর বেলায় ঘটেছে উপমহাদেশে।
উভয় চিন্তাবিদই মনে করতেন ইসলামি আইন একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। যা সমাজের বাস্তবতার সাথে সংলাপে থেকে বিকশিত হতে পারে। মওদুদীর ইজতিহাদ-কেন্দ্রিক অবস্থান এবং খোমেইনির মাসলাহাত-ভিত্তিক নমনীয়তা উভয়ই ইসলামি আইনের এই জীবনীশক্তির স্বীকৃতি।
চতুর্থ অধ্যায়: ঐতিহাসিক প্রভাব ও উত্তরাধিকার
মওদুদীর উত্তরাধিকার: বৈশ্বিক সুন্নি আন্দোলনে রেখাপাত
মওদুদীর সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সুন্নি ইসলামি আন্দোলনে। মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন (মুসলিম ব্রাদারহুড) এবং মওদুদীর জামায়াতে ইসলামী এই দুটি সংগঠন পরস্পরের সমসাময়িক এবং উভয়ই একে অপরকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষত মওদুদীর ‘হাকিমিয়্যাহ’ ধারণা সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর ‘মা’আলিম ফি-ত-তরিক’ (১৯৬৪) গ্রন্থে গ্রহণ করেছেন এবং তাকে আরও তীক্ষ্ণ ও বিপ্লবী রূপ দিয়েছেন। তবে এই রূপান্তরের জন্য মওদুদীকে দায়ী করা সঠিক নয়। মওদুদী নিজে সশস্ত্র জিহাদ ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপের বিরোধী ছিলেন।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এই দেশগুলোতে মওদুদী-প্রভাবিত সংগঠনসমূহ আজও সক্রিয়। তুরস্কের ইসলামি আন্দোলনেও মওদুদীর পরোক্ষ ছাপ লক্ষণীয়। তাঁর তাফসির ‘তাফহিমুল কুরআন’ সুন্নি বিশ্বে ব্যাপকভাবে পঠিত ও প্রভাবশালী একটি রচনা যা ধর্মতত্ত্বের বাইরে রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে তাফসিরের সাথে অভূতপূর্বভাবে মেলায়।
মওদুদীর বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার বৈচিত্র্যময় ও বহুস্তরীয়। তাঁর রচনাসমূহ পরবর্তী প্রজন্মের ইসলামি চিন্তাবিদ ও সংগঠকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যা একজন গভীরপ্রভাবশালী চিন্তাবিদের স্বাভাবিক পরিণতি। ১৯৭৯ সালে তিনি সর্বপ্রথম সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান। ইসলামি বিশ্বের এই সর্বোচ্চ সম্মানটি তাঁর জীবনের শেষ বছরে এসেছিল।
খোমেইনির উত্তরাধিকার: বিপ্লব, রাষ্ট্র এবং প্রশ্নচিহ্ন
খোমেইনির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান উত্তরাধিকার হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। একটি রাষ্ট্র যা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর মডেলে পরিচালিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করেছে যে ইসলামি বিপ্লব কেবল ক্ষমতা দখল করতে পারে না। একটি আধুনিক রাষ্ট্র চালাতেও পারে। তবে এই চালানোর প্রক্রিয়ায় অনেক মূল আদর্শের সাথে টানাপোড়েন হয়েছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছিল সুন্নি-শিয়া নির্বিশেষে। বিশেষত বিশ্বের নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে এই বার্তা গিয়েছিল যে পশ্চিমা-সমর্থিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি ইসলামি বিপ্লব সম্ভব। কিন্তু ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮), ইসরায়েল – আমেরিকার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং মিডলইস্টের অভ্যন্তরীণ দমননীতি ধীরে ধীরে সেই উদ্দীপনাকে জটিল করে তুলেছে।
হিজবুল্লাহ (লেবানন) ইরানের বিপ্লবী মডেল দ্বারা আদর্শিকভাবে প্রভাবিত। এটি ইরানের প্রভাবের একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। হামাস (ফিলিস্তিন) মূলত ইখওয়ানুল মুসলিমিন ঘরানার সুন্নি সংগঠন হলেও ইরানের সাথে তার কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান। যা সুন্নি-শিয়া বিভাজনকে ছাপিয়ে কৌশলগত সংহতির একটি উদাহরণ।
সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি হলো, খোমেইনির রাষ্ট্র কি তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? পশ্চিমের প্রত্যক্ষ মদদে ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছে। তা দেখায় যে জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম যারা পশ্চিমা সংস্কৃতি লালন করে। তারা ভেলায়েত-এ ফকিহ মডেলের প্রশ্নে গভীরভাবে বিভক্ত। কিন্তু এই প্রশ্নটি খোমেইনির মূল চিন্তাকে কোনভাবেই নাকচ করে না। বরং নাগরিকের স্বাধীন চিন্তার অধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা ও মূল আদর্শের মধ্যকার ব্যবধানটিকে সামনে আনে।
পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রভাব: একটি পুনর্মূল্যায়ন
দুই চিন্তাবিদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত। তবে এটি জানা যায় যে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে মওদুদীর বেশ কয়েকটি রচনা ফার্সিতে অনুদিত হয়েছিল এবং ইরানি ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সেগুলো পড়তেন। Moin Baqer-এর ‘Khomeini: Life of the Ayatollah’ (১৯৯৪) এবং অন্যান্য জীবনীতে উল্লেখ আছে যে ১৯৬০-এর দশকে নাজাফে মওদুদীর লেখার আলোচনা ছিল।
আলী শরীয়াতির চিন্তা যা খোমেইনির চেয়ে ভিন্নধারার হলেও বিপ্লবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি মূলত Fanon ও সার্ত্রের প্রভাবে গড়া; তবে ইসলামি পুনরুত্থানের প্রশ্নে তাঁর এবং মওদুদীর মধ্যে কিছু মিল ছিল। শরীয়তির লেখায় মওদুদীর কিছুটা প্রভাব বিদ্যমান।
গবেষক Hamid Algar, যিনি খোমেইনির অনেক রচনা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এবং যিনি স্বয়ং ইরানি বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল একজন পণ্ডিত। তিনি মনে করেন দুই চিন্তাবিদের মধ্যে প্রত্যক্ষ ঋণগ্রহণের চেয়ে বরং একই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে একই ধরনের প্রশ্নের ভিন্ন উত্তর খোঁজার একটি সমান্তরাল প্রবণতা লক্ষণীয়।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: সাদৃশ্য মানেই প্রভাব নয়। একই সময়ে একই সংকটের মুখে দাঁড়ানো দুটি মেধাবী মন একই ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারে, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে।
পরিশেষ
মওদুদী এবং খোমেইনি উভয়ই একটি মুসলিম সভ্যতার সংকট থেকে উঠে এসেছেন, উভয়ই ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ধর্ম নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তাঁদের পথ, পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল ভিন্ন।
মওদুদী স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে পরীক্ষা করার সুযোগ পাননি। খোমেইনি বিপ্লব করেছেন এবং সেই বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির জবাবদিহিতাও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দিতে হচ্ছে। এই অর্থে, মওদুদীর আদর্শ এখনো অনেকটা নিরীক্ষিত সম্ভাবনার মতো। যখন খোমেইনির আদর্শ একটি পরীক্ষিত বাস্তবতা, যার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই দৃশ্যমান।
তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দুই চিন্তাবিদ বিংশ শতাব্দীর ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার দুটি মূল প্রশ্নের প্রতিনিধিত্ব করেন: ইসলামি রাষ্ট্র কি ক্রমবিকাশমূলক সংস্কারের মাধ্যমে আসতে পারে, নাকি বিপ্লবই একমাত্র পথ? এবং সেই রাষ্ট্রে কর্তৃত্ব কার ঐশী আইনের, নাকি সেই আইনের ব্যাখ্যাকারীর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একবিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বেও সমান প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু এই বিশ্লেষণের শেষে একটি কথা বলা দরকার। মওদুদী ও খোমেইনির পার্থক্য সুন্নি-শিয়া বিভাজনকে আরও গভীর করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল। দুজনই মুসলিম উম্মার পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দুজনের তত্ত্বেই দুর্বলতা আছে, দুজনের তত্ত্বেই শক্তি আছে। তাঁদের একে অপরের বিরোধী হিসেবে নয় — বরং একই মহাসংকটের দুটি সাহসী প্রতিক্রিয়া হিসেবে পড়তে পারলে আমরা উভয়ের কাছ থেকেই অনেক বেশি শিখতে পারব।
একবিংশ শতাব্দীর মুসলিম চিন্তাবিদদের কাজ হবে এই দুটি ঐতিহ্যের মধ্যে একটি সৃজনশীল সংলাপ তৈরি করা যেখানে মওদুদীর আইনের শাসনের নীতি এবং খোমেইনির রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ধারণা একসাথে কাজ করতে পারে। যেখানে সুন্নি ও শিয়া উভয় ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি পরস্পরকে শক্তিশালী করে। এই সংলাপই আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মূল গ্রন্থপঞ্জি
• Nasr, Seyyed Vali Reza. Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism. Oxford University Press, 1996.
• Algar, Hamid (trans.). Islam and Revolution: Writings and Declarations of Imam Khomeini. Mizan Press, 1981.
• Sachedina, Abdulaziz. The Just Ruler in Shia Islam. Oxford University Press, 1988.
• Esposito, John L. Islam and Politics. Syracuse University Press, 1984.
• Moin, Baqer. Khomeini: Life of the Ayatollah. I.B. Tauris, 1999.
• Mawdudi, Sayyid Abul Ala. Islamic Law and Constitution. Islamic Publications, 1955.
• Khomeini, Ruhollah. Hokumat-e Islami: Velayat-e Faqih. 1970 (Najaf lectures).
• Qutb, Sayyid. Ma’alim fi-t-Tariq (Milestones). 1964.
• Adams, Charles J. ‘Mawdudi and the Islamic State.’ in Esposito (ed.), Voices of Resurgent Islam. Oxford University Press, 1983.
• Martin, Vanessa. Creating an Islamic State: Khomeini and the Making of a New Iran. I.B. Tauris, 2003.
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
