ইউরোপ ও আমেরিকার শিল্পকাঠামো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সুনির্দিষ্ট প্রভাব
বিশ্লেষণ ও গবেষণা
সাইফুল খান
একটি চোকপয়েন্টের ভূগোল
পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু জায়গা আছে যেগুলো শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক সভ্যতার অক্সিজেন সার্কুলেশন পাইপ। হরমুজ প্রণালী তেমনই একটি জায়গা। ইরান ও ওমানের মাঝখানে মাত্র ৩৩ থেকে ৫৫ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ। পাশাপাশি এই পথে যায় বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ, মূলত কাতার থেকে। শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক সার রপ্তানির প্রায় ৩৩ শতাংশ, অ্যামোনিয়ার মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ এবং ইউরিয়ার ৫০ শতাংশও এই প্রণালীর ভেতর দিয়ে যায়।
২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র পর ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালীটিকে সামরিক নিষেধাজ্ঞা এলাকা ঘোষণা করে এবং প্রায় পুরোপুরিভাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ ট্যাংকার যান চলাচল প্রথমে ৭০ শতাংশ, পরে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। ২১টি বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ নিশ্চিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পরিস্থিতিটিকে বলেছে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট’। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ ডালাসের হিসাব অনুযায়ী, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদী হলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বার্ষিক হিসেবে ২.৯ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
প্রথম আঘাত: ইউরোপের শিল্পকাঠামোর ভাঙন
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ অনেক কষ্ট করে রুশ গ্যাসের বিকল্প খুঁজে বের করেছিল এবং সেই বিকল্পের বড় একটি স্তম্ভ হয়ে উঠেছিল কাতারের এলএনজি। কিন্তু এখন সেই বিকল্পও বন্ধ। ইউরোপ কাতার থেকে মোট গ্যাস আমদানির ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পেত। ২০২৫-২৬ সালের কঠিন শীতের পর ইউরোপের গ্যাস মজুদ ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ। যা স্বাভাবিক মৌসুমী গড়ের চেয়ে অনেক নিচে।
ফলস্বরূপ ডাচ টিটিএফ গ্যাস বেঞ্চমার্ক মার্চের মাঝামাঝি ৬০ ইউরো/মেগাওয়াট আওয়ারের উপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মানি, ইতালি, গ্রিস, স্পেন এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো তীব্র চাপে পড়েছে। ইউনাইটেড কিংডমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে, যা জার্মানির ১৭ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। ব্রিটিশ মুদ্রাস্ফীতি ২০২৬ সালে ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
পেট্রোকেমিক্যাল ও ভারী শিল্প: কাঁচামালের মৃত্যু
হরমুজ প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পলিথিলিন রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ যায়। এই পলিথিলিন হলো প্লাস্টিক শিল্পের মেরুদণ্ড, যা প্যাকেজিং, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং ভোগ্যপণ্য তৈরিতে অপরিহার্য। উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক উষা হ্যালে বলেছেন, সরবরাহ বিঘ্নিত হলে প্যাকেজিং, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং ভোগ্যপণ্যের মূল্য দ্রুত বাড়তে শুরু করবে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় রাসায়নিক ও ইস্পাত কারখানাগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মেটাতে পণ্যের উপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করেছে।
জার্মানির BASF-এর মতো বিশ্বের বৃহত্তম রাসায়নিক কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস একই সাথে এই কারখানাগুলোর শক্তির উৎস এবং কাঁচামাল, তাই জ্বালানির দাম বাড়া মানে তাদের সমস্যা দ্বিগুণ হওয়া। যদি সংকট গ্রীষ্মের ‘রিফিল সিজন’ পর্যন্ত চলে, তাহলে পরের শীতের আগে ইউরোপের গ্যাস মজুদ পূর্ণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ এশিয়ার ক্রেতারাও একই সংকুচিত সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা করবে।
অটোমোবাইল শিল্প: সরবরাহ শৃঙ্খলের বিপর্যয়
ইউরোপের গাড়ি শিল্প ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ উৎপাদন মডেলে চলে। অর্থাৎ প্রতিটি যন্ত্রাংশ ঠিক যখন দরকার, তখনই কারখানায় পৌঁছায়। এই মডেলে কোনো বাফার নেই। S&P গ্লোবাল মোবিলিটির বিশ্লেষক স্টেফানি ব্রিনলি সতর্ক করেছেন যে এশিয়া থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ সবচেয়ে দ্রুত ঝুঁকিতে পড়বে। হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথে জাহাজ ঘুরিয়ে দিলে পরিবহন সময় কয়েক সপ্তাহ বেড়ে যাবে এবং সামুদ্রিক যুদ্ধ-ঝুঁকি বীমার খরচ মার্চ মাসে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে!
তুরস্ক ইউরোপীয় অটো বাজারের জন্য হালকা বাণিজ্যিক যানবাহনের একটি বড় সরবরাহকারী দেশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ শৃঙ্খল-বিঘ্ন সবার আগে তুরস্কের উৎপাদনকে প্রভাবিত করবে। Volkswagen, BMW, Stellantis এবং Renault-এর মতো কোম্পানির জন্য এর অর্থ হলো উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাপক হ্রাস। একইসাথে চাহিদার দিক থেকেও সংকোচন হবে, কারণ জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের গাড়ি কেনার সামর্থ্য কমবে।
সার ও কৃষি: খাদ্য নিরাপত্তার মোড়কে ভিন্ন সংকট
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় ১৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সালফার সরবরাহের ৪৫ শতাংশ যায়। সালফার -মেটাল লিচিং, সালফিউরিক অ্যাসিড এবং সার উৎপাদনে অপরিহার্য উপাদান। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে এই সংকট ২০২২ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইউরোপের কৃষিকাজ যদি সঠিক পরিমাণে সার না পায়, তাহলে আগামী মৌসুমে ফসল উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হবে, যা খাদ্যমূল্য আরও বাড়িয়ে দেবে।
দ্বিতীয় আঘাত: আমেরিকান অর্থনীতির ভেতরের ক্ষত
আমেরিকা নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের সরাসরি তেল আমদানি প্রতিদিন ৯ লক্ষ ব্যারেলের কম। কিন্তু তেলের বাজার বৈশ্বিক। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আমেরিকার ভেতরেও দাম বাড়বে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাক্স পূর্বাভাস দিচ্ছে, সংকট দীর্ঘ হলে মার্কিন পেট্রোলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৩.৫০ ডলারে পৌঁছাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হবে।
আমেরিকার অর্থনীতি মূলত ভোক্তা ব্যয়নির্ভর। দেশটির জিডিপির ৭০ শতাংশ আসে সাধারণ নাগরিকদের কেনাকাটা থেকে। পেট্রোল ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হলে মানুষের হাতে অন্য কিছু কেনার মতো অর্থ কমে যাবে। এই চাপ সরাসরি Walmart এবং Amazon-এর মতো বৃহৎ খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসায় আঘাত করবে। মাসিক মুদ্রাস্ফীতির তথ্যে এরই মধ্যে এই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এভিয়েশন ও লজিস্টিক: আকাশপথের বিপদ
জ্বালানি খরচ এয়ারলাইন শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় পরিচালন ব্যয়। হরমুজ সংকটের পর থেকে Delta, American Airlines-সহ বড় মার্কিন বিমান সংস্থাগুলো তাদের শেয়ারের দরপতনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন এয়ারলাইন শেয়ারগুলো এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় এবং মাসিক পতনের পথে। বড় কার্গো জাহাজগুলো প্রতিদিন ২ লক্ষ গ্যালন পর্যন্ত ডিজেল পোড়ায় এবং তাদের বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার ফলে জাহাজপ্রতি পরিবহন খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে।
ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেমিকন্ডাক্টর: অদৃশ্য সংকট
হিলিয়াম সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের একটি অপরিহার্য উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশ্বের হিলিয়াম সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের উৎস। হরমুজ বন্ধ হওয়ায় এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মডি’জের সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই কুইন-বারাবানভ বলেছেন, অধিকাংশ পণ্যের মজুদ মাত্র কয়েক সপ্তাহের। তাই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ঘাটতি দ্রুত দৃশ্যমান হবে। এর অর্থ হলো Apple, Tesla বা Nvidia-র মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যদি একদিকে চিপ পায়ও, অন্যদিকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতিতে পড়তে পারে।
তৃতীয় আঘাত: শেয়ারবাজারের ‘স্টেগফ্লেশন ট্র্যাপ’
হরমুজ সংকটের শুরু থেকেই শেয়ারবাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্চের ২ তারিখেই ডাও জোন্স ৪০০ পয়েন্টেরও বেশি পড়েছে এবং S&P ৫০০ সূচক ০.৭ শতাংশ কমেছে। ৩রা মার্চ থেকে ২০শে মার্চের মধ্যে S&P ৫০০ সূচক ৬,৮১৬.৬৩ থেকে ৬,৫০৬.৪৮-তে নেমেছে, অর্থাৎ প্রায় ৪.৫৫ শতাংশ পতন হয়েছে। ইউরোপেও একই চিত্র: জার্মানির DAX ১.৭৭ শতাংশ, ফ্রান্সের CAC 40 প্রায় ১.৪ শতাংশ এবং ব্রিটেনের FTSE 100 প্রায় ১.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আতঙ্কের সূচক হিসেবে পরিচিত CBOE ভোলাটিলিটি ইন্ডেক্স বা VIX এক সপ্তাহে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এনার্জি বনাম টেক: দুই গতির বাজার
সংকটের মধ্যে বাজারের একটি কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্র বেরিয়ে এসেছে। ExxonMobil এবং Chevron-এর মতো তেল কোম্পানির শেয়ার শুরুতে লাফিয়ে বেড়েছে। এটি স্বাভাবিক, কারণ উচ্চমূল্যের তেল তাদের জন্য সরাসরি মুনাফা। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারছেন যে সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পরিবেশে শেষ পর্যন্ত এই কোম্পানিগুলোও অস্থিতিশীলতার মুখে পড়বে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারীরা Nvidia এবং Microsoft-এর মতো ‘নগদ-সমৃদ্ধ’ কোম্পানিতে আশ্রয় খুঁজেছে। কিন্তু হিলিয়াম ও সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে প্রযুক্তি খাতও অক্ষত থাকবে না।
Wells Fargo পূর্বাভাস দিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদী হরমুজ বন্ধ এবং প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি তেলের মূল্যের প্রেক্ষিতে S&P ৫০০ সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে ৬,০০০-এ নামতে পারে, যা বর্তমান স্তর থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ পতন। Goldman Sachs-এর কৌশলবিদ ডমিনিক উইলসন বলেছেন, শেয়ারবাজারের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে মূলত জ্বালানি সংকটটি কতটা স্থায়ী হয় তার উপর। ১৯৯০ বা ২০২২ সালের মতো তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তেল মূল্যবৃদ্ধি হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে বড় আঘাত আসবে।
মুদ্রানীতির সংকট: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দোটানায়
এই পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) একটি ভয়ংকর দ্বিধার মুখে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো উচিত। কিন্তু তাতে মন্দাচ্ছন্ন অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে সুদ কমিয়ে বা স্থির রেখে অর্থনীতিকে সহায়তা করলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে। ইসিবি ইতোমধ্যে ১৯শে মার্চ পরিকল্পিত সুদ হ্রাস স্থগিত করেছে। ২০২৬ সালের মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। এই অবস্থাকে অর্থনীতিবিদরা ‘স্টেগফ্লেশন’ বলছেন, একই সাথে স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি।
বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার ছেড়ে বন্ড ও সোনায় আশ্রয় নিচ্ছেন। ডলারের ‘সেইফ হেভেন’ চরিত্রের কারণে ডলারের মান বাড়ছে, ফলে ইউরো ও পাউন্ডের মান কমছে এবং ইউরোপের জন্য ডলারে মূল্য নির্ধারিত পণ্য আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
চতুর্থ আঘাত: সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বীজ
অর্থনৈতিক চাপ একসময় রাজনৈতিক
বিস্ফোরণে পরিণত হয়। ২০১৮-১৯ সালে ফ্রান্সে যখন জ্বালানি করের কারণে পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন সরকারকে নতজানু করেছিল। এখন যদি সংকট কয়েক মাস ধরে চলে এবং বেকারত্ব বাড়ে, তাহলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুরূপ বা আরও বড় গণ-আন্দোলনের আশঙ্কা স্বাভাবিক। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে রাশিয়ান জ্বালানি পুনরায় আমদানির কথা ভাবতে শুরু করেছেন, যা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরোপীয় ঐক্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
আমেরিকায় শ্রমবাজার দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে তেলের দাম বাড়ার সংমিশ্রণ বাইডেন-পরবর্তী মার্কিন রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, উচ্চ পেট্রোলের দাম এবং মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয় সাধারণ আমেরিকানদের রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়ায়। অতএব ইরানের “রেজিম” ফেলতে গিয়ে ইউরোপ -আমেরিকা এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কোন রেজিম ছিটকে পড়বে এখনই বলা না গেলে শংকা আছে। যদি হরমুজ সংকট দীর্ঘ হয়।
পরিশেষঃ ইতিহাসের আয়নায় একটি সতর্কবার্তা
১৯৭৩ সালের তেল সংকটে মাত্র কয়েক মাসের সরবরাহ বিঘ্নে আমেরিকায় শেয়ারবাজার ধসে পড়েছিল এবং দীর্ঘমেয়াদী মন্দা শুরু হয়েছিল। সেই সংকটের চেয়ে বর্তমান হরমুজ সংকট কয়েকটি দিক থেকে সম্ভাব্য বেশি তীব্র।
প্রথমত, আজকের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ১৯৭৩ সালের চেয়ে অনেক বেশি পরস্পরনির্ভর এবং জটিল।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ইতোমধ্যে রুশ গ্যাস বিচ্ছিন্নতার পর থেকে একটি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
তৃতীয়ত, ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ উৎপাদন মডেল অত্যন্ত সংকটপ্রবণ।
আইইএ ইতোমধ্যে ৪০ কোটি ব্যারেলের রেকর্ড জরুরি মজুদ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু তা বাজারকে শান্ত করতে পারেনি। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ ডালাসের মডেল বলছে, সংকট তিন প্রান্তিক স্থায়ী হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বছরের শেষে প্রতি ব্যারেল ১৩২ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে এবং বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বার্ষিক হিসেবে ১.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। এই সংখ্যাগুলো বিমূর্ত পরিসংখ্যান নয়। এগুলো কোটি কোটি মানুষের জীবনমানের সূচক।
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়। এটি আধুনিক শিল্প সভ্যতার একটি শ্বাসনালী। সেই শ্বাসনালী বন্ধ থাকলে যা হয়, তার নাম শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, তার নাম ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। বিশ্বের শাসনক্ষমতা বদলে যাওয়ার দাবার বোর্ড।
লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
