নয়াখবর
বৃহস্পতিবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমেরিকা, ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধ : বিশ্ব অর্থনীতির অশনি সংকেত

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১১, ২০২৬ ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বিশ্বব্যাংকের আভাস
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বাড়বে
দারিদ্র্য, চাকরি হারাতে
পারে ৬ লাখ মানুষ

— বাংলাদেশের ৬ খাতে প্রভাব পড়তে পারে
—জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ
—মূল্যস্ফীতি স্থীতিশীল থাকবে ৮.৫ শতাংশে
—উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ২১.৪ শতাংশ
—দরিদ্রের তালিকায় যুক্ত দেশের আরো ১৪ লাখ মানুষ
—চলতি বছর গরিব মানুষ বাড়তে পারে ১২ লাখ

নিজস্ব সংবাদদাতা , ঢাকা
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে এ বছর দারিদ্র্যের হার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। এমনকি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। এছাড়া চলতি বছরে প্রায় ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। সংস্থাটি জনিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাবে চলতি বছর দেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে।
বুধবার বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, সংঘাতের প্রভাবে বহিঃখাত, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্বচাপের সম্মিলিত প্রভাব ২০২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। উৎপাদন উপকরণের উচ্চ ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। যার ফলে বেসরকারি ভোগব্যয় দুর্বল হবে। জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশেষ করে উৎপাদন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ও বহিঃখাতের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কঠোর সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও মন্থর করতে পারে। এর ফলে ২০২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগে নির্ধারিত ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিলো।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আমদানি ব্যয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে ভর্তুকি ও রাজস্ব স্থানান্তর বৃদ্ধি—এসব কারণে প্রবৃদ্ধি আরও প্রায়  শন্য দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে। এছাড়া রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি হয়ে যেতে পারে। সার্বিকভাবে, এ সংঘাত প্রবৃদ্ধির ওপর নিম্নমুখী ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিলম্বিত করতে পারে। ইতোমধ্যেই শ্রমবাজারের ওপর চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ভাষ্য, বাংলাদেশে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি। বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধাবস্তা না থামলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। তাঁর মতে, শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।
জ্যঁ পেম বলেন, বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ঠিক করেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। নতুন সরকার অবশ্য এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতির তথ্যে বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।