ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সাইফুল খান
২০২৬ সালে ওমানের মাসকাটে যখন আমেরিকা ও ইরানের ভিতর আলোচনা চলছিলো এবং আলোচনা প্রায় ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে গুঞ্জনের ডালপালা মেলছিলো। ঠিক তখনই আলোচনার মাঝখানেই বলা নেই কওয়া নেই আচমকা তেহরানে হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেটা ছিলো মুসলিমদের পবিত্র রমজান মাস। ইরান কিছু বুঝে উঠতে সময় নেয় কম বেশি ঘন্টাখানেক। তারপর তেহরানের সীমানা থেকে নানান বাহারি রংয়ের, ঢংয়ের,গতির মিসাইল-ড্রোন যখন উড়তে শুরু করে ইসরায়েল ও আমেরিকার ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে। তারপরই দুনিয়াবাসী চিনতে পারে নতুন এক ইরানকে। প্রথম চারদিনে ইরান তার লক্ষ্য অর্জনের অর্ধেকের বেশি অর্জন করে ফেলে। পরের এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো তছনছ হয়ে যায়। পরবর্তী দিনগুলোতে আমেরিকার নিজের সক্ষমতা, ইসরায়েলের সক্ষমতা যখন নিঃশ্বেষের পথে তখন পাকিস্তানকে দিয়ে আমেরিকা আলোচনার চাপ সৃষ্টি করে। যুদ্ধে যা অর্জন সম্ভব নয় সেটা যদি আলোচনার টেবিলে পাওয়া যায় এই আশায়। ইরান জানে মার্কিনীরা আলোচনার যোগ্য না। নিজেরাই বরখেলাপ করবে। তবুও আন্তর্জাতিক রীতি, পাকিস্তানের অনুরোধকে স্বাগত জানিয়ে ইসলামাবাদ সংলাপে অংশ নেয়। দীর্ঘ ২২ ঘন্টার আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং আলোচনা এ পর্যন্তই। হরমুজ প্রণালী ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে, তেল বিক্রি করছে দেদারছে ইউয়ান বা অন্য কোন মুদ্রায়। যুদ্ধের ভেতরে ইরান এক কথায় অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে। হরমুজ, লোহিত সাগর, বাব আল মান্দেব, পারস্য সাগর এখন ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে। এই অঞ্চল বৈশ্বিক জ্বালানীর মূল প্রাণভোমরা। সেই প্রাণভোমরা এখন ইরানের হাতে বললে খুব বেশি ভুল হবেনা। এই আলোচনা নয়া প্যাক্সের সূচনা দিয়ে শুরু করলেও বিষয়টি তলিয়ে দেখতে আমাদের ফিরে যেতে হবে পেছনের ইতিহাসে।
ইতিহাসকে দীর্ঘ পরিসরে দেখলে বৈশ্বিক ব্যবস্থা কখনো স্থির থাকেনি। প্রতিটি আধিপত্যকারী শক্তি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিশ্বকে ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ রেখেছে। সেই শৃঙ্খলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্যাক্স’ বা শান্তি। কিন্তু প্রতিটি প্যাক্সের ভেতরেই থাকে তার পতনের বীজ। রোমের পতনের পর ইউরোপ ছিল বিশৃঙ্খল; তারপর এলো ব্রিটিশ আধিপত্য প্যাক্স ব্রিটানিকা। সেই পতনের পর দুই বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত ইন্টারওয়ার পিরিয়ড। তারপর প্যাক্স আমেরিকানা। আজ সেই কাঠামোও কাঁপছে।
হরমুজ প্রণালী, লোহিত সাগর এবং বাব-আল-মান্দেব এই তিনটি চোক পয়েন্ট কেবল জলপথ নয়, এগুলো হলো আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার মেরুদণ্ড। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ এই পথগুলো দিয়ে চলে। এই পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ যে হাতে, বিশ্বের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণও কার্যত সেই হাতে। আজকের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু তাই কেবল ইরান-আমেরিকা দ্বন্দ্ব নয়। এটি হলো একটি সম্পূর্ণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার পতন ও পুনর্জন্মের লড়াই।
“প্রতিটি প্যাক্স একটি সাম্রাজ্যের স্বপ্ন, প্রতিটি পতন একটি নতুন ইতিহাসের সূচনা।”
এক. প্যাক্স ব্রিটানিকা: প্রথম বৈশ্বিক আধিপত্যের কাঠামো
১.১ ব্রিটিশ হেজিমনির উত্থান ও প্রকৃতি
১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ইউরোপে যে শক্তির শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করে ব্রিটেন।
ভিয়েনা কংগ্রেস (১৮১৫) থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪) পূর্ব পর্যন্ত প্রায় একশ বছর বিশ্বে যে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তাকেই ইতিহাসবিদরা ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য, স্বর্ণমান-ভিত্তিক (Gold Standard) আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা। যেখানে ব্রিটিশ পাউন্ড ছিল বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা এবং ‘ফ্রি ট্রেড’ আদর্শের আড়ালে ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক বাজার নিশ্চিত করা।
কার্নেগি ইন্ডাউমেন্টের ইতিহাসবিদ পল কেনেডি তাঁর The Rise and Fall of the Great Powers (১৯৮৭) গ্রন্থে দেখান যে ১৮৫০ সালে ব্রিটেন একাই বিশ্বের মোট শিল্পোৎপাদনের প্রায় ১৯.৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ পরিচালিত হতো ব্রিটিশ নৌপথে। ব্রিটেনের সিঙ্গাপুর, এডেন, জিব্রালটার এবং হংকং এই সামরিক ঘাঁটিগুলো ছিল সেই আধিপত্যের কঙ্কাল-কাঠামো।
১.২ প্যাক্স ব্রিটানিকার চোক পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ
ব্রিটিশ আধিপত্যের মূল রহস্য ছিল সমুদ্রপথের কৌশলগত বিন্দুগুলো দখলে রাখা। সুয়েজ খাল নির্মাণের (১৮৬৯) পর এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শিরা হয়ে ওঠে। লন্ডন থেকে ভারত পর্যন্ত যোগাযোগের সময় ব্যাপক কমে যায়। ১৮৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ডিজরেলি মিশরীয় সরকারের কাছ থেকে সুয়েজ খালের শেয়ার কিনে নেওয়া ছিল সেই যুগের সবচেয়ে সফল ভূরাজনৈতিক চাল। এডেন বন্দর নিয়ন্ত্রণ মানে বাব-আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ। হরমুজের নিকটবর্তী অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব মানে পারস্য উপসাগরের পুরো বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ। যে চোক পয়েন্টগুলো আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রে, সেগুলো কার্যত শতাব্দীখানেক আগেই ব্রিটিশ কৌশলবিদরা চিহ্নিত করেছিলেন।
১.৩ প্যাক্স ব্রিটানিকার পতনের কারণ
ব্রিটিশ আধিপত্যের পতনের জন্য কোনো একটি কারণ দায়ী নয়। প্রথমত, শিল্প বিপ্লবের ফসল ছড়িয়ে পড়েছিল। জার্মানি, আমেরিকা ও জাপান শিল্পশক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল। দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যের বিশালতা তার রক্ষণে ব্যয় বাড়াচ্ছিল, কিন্তু উপনিবেশগুলো থেকে আয় সেই ব্যয়ের সাথে পাল্লা দিতে পারছিল না। যাকে কেনেডি বলেছেন ‘imperial overstretch’। তৃতীয়ত, জার্মানি ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরির উত্থান ইউরোপীয় ভারসাম্যকে এতটাই অস্থির করে তুলেছিল যে ১৯১৪ সালে সার্বিয়ায় একটি গুলি পুরো বিশ্বকে যুদ্ধে টেনে নেমেছিল।
“ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যেত না, কিন্তু সাম্রাজ্যের অর্থনীতির সূর্য ঠিকই ডুবে গিয়েছিল, যুদ্ধের অনেক আগেই।”
তথ্যসূত্র: Kennedy, P. (1987). The Rise and Fall of the Great Powers. Random House.
দুই. ইন্টারওয়ার পিরিয়ড: দুই প্যাক্সের মধ্যবর্তী অন্ধকার
২.১ ভার্সাই-পরবর্তী বিশ্বের বিশৃঙ্খলা
১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করলেও বাস্তবে এটি পরবর্তী বিপর্যয়ের নকশা তৈরি করেছিল। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস তাঁর The Economic Consequences of the Peace (১৯১৯) গ্রন্থে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে জার্মানির উপর আরোপিত ক্ষতিপূরণ ও অপমান ইউরোপকে আবার যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে।
ইন্টারওয়ার পিরিয়ড (১৯১৯-১৯৩৯) হলো ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দুই দশক। এই সময়ে বৈশ্বিক নেতৃত্বের শূন্যতা স্পষ্ট ছিল। ব্রিটেন দুর্বল হয়ে পড়েছে, আমেরিকা এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদে বিশ্বাসী। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ চার্লস কিন্ডেলবার্গার এই ঘটনাকে বলেছেন ‘হেজিমনিক শূন্যতা’ (Hegemonic Vacuum) যখন পুরনো আধিপত্যকারী আর সামলাতে পারছে না অপরদিকে নতুন কোন আধিপত্যকারী এখনো দায়িত্ব নেয়নি। তখন সিস্টেমটি বিপজ্জনকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে।
২.২ মহামন্দা ও বৈশ্বিক আর্থিক বিশৃঙ্খলা
১৯২৯ সালের মহামন্দা (Great Depression) শুধু একটি অর্থনৈতিক দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ-নির্মিত স্বর্ণমান ব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন।
দেশে দেশে সংরক্ষণবাদী’ Beggar-thy-neighbour নীতি চালু হলো। মুদ্রার অবমূল্যায়ন প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ সংকুচিত হয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে জার্মানিতে হিটলারের উত্থান, ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিজম এবং জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ছিল একটি অস্থির বিশ্বের স্বাভাবিক পরিণতি।
এই পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো: বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির প্রয়োজন। যখন সেই কেন্দ্র দুর্বল হয় বা শূন্য হয়, তখন পার্শ্বশক্তিগুলো নিজ নিজ স্বার্থে অগ্রসর হয় এবং সেই প্রতিযোগিতা অনিবার্যভাবে সংঘাতে পরিণত হয়।
২.৩ আজকের ইন্টারওয়ার পিরিয়ডের প্রতিধ্বনি
আজকের বিশ্বকে অনেক ইতিহাসবিদ ১৯২০-৩০-এর দশকের সাথে তুলনা করছেন। মার্কিন আধিপত্য দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু চীন এখনো পূর্ণ বৈশ্বিক নেতৃত্ব নেওয়ার মতো সক্ষম বা ইচ্ছুক নয়। এই শূন্যতায় রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করেছে, ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করছে, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করছে, হুথিরা লোহিত সাগর অবরোধ করছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো হেজিমনিক শূন্যতার লক্ষণ।
“যে যুগে পুরনো শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে কিন্তু নতুন শৃঙ্খলা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেই যুগই সবচেয়ে বিপজ্জনক।” -গ্রামসি, প্রিজন নোটবুক
তথ্যসূত্র: Kindleberger, C. (1986). The World in Depression 1929–1939. University of California Press. | Keynes, J.M. (1919). The Economic Consequences of the Peace.
তিন. প্যাক্স আমেরিকানা: নির্মাণ, বিকাশ ও ক্ষয়
৩.১ ব্রেটন উডস থেকে পেট্রোডলার: আমেরিকান ব্যবস্থার স্থাপত্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমেরিকাকে বিশ্বের একমাত্র অক্ষত অর্থনৈতিক মহাশক্তি হিসেবে রেখে গেছে। ইউরোপ ধ্বংসস্তূপ, জাপান বিধ্বস্ত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষতবিক্ষত। এই সুযোগে ১৯৪৪ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস সম্মেলনে আমেরিকা নতুন বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নির্মাণ করে। ডলারকে স্বর্ণের সাথে সংযুক্ত করা হলো (৩৫ ডলার = ১ আউন্স স্বর্ণ), অন্যান্য মুদ্রাগুলো ডলারের সাথে সংযুক্ত হলো। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সৃষ্টি হলো যেগুলোতে ভোটাধিকার নির্ধারিত হলো অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে, অর্থাৎ কার্যত আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু সবচেয়ে চতুর পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছিল ১৯৭৩-৭৪ সালে, যখন আমেরিকা সৌদি আরবের সাথে একটি অলিখিত চুক্তি করে।সৌদি আরব তেল বিক্রি করবে কেবল ডলারে, বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজপরিবারকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে। এটাই পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং এটাই প্যাক্স আমেরিকানার সবচেয়ে গভীর মূল।
৩.২ নৌশক্তি ও চোক পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ
ব্রিটিশদের মতোই আমেরিকা বুঝেছিল যে বৈশ্বিক আধিপত্যের চাবিকাঠি হলো সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ। পঞ্চম নৌবহর (Fifth Fleet) বাহরাইনে মোতায়েন করা হয়েছে হরমুজ ও পারস্য উপসাগর নিয়ন্ত্রণের জন্য। জিবুতি ঘাঁটি থেকে বাব-আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে নজর রাখা হয়। ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত এই পুরো নৌ-স্থাপত্য হল পেট্রোডলারের সামরিক রক্ষাকবচ।
আমেরিকার এই কৌশলের তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছিলেন নিকোলাস স্পাইকম্যান তাঁর ‘রিমল্যান্ড তত্ত্ব’তে। ইউরেশিয়ার উপকূলীয় বলয় (Rimland) নিয়ন্ত্রণ করো, তাহলে সমগ্র ইউরেশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আমেরিকার সামরিক ঘাঁটির মানচিত্র দেখলে স্পষ্ট যে এই তত্ত্বই বাস্তবায়িত হয়েছে।
৩.৩ প্যাক্স আমেরিকানার ক্ষয়ের স্তরগুলো
প্যাক্স আমেরিকানার ক্ষয় হঠাৎ শুরু হয়নি। এটি একটি ধীর, বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। প্রথম ধাক্কাটি এসেছিল ১৯৭১ সালে, যখন নিক্সন স্বর্ণমান ব্যবস্থা থেকে ডলারকে বিচ্ছিন্ন করেন। দ্বিতীয় ধাক্কা ছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তৈরি হওয়া ‘একমেরু বিশ্বের’ উচ্চাকাঙ্ক্ষা যা আমেরিকাকে ‘imperial overstretch’-এর দিকে নিয়ে গেছে। তৃতীয় ধাক্কা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, যা দেখিয়ে দিয়েছে যে ওয়াশিংটন কনসেনসাস (মুক্তবাজার, বেসরকারিকরণ, আর্থিক উদারীকরণ) সবসময় সঠিক নয়। চতুর্থ ধাক্কা ২০২১ সালে কাবুলের পতন, যা দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক শক্তিও বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যথেষ্ট নয়।
“আমেরিকা বিশ্বের পুলিশ হওয়ার ভূমিকা নিয়েছিল, কিন্তু সেই পুলিশের বাজেট ঘাটতি বছরের পর বছর বাড়ছে।”
তথ্যসূত্র: Spykman, N. (1942). America’s Strategy in World Politics. | Varoufakis, Y. (2011). The Global Minotaur. Zed Books.
চার. চোক পয়েন্টের যুদ্ধ: ভূরাজনীতির বর্তমান মানচিত্র
৪.১ হরমুজ: কৌশলগত সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
হরমুজ প্রণালী মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত, কিন্তু এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল যায়। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানের তেল ও এলএনজি রপ্তানির প্রায় সবটুকুই এই পথে যায়। ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে যে মার্কিন আক্রমণের জবাবে হরমুজ বন্ধ করা হবে।
ইরানের Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) এর নৌবাহিনী হরমুজের কাছাকাছি ইরানি ও আবু মুসা দ্বীপে সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। ক্ষুদ্র গতিশীল নৌকার ঝাঁক, ক্রুজ মিসাইল এবং মাইন স্থাপনের ক্ষমতা এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ (asymmetric) কৌশল দিয়ে ইরান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীকেও এই প্রণালীতে অচল করে দেওয়ার হুমকি দেয়ার সক্ষমতা রাখে।
৪.২ লোহিত সাগর ও হুথি সংকট: নতুন বাস্তবতা
২০২৩ সালের শেষ থেকে ইয়েমেনের হুথি বাহিনী লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর উপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। মার্শ ও ম্যাকলেনান-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে লোহিত সাগর হয়ে জাহাজ চলাচল ৪০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। বড় শিপিং কোম্পানিগুলো (Maersk, MSC, CMA CGM) জাহাজ ঘুরিয়ে কেপ অব গুড হোপ পাঠাতে শুরু করেছে। যা প্রতিটি যাত্রায় ৭-১০ দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং খরচ ২-৩ গুণ বৃদ্ধি করছে।
এটি একটি অসাধারণ ভূরাজনৈতিক বার্তা: একটি দরিদ্র, যুদ্ধবিধ্বস্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ব্যাহত করতে পারছে, এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যৌথ অভিযান (Operation Prosperity Guardian) তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারছে না।
৪.৩ ইরান-চীন-রাশিয়া: কৌশলগত ত্রিভুজের উত্থান
২০২৩ সালের মার্চে মধ্যস্থতাকারী চীনের মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক বাঁক ছিল। এর মাধ্যমে চীন প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আবির্ভূত হলো যেটি ছিল ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার একচেটিয়া ক্ষেত্র।
ইরানের সাথে চীনের ২৫ বছরের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি (২০২১), রাশিয়া-চীন ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ ঘোষণা (ফেব্রুয়ারি ২০২২, ইউক্রেন যুদ্ধের মাত্র কয়েকদিন আগে) এবং ইরানের SCO ও BRICS-এ যোগদান এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একটি পাল্টা-ব্যবস্থার ধীর নির্মাণ।
“হরমুজ ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে শুধু রাস্তা হারানো নয়, পুরো আমেরিকান আর্থিক সভ্যতার অক্সিজেন বন্ধ হওয়া।”
তথ্যসূত্র: US Energy Information Administration (EIA), Straits Reports 2023-24. | Marsh & McLennan, Red Sea Shipping Impact Report, Q1 2024.
পাঁচ. পেট্রোডলারের মৃত্যু ও বৈশ্বিক আর্থিক পুনর্গঠন
৫.১ ডি-ডলারাইজেশনের ত্বরান্বিত গতি
পেট্রোডলার ব্যবস্থার বয়স পঞ্চাশ বছর পার হয়েছে। এখন তার ভাঙন শুরু হয়েছে ধীরে, কিন্তু স্পষ্টভাবে। সৌদি আরব ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো চীনকে ইউয়ানে তেল বিক্রির সম্ভাবনা খোলা রেখেছে বলে রিপোর্ট করা হয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে রুপিতে তেল কিনছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দ্বিপক্ষীয় লেনদেনে ডলার বাদ দিচ্ছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞা বিশেষত রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিমায়িত করা বিশ্বের অনেক দেশকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। বার্তাটি স্পষ্ট: ডলার-ভিত্তিক সিস্টেমে অর্থ রাখা নিরাপদ নাও হতে পারে। এই উপলব্ধি থেকে বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ মজুদ বাড়াচ্ছে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে, ১,০৩৭ মেট্রিক টন।
৫.২ BRICS মুদ্রা এবং বিকল্প আর্থিক স্থাপত্য
২০২৩ সালে জোহানেসবার্গে BRICS শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচটি নতুন সদস্য (ইরান, সৌদি আরব, UAE, ইথিওপিয়া, আর্জেন্টিনা) যুক্ত হওয়ার ঘোষণা বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একটি প্রতীকী বিজয় ছিল। সম্প্রসারিত BRICS জোটের দেশগুলো একত্রে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং বৈশ্বিক GDP-র প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।
একটি BRICS-সমর্থিত মুদ্রা এখনো বাস্তবে পরিণত হয়নি এবং এর প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক বাধাগুলো বাস্তব। তবে ডিজিটাল ইউয়ান (e-CNY) ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েকটি দেশের সাথে বিনিময় হচ্ছে। চীনের CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) SWIFT-এর বিকল্প হিসেবে আস্তে আস্তে প্রসারিত হচ্ছে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো ধীর, কিন্তু দিকনির্দেশনা স্পষ্ট।
“ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হবে না,কিন্তু এর পতন শুরু হয়েছে এমন ধীরে, যেভাবে বন্যার আগে নদীর পার ভিজতে থাকে।”
তথ্যসূত্র: World Gold Council. (2024). Central Bank Gold Demand Report. | IMF Currency Composition of Official Foreign Exchange Reserves (COFER), 2024.
ছয়. থুসিডাইডস ট্র্যাপ: যুদ্ধ না সমন্বয়?
৬.১ ঐতিহাসিক নজির ও আজকের বাস্তবতা
গ্রাহাম অ্যালিসন তাঁর Destined for War: Can America and China Escape Thucydides’s Trap? (২০১৭) গ্রন্থে দেখান যে গত পাঁচশ বছরে ১৬টি ক্ষেত্রে যখন একটি উদীয়মান শক্তি প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তার মধ্যে ১২ ক্ষেত্রে যুদ্ধ হয়েছে। চারটি ব্যতিক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটেন থেকে আমেরিকার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর (১৮৯০-১৯৪৫)। যেখানে সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও মূল্যবোধের মিল যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করেছিল।
চীন-আমেরিকার ক্ষেত্রে সেই মিল নেই। মূল্যবোধ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুতেই গভীর পার্থক্য। তবে একটি নিবারক শক্তি (deterrent) আছে: পারমাণবিক অস্ত্র এবং গভীর অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা। আমেরিকা ও চীনের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বছরে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, উভয় পক্ষই জানে সরাসরি সংঘাত উভয়কেই ধ্বংস করবে।
৬.২ প্রক্সি যুদ্ধ ও পরোক্ষ সংঘাতের যুগ
সম্ভবত সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো না সরাসরি যুদ্ধ, না সম্পূর্ণ সহযোগিতা। বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধ ও প্রযুক্তি-বাণিজ্য সংঘাতের যুগ। ইউক্রেন এই মডেলের প্রথম বড় উদাহরণ। তাইওয়ান সম্ভবত পরবর্তী। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মাধ্যমে প্রক্সি শক্তির ব্যবহার, আফ্রিকায় রাশিয়ার Wagner-পরবর্তী উপস্থিতি এগুলো একটি নতুন শীতল যুদ্ধের মানচিত্র।
তবে এই শীতল যুদ্ধ ১৯৪৭-৯১-এর চেয়ে ভিন্ন হবে। কারণ এবার কোনো স্পষ্ট মতাদর্শগত বিভাজন নেই। বরং আছে স্বার্থের জটিল জাল, যেখানে ভারত একদিকে আমেরিকার কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা।
তথ্যসূত্র: Allison, G. (2017). Destined for War: Can America and China Escape Thucydides’s Trap? Houghton Mifflin Harcourt.
সাত. প্যাক্স সিনিকা না প্যাক্স কনসোর্টিয়াম?
৭.১ প্যাক্স সিনিকার সীমাবদ্ধতা
চীন কি পরবর্তী বৈশ্বিক আধিপত্যকারী? উত্তরটি এত সরল নয়। প্যাক্স ব্রিটানিকা ও প্যাক্স আমেরিকানার কেন্দ্রে ছিল একটি সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শগত বার্তা। ব্রিটেন দিয়েছিল ‘মুক্ত বাণিজ্য’, আমেরিকা দিয়েছিল ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’। চীনের কাছে সেই আদর্শগত বিকল্প নেই। বেইজিং কনসেনসাস বলতে কী বোঝায়, তা স্পষ্ট নয়।
চীনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও বাস্তব। ২০২৩-২৪ সালে চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট (Evergrande ধস), ঊর্ধ্বমুখী যুব বেকারত্ব (২৫ শতাংশের বেশি), ক্রমহ্রাসমান রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য এই সমস্যাগুলো চীনকে অন্তর্মুখী করে দিচ্ছে। একটি অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত শক্তি বৈশ্বিক হেজিমনি বজায় রাখতে পারে না।
৭.২ বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনা
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি একটি একক প্যাক্স নয়, বরং একটি বহুকেন্দ্রিক (multipolar) বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে আঞ্চলিক ব্লকগুলো আলাদা আলাদা নিয়ম ও মানদণ্ডে পরিচালিত হবে। আমেরিকা হয়তো পশ্চিম গোলার্ধ ও ইউরোপে তার প্রভাব বজায় রাখবে। চীন পূর্ব এশিয়া ও BRI অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার করবে। রাশিয়া ইউরেশিয়ার শক্তি-সরবরাহকারী হিসেবে টিকে থাকবে। ভারত দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উঠবে।
এই বিশ্বে মধ্যম শক্তিগুলো তুরস্ক, সৌদি আরব, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া অনেক বেশি স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করবে। তারা কোনো একটি শিবিরে আটকে না থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী পক্ষ বেছে নিতে পারবে যাকে ‘strategic autonomy’ বা কৌশলগত স্বাধীনতা বলা হচ্ছে।
৭.৩ ইসলামিক বিশ্ব: তৃতীয় মেরু হওয়ার সম্ভাবনা?
এই বিশ্লেষণে একটি প্রায়ই উপেক্ষিত প্রশ্ন হলো: ইসলামিক বিশ্ব কি এই পুনর্গঠনে একটি স্বাধীন মেরু হিসেবে উঠে আসতে পারে?
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো বিশ্বের মোট তেল মজুদের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি ধারণ করে, বিশ্বের জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ এবং এই জনগোষ্ঠীর গড় বয়স অত্যন্ত কম। তরুণ শ্রমশক্তির এই বিশাল ভান্ডার ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তির উৎস।
তবে OIC-ভিত্তিক কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর এখনো নেই। সৌদি-ইরান বিভাজন, আরব-অনারব টানাপোড়েন এবং তুরস্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগুলো ইসলামিক বিশ্বকে খণ্ডিত রেখেছে। তবে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান পুনর্মিলন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছিল। তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন।
“প্যাক্স সিনিকা হবে না প্যাক্স আমেরিকানার চীনা সংস্করণ, এটি হবে পুঁজির আধিপত্যের নতুন রূপ, যেখানে বন্দুকের বদলে ব্যালান্স শিট ব্যবহার হবে।”
আট. রূপান্তরের ব্যাকরণ: ইতিহাস কী বলে
৮.১ প্রতিটি রূপান্তরের পাঁচটি ধাপ
ইতিহাসের বৈশ্বিক ক্ষমতা রূপান্তরগুলো পর্যালোচনা করলে একটি সাধারণ ব্যাকরণ দেখা যায়। প্রথমত আসে অর্থনৈতিক ক্ষয়। প্রতিষ্ঠিত শক্তির উৎপাদনশীলতা কমে, ঋণ বাড়ে। তারপর আসে মতাদর্শগত সংকট, পুরনো ব্যবস্থার বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তৃতীয় ধাপে আসে সামরিক অতিবিস্তার। শক্তি বজায় রাখার চেষ্টায় অতিরিক্ত সম্প্রসারণ। চতুর্থ ধাপে ঘটে প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন, পুরনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। পঞ্চম ধাপে হয় কেন্দ্রীয় পুনর্গঠন, নতুন শক্তি নতুন কাঠামো তৈরি করে।
আমেরিকা আজ তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের মধ্যে আছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক অতিবিস্তার স্পষ্ট। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগের মহামারি প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষাঘাতের লক্ষণ। WTO আটকে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক সমন্বয় ব্যর্থ।
৮.২ রূপান্তরের সময়কাল ও মানবিক মূল্য
প্যাক্স ব্রিটানিকা থেকে প্যাক্স আমেরিকানায় রূপান্তর ঘটতে লেগেছিল প্রায় ৩০ বছর (১৯১৪-১৯৪৫)—দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ এবং মহামন্দার মধ্য দিয়ে। সেই ৩০ বছরে প্রায় ৮-১০ কোটি মানুষ মারা গেছে। পরবর্তী রূপান্তরটি কতটা রক্তাক্ত হবে তা নির্ভর করবে বিদ্যমান শক্তিগুলোর বিচক্ষণতার উপর।
পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব একটি নিবারক হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু এটি গ্যারান্টি নয়। তাইওয়ান প্রণালীতে একটি ভুল হিসাব, হরমুজে একটি প্রক্সি সংঘাত যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এই সম্ভাবনাগুলো কেবল কল্পনায় নেই।
“ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপান্তরগুলো কখনো শান্তিপূর্ণভাবে হয়নি। প্রশ্ন হলো, পরমাণু যুগে মানবজাতি কি প্রথমবারের মতো সেই ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবে?”
উপসংহার: বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া নতুন বিশ্বে কোথায় দাঁড়াবে?
এই বৈশ্বিক রূপান্তর বাংলাদেশের মতো ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জন্য কী অর্থ বহন করে? একদিকে চীনের BRI-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল ও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। অন্যদিকে আমেরিকার সাথে GSOMIA-জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক বন্ধন।
বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের মুখে অবস্থিত। যেটি ভারত মহাসাগর অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অঞ্চল। চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল এবং আমেরিকা ও ভারতের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশল উভয়েরই মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি শিবিরে আটকে না গিয়ে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (strategic autonomy) বজায় রাখা ভারতের মতো, তুরস্কের মতো।
প্যাক্স আমেরিকানার পতন মানে আমেরিকার বিলোপ নয়, মানে একটি নতুন বিশ্বের জন্ম, যেখানে নিয়মগুলো পুনর্লিখিত হবে। যে দেশগুলো সেই নিয়ম লেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে, তারাই নতুন বিশ্বে টিকে থাকবে ও সমৃদ্ধ হবে। যারা নিষ্ক্রিয় থাকবে, তারা আবার উপনিবেশের শিকার হবে।এবার হয়তো বন্দুকের নয়, ঋণের।
“হরমুজের পানিতে কেবল তেল ভাসে না ভাসে একটি সভ্যতার পতনের স্বপ্নভঙ্গ এবং নতুন এক দুনিয়ার অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।”
লেখক- নিউজ এডিটর এবং কলামিস্ট
