নয়াখবর
রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ত্রিশ বছরের পরিকল্পনা: ইরান যুদ্ধ ২০২৫-২৬ ও নব্য-রক্ষণশীলদের মধ্যপ্রাচ্য প্রকল্প

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১০, ২০২৬ ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ওমানে মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো তেহরান, ইস্পাহান, কোম ও কারাজের আকাশে প্রবেশ করল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন বোমারু বিমান যোগ দিল। শুরু হলো ইরানের উপর এক তরফা নির্লজ্জ আগ্রাসন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই শহীদ হলেন।

অনেকের কাছে এটি হঠাৎ ঘটা ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু যারা গত ত্রিশ বছরের নথিপত্র মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, তাদের কাছে এটি ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমাপ্তি। ইরান আক্রমণের পরিকল্পনা কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি সুশৃঙ্খল, দশকব্যাপী কৌশলের শেষ পর্যায়। সেই কৌশলের দলিলগুলো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়। যেকোনো গ্রন্থাগারে, ইন্টারনেটে। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম কখনো সেগুলোকে একসূত্রে বেঁধে জনগণের সামনে তুলে ধরেনি।
এই প্রবন্ধে আমি সেই কাজটিই করার চেষ্টা করব। প্রমাণিত নথি, প্রকাশ্য বক্তব্য ও ঘটনার ধারাবাহিকতার আলোকে দেখাব, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কীভাবে তিন দশক ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারা এই পরিকল্পনা করেছে এবং কীভাবে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়িত হয়েছে।

১৯৯৬: ‘ক্লিন ব্রেক’ মধ্যপ্রাচ্য পুনর্নির্মাণের মূল নকশা

১৯৯৬ সাল। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই একটি বিশেষ নীতি-দলিল তৈরির উদ্যোগ নেয়। ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজ’ নামক ইসরায়েলি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক একটি ‘স্টাডি গ্রুপ’ গঠন করে। নেতৃত্বে থাকে রিচার্ড পার্ল, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের প্রাক্তন সহকারী সচিব। সদস্যদের মধ্যে ডগলাস ফেইথ ও ডেভিড ওয়ার্মসার। এই গোষ্ঠী যে দলিলটি তৈরি করে তার নাম ‘এ ক্লিন ব্রেক: আ নিউ স্ট্র্যাটেজি ফর সিকিউরিং দ্য রেলম’। বাংলা করলে দাড়ায় ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ: রাজ্যরক্ষার নতুন কৌশল’। এটি কোনো গোপন নথি নয়। এটি পাওয়া যায় ইন্টারনেটে, গবেষণা সংস্থার আর্কাইভে। কিন্তু এর মধ্যে লেখা পরিকল্পনাটি ছিল অভূতপূর্ব স্পর্ধার।

দলিলটি সুনির্দিষ্টভাবে বলে, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে সরাতে হবে। সিরিয়াকে দুর্বল করতে হবে, ঘিরে ধরতে হবে, প্রয়োজনে পিছু হটাতে হবে। লেবানন থেকে হিজবুল্লাহকে উচ্ছেদ করতে হবে এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানকে কোণঠাসা করতে হবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে হবে এবং এই কাজে মার্কিন সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। নেতানিয়াহু সেই মুহূর্তে পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করেননি। কিন্তু পার্ল, ফেইথ ও ওয়ার্মসার এই তিনজন পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনে শীর্ষ পদ পেলেন। পার্ল রামসফেল্ডের উপদেষ্টা হলেন। ফেইথ হলেন প্রতিরক্ষা নীতির আন্ডার সেক্রেটারি। ওয়ার্মসার হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির মধ্যপ্রাচ্য উপদেষ্টা। ‘ক্লিন ব্রেক’-এর লেখকরা তখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নীতি নির্মাতা।

২০০২ সালে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সতর্ক করে লিখেছিল, ‘ক্লিন ব্রেক কাগজের বেশ কিছু লেখক এখন ওয়াশিংটনে মূল পদে আছেন। মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে গড়ার ইসরায়েলি পরিকল্পনা আজ ১৯৯৬ সালের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবযোগ্য। মার্কিনিদের হয়তো এর জন্য নিজেদের জীবন দিতে রাজি করাতেও পারা যাবে।’ সেই পূর্বাভাস সত্য হয়েছিল।

১৯৯৭-২০০০: পিএনএসি ও ‘নতুন পার্ল হারবার’-এর প্রতীক্ষা

১৯৯৭ সাল। ওয়াশিংটনে একটি নতুন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হলো ‘প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ বা পিএনএসি। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড ও পল ওলফোউইটজ। এঁরা তখন বিল ক্লিনটনের গণতান্ত্রিক প্রশাসনের বাইরে, কিন্তু অপেক্ষায় আছেন। পিএনএসির লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, শীতল যুদ্ধ শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে যে সুযোগ পেয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক আধিপত্য কায়েম রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি বাড়াতে হবে। ‘বিদ্রোহী রাষ্ট্রগুলো’ ইরাক, ইরান, সিরিয়াকে সামলাতে হবে। সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে পিএনএসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, ‘রিবিল্ডিং আমেরিকাস ডিফেন্সেস’। এই প্রতিবেদনের ৫১ নম্বর পাতায় একটি বাক্য লেখা ছিল, যা পরে ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বাক্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে, ‘এই রূপান্তরের প্রক্রিয়া, এমনকি যদি বিপ্লবমূলক পরিবর্তনও আনে, সম্ভবত দীর্ঘ সময় নেবে, যদি না কোনো বিপর্যয়কর ও উদ্দীপনামূলক ঘটনা ঘটে, যেমন একটি নতুন পার্ল হারবার।’

ঠিক এক বছর পরে, সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে, তাদের ‘নতুন পার্ল হারবার’ (ইরাক আক্রমন) এল এবং পিএনএসির প্রতিষ্ঠাতারা ডিক চেনি ভাইস প্রেসিডেন্ট, রামসফেল্ড প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ওলফোউইটজ ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী তখন মার্কিন সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে। সুযোগটি তারা হাতছাড়া করলেন না।

মার্কিন সংবাদ সংস্থা এবিসি নিউজ ২০০৩ সালে তদন্ত করে দেখিয়েছে, পিএনএসির ২০০০ সালের প্রতিবেদনে স্বাক্ষরকারী ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন পরে বুশ প্রশাসনে সরাসরি ক্ষমতায় এসেছেন। এটি কেবল একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক নয় এটি ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় থাকা একটি সরকার।

পেন্টাগনের গোপন নথি: সাত দেশ, পাঁচ বছর

২০০৭ সাল। মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন চার-তারকা জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ক, যিনি ন্যাটোর সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ‘ডেমোক্রেসি নাউ’ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকার দিলেন। তিনি বললেন এক অবিশ্বাস্য কথা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কয়েক সপ্তাহ পরে তিনি পেন্টাগনে গিয়েছিলেন। এক পরিচিত জেনারেল তাঁকে বললেন, আমরা ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যদিও ইরাকের সাথে ৯/১১-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কয়েক সপ্তাহ পরে আবার গেলেন। সেই জেনারেল একটি কাগজ দেখালেন। সেক্রেটারি অব ডিফেন্সের অফিস থেকে আসা। কাগজে লেখা পাঁচ বছরে সাতটি দেশ ধ্বংস করতে হবে।
সেই সাতটি দেশের নাম: ইরাক, তারপর সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান এবং শেষে ইরান। জেনারেল ক্লার্কের নিজের কথায়: ‘Starting with Iraq and then Syria, Lebanon, Libya, Somalia, Sudan and finishing off, Iran.’

এই বক্তব্য কোনো গোপন ফাঁস নয়। ক্লার্ক ২০০৬ সালে আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায়, ২০০৭ সালে সিএনএনে এবং একাধিক সাক্ষাৎকারে একই কথা বলেছেন। তিনি তাঁর বই ‘উইনিং মডার্ন ওয়ার্স’-এ লিখেছেন। এটি একটি মার্কিন জেনারেলের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, যা মূলধারার গণমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

এবার সেই তালিকার বিপরীতে ঘটনাগুলো মেলান, ২০০৩ – ইরাক আক্রমণ ও সরকার উৎখাত। ২০০৬ – ইসরায়েলের লেবানন আক্রমণ। ২০১১- লিবিয়ায় ন্যাটোর হস্তক্ষেপ, গাদ্দাফি নিহত। ২০১১ – সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও পরবর্তীতে আসাদের পতন (২০২৪)। সোমালিয়া ও সুদান বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ ও বিভক্তি এবং ২০২৫-২৬ ইরানে হামলা। তালিকার প্রতিটি দেশে, পরিকল্পনা মত হামলা করা হয়েছে।

ইরাক থেকে ইরান: ধাপে ধাপে প্রস্তুতি

ইরান আক্রমণ এক রাতে সিদ্ধান্ত হয়নি। এটির জন্য দশকের পর দশক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

প্রথম ধাপ ছিল ইরাক আক্রমণ (২০০৩)। এটি শুধু ইরাক সমস্যা নয় ‘ক্লিন ব্রেক’ দলিলেই বলা হয়েছিল, ইরাকে সরকার পরিবর্তন হলে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে। ইরাক দখলের মাধ্যমে মার্কিন সেনা ইরানের পশ্চিম সীমান্তে এসে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয় ধাপ ছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) এবং ২০১৮ সালে ট্রাম্পের একতরফা প্রত্যাহার। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন ইরান চুক্তি মানছে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) নিজেই নিশ্চিত করেছিল। তবু চুক্তি ভাঙা হলো। কারণ চুক্তি টিকে থাকলে ইরান আক্রমণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।

তৃতীয় ধাপ ছিল ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের একে একে দুর্বল করা। ২০২৩ থেকে গাজা যুদ্ধের আড়ালে ইসরায়েল হামাসকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করল, হিজবুল্লাহকে মারাত্মক আঘাত করল, সিরিয়ায় আসাদ সরকার পড়ে গেল। ইরানের হাত-পা কেটে নেওয়া হলো। ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ ভেঙে পড়ল।

চতুর্থ ধাপ ছিল সিরিয়ার পতনের পরে ইসরায়েলের পাঁচ শতাধিক বিমান হামলা সিরিয়ার সামরিক স্থাপনায়। এটি কৌশলগত দিক থেকে ছিল ইরান আক্রমণের পথ পরিষ্কার করা। ইরানে পৌঁছানোর আকাশপথ নিরাপদ করা।

পঞ্চম ধাপ ছিল জুন ২০২৫-এর ‘বারো দিনের যুদ্ধ’। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও নেতৃত্বের উপর ব্যাপক আঘাত করল। মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইস্পাহানে বাংকার-ধ্বংসকারী বোমা ফেলল। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলো।কিন্তু থামেনি। ইরান তখন দুর্বলতম অবস্থায়। ওমানে আলোচনা চলছিল। আর ঠিক তখনই, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, আঘাত এলো।

পর্দার পেছনে: কোন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক কী বলেছিল

এই যুদ্ধের ঠিক আগে থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলো কী বলছিল, সেটি দেখলে পরিকল্পনার ছবি আরও স্পষ্ট হয়। আটলান্টিক কাউন্সিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করল: ‘ছয়টি কারণ কেন ট্রাম্পের উচিত ইরানে সামরিক বিকল্প বেছে নেওয়া।’ দুই সপ্তাহ পরে যুদ্ধ শুরু হলো। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ (এফডিডি) যে সংগঠনটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পক্ষে বছরের পর বছর প্রতিবেদন লিখে আসছিল এবং যুদ্ধের পরেও কোন কোন স্থাপনা আরও ধ্বংস করতে হবে তার তালিকা প্রকাশ করল।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশ করল: ‘খামেনেইর পরে: ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিকল্পনা।’ যুদ্ধ শুরুর তিন দিন আগে তারা ইতিমধ্যে পরবর্তী পরিস্থিতির পরিকল্পনা করছিল। এটি কাকতালীয় নয়; এটি সমন্বয়ের চিহ্ন।

এই থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলো যে মানুষ তৈরি করে, তারাই সরকারের ভেতরে যান। নীতি লেখা হয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্কে, বাস্তবায়ন হয় পেন্টাগনে ও হোয়াইট হাউসে। সিএফআর, আটলান্টিক কাউন্সিল, আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বোর্ডে থাকেন অস্ত্র শিল্পের কর্তা, তেল কোম্পানির পরিচালক এবং বিলডারবার্গের নিয়মিত অংশগ্রহণকারীরা।

কার স্বার্থে এই যুদ্ধ? তেল, অস্ত্র ও আধিপত্য

প্রশ্নটা সবসময় জিজ্ঞেস করতে হয়, কার লাভ? ‘Cui bono?’ রোমান আইনের এই প্রাচীন প্রশ্ন আজও রাজনীতি বিশ্লেষণের সবচেয়ে ধারালো হাতিয়ার।

প্রথমত অস্ত্র শিল্প। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন ও বোয়িং-এর শেয়ার মূল্য লাফিয়ে উঠল। প্রতিটি বোমা, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিটি যুদ্ধবিমান সবই এই কর্পোরেশনগুলোর উৎপাদন। এই কর্পোরেশনগুলো সিএফআর ও আটলান্টিক কাউন্সিলের মূল দাতা।

দ্বিতীয়ত তেল ও জ্বালানি। ইরান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলের মজুত রাখে। ইরানের শাসনকাঠামো বদলে গেলে এই তেলের অ্যাক্সেস নতুনভাবে বণ্টিত হবে। ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানকে ভেনেজুয়েলার সাথে তুলনা করে বলেছেন, নতুন সরকার তেল উৎপাদনে সহযোগিতা করবে।

তৃতীয়ত ভূকৌশলগত কারণ। ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল প্রবাহিত হয়। ইরান চীনের সাথে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি করেছিল। ইরানের পতন চীনের মধ্যপ্রাচ্য-প্রভাবকে মারাত্মক আঘাত করবে যা পিএনএসির মূল লক্ষ্যগুলোর একটি।

চতুর্থত ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য। ‘ক্লিন ব্রেক’-এ যা লেখা হয়েছিল, ইসরায়েলকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সেটিই ছিল এই পুরো কৌশলের মূল লক্ষ্য। হামাস, হিজবুল্লাহ ও আসাদ পড়ে যাওয়ার পর ইরান ছিল শেষ বড় হুমকি।

ওমানের কূটনীতি: যে আলোচনা শেষ হতে দেওয়া হয়নি

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওমানে মার্কিন-ইরান পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। ওমান ঐতিহাসিকভাবে এই দুই পক্ষের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেছে ২০১৩ সালে পারমাণবিক চুক্তির প্রাক-আলোচনাও ওমানেই হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারি ২৭ তারিখে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, ইরান পারমাণবিক উপাদান সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প বললেন তিনি কূটনীতিতে বিশ্বাসী, তবে সব বিকল্প খোলা। পরদিনই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলো।

এই সময়টি কাকতালীয় নয়। আলোচনা সফল হলে যুদ্ধের ন্যায্যতা থাকে না। আলোচনা চলার সময় হামলা করলে দুটো বার্তা যায়:
এক, ইরান আর কখনো কূটনৈতিক সমাধানে আস্থা রাখবে না।
দুই, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশও বুঝে যাবে, মার্কিন-ইসরায়েলি নিশানায় পড়লে কূটনীতি রক্ষা করে না।
এটি একটি ইচ্ছাকৃত বার্তা। শুধু ইরানের জন্য নয়, সবার জন্য।

পরিশেষ

১৯৯৬ সালে কাগজে লেখা হয়েছিল-ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইরান একের পর এক বদলাতে হবে। ২০০১ সালে পেন্টাগনের নথিতে লেখা হয়েছিল, পাঁচ বছরে সাত দেশ। ২০২৬ সালে সেই তালিকার শেষ নামটি বাস্তবে পরিণত হচ্ছে।
এই প্রবন্ধে উল্লিখিত প্রতিটি দলিল ‘ক্লিন ব্রেক’, পিএনএসির প্রতিবেদন, জেনারেল ক্লার্কের সাক্ষ্য, সিএফআরের প্রকাশনা সবই সর্বজনলভ্য। এগুলো গোপন নয়। এগুলো পড়া হয়নি, আলোচনা করা হয়নি কারণ গণমাধ্যম সেটি করেনি। ইরানের উপর ২০২৬ সালের যুদ্ধ কোনো একক নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের বাস্তবায়ন, যার পেছনে রয়েছে অস্ত্র শিল্প, তেল কর্পোরেশন, নব্য-রক্ষণশীল থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এবং ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের স্বপ্ন। এই শক্তিগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত বিলডারবার্গের সভাকক্ষে, সিএফআরের বোর্ডরুমে, পেন্টাগনের করিডোরে।

ইতিহাস বিচার করে। কিন্তু ইতিহাস বিচার করতে পারে কেবল তখনই, যখন মানুষ ইতিহাস জানে। এই তথ্যগুলো জানা থাকলে ‘হঠাৎ যুদ্ধ’ আর হঠাৎ থাকে না পরিকল্পিত আগ্রাসন হিসেবে চেনা যায়।

লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।