নয়াখবর
শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্যাঙ্কশন শিথিল: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন মোড়

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১৫, ২০২৬ ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

সাইফুল খান

২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জটিল প্রভাব ফেলেছে। ইরান সংকটের জেরে জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল করার এই পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সিদ্ধান্তের পটভূমি

এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার প্রতি নীতি পরিবর্তনের কারণে নয়, বরং ইরান সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক বাজারে দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতেই যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১১ এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থানরত রুশ তেল কেনাবেচার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে।

এক নজরে প্রভাব

এতে রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়, যুদ্ধ তহবিল শক্তিশালীকরণ, বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। তাই রাশিয়া সবচেয়ে বড় বিজয়ী। এই সিদ্ধান্ত তাদের যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য ‘প্রাণদায়ী অক্সিজেন’ হিসেবে কাজ করছে।
অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জরুরি তেল সরবরাহ নিশ্চিতকরণে স্বল্পমেয়াদী একটি অর্থনৈতিক সমাধান নিলেও কৌশলগতভাবে মিত্রদের হারানোর মূল্য দিতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, আমেরিকার সাথে কৌশলগত  সংকটে পড়েছে। একদিকে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিরাপত্তা হুমকি।এই ঘটনায় ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ বাড়বে, মনোবল ও সমর্থন নিয়েও সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত তারা। রাশিয়ার শক্তি বৃদ্ধির ফলে তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা ও শান্তি আলোচনা উভয়ই জটিল হয়ে পড়বে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আপাত সাময়িক প্রশমন হলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক জোট তৈরি হওয়ার শঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

রাশিয়ার জন্য লাভ: সবচেয়ে বড় বিজয়ী

এই সিদ্ধান্ত থেকে রাশিয়া সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ও যুদ্ধপ্রচেষ্টায় একাধিক স্তরে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক লাভ

সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বড় প্রভাবটি এসেছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রধান রপ্তানি পণ্য ইউরাল তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩০ ডলার বেড়ে গেছে। এর অর্থ, রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বা ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত আয় করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই সিদ্ধান্তই রাশিয়াকে যুদ্ধের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যোগান দিতে পারে।

যুদ্ধের তহবিল শক্তিশালীকরণ

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া তার বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খরচ করে ইউক্রেন যুদ্ধে। নতুন করে পাওয়া এই অর্থ দিয়ে তারা আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনতে পারবে এবং সামনের সারিতে আরও সৈন্য পাঠাতে সক্ষম হবে।

বৈশ্বিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সাফল্য

ক্রেমলিন এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখছে। পুতিনের অর্থনৈতিক দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ” সুস্পষ্ট সত্য স্বীকার করেছে: রাশিয়ার তেল ছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে না”। এই অবস্থান রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও শক্ত অবস্থান দেবে এবং ভারত, চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভ: স্বল্পমেয়াদী সমাধান, দীর্ঘমেয়াদী মূল্য

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সিদ্ধান্ত একটি বাজি, যার সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ

ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল জ্বালানি তেলের দাম কমানো। ইরান সংকটের কারণে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি হয়ে পড়েছিল। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, সমুদ্রে আটকে পড়া রুশ তেল বাজারে ছেড়ে দিলে বিশ্ববাজারে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বেড়ে যাবে, যা দাম কমাতে সহায়ক হবে।

জরুরি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলা হুমকির মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রুশ তেল একটি জরুরি উৎস হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত থেকে বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিলেও, তা দাম কমাতে ব্যর্থ হয়। ফলে, রুশ তেলই ছিল হাতের কাছের সবচেয়ে বড় বিকল্প।

তবে, এই লাভের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে মূল্য দিতে হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মিত্রদের সাথে সম্পর্কের অবনতি এবং কৌশলগত দুর্বলতা তৈরির আভাস মিলছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি নিজেই স্বীকার করেছেন যে এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জন্য কিছুটা হলেও আর্থিক সুবিধা বয়ে আনবে, যা “দুর্ভাগ্যজনক”।

ইউরোপের জন্য প্রভাব: সংকটে জর্জরিত মিত্র

ইউরোপ এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি হতাশ ও বিপাকে পড়েছে। তাদের জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতির দিকটাই বেশি প্রকট।

কৌশলগত দূরত্ব ও নিরাপত্তা উদ্বেগ

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই সিদ্ধান্তকে “ভুল” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “যেকোনো কারণে এখন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা ভুল”। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, এটির “কোনো যৌক্তিকতা নেই”। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এটিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে মন্তব্য করেছেন, কারণ এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। ইউরোপের শীর্ষ নেতাদের এই প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমেরিকার নেওয়া একতরফা সিদ্ধান্তে আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যে গভীর কৌশলগত ফাটল ধরেছে।

জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট

ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপে জ্বালানি মূল্য ৭৫% এর বেশি বেড়ে গেছে। এর ওপর আবার আমেরিকা রাশিয়াকে স্বস্তি দেওয়ায় ইউরোপের অর্থনীতি দ্বৈত চাপে পড়েছে। একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার খরচ এখন তাদের একাই বহন করতে হচ্ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই পথে হাঁটছে না।

ইউক্রেনের ওপর চাপ: সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ইউক্রেনের ওপর। তাদের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট।

যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ বৃদ্ধি

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত “শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক নয়” বরং “রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করবে”। তার মতে, রাশিয়া এই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে আরও অস্ত্র ও ড্রোন কিনবে, যা ইউক্রেনের ওপর এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে ব্যবহার করবে।

মনোবল ও সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন

এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের জন্য একটি ভুল বার্তা বহন করে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্য ছিল ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমেরিকার এই একতরফা সিদ্ধান্ত সেই ঐক্যে চিড় ধরিয়েছে এবং ইউক্রেনের মনোবলকে দুর্বল করেছে। জেলেনস্কি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া নতুন সম্পদ পাচ্ছে, তাই ইউক্রেনকেও প্রতিশ্রুত সমর্থন পেতে হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব: মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব মিশ্র। একদিকে যেমন জ্বালানি বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

জ্বালানি বাজারে স্বস্তি

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসবে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আওতায় প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

বাজার অস্থিরতা ও ভবিষ্যত অনিশ্চয়তা

তবে, স্বল্পমেয়াদে এই সিদ্ধান্ত বাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। দাম এখনও ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান সংকটের কারণে রাশিয়ার তেলের চাহিদা এবং দাম আগেই বেড়ে গিয়েছিল। তাই, এই শিথিলতা দাম কমাতে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না। অধিকন্তু, আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে সৃষ্ট এই কৌশলগত ফাটল ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোট ও বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিণতি বিশ্লেষণ

সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরান সংকটের জেরে জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত একটি স্বল্পমেয়াদী সমাধান, কিন্তু এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এই সিদ্ধান্ত মূলত রাশিয়াকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ইউরোপ তার সবচেয়ে বড় মিত্রের কাছ থেকে কৌশলগত দূরত্ব অনুভব করছে, যার ফলে পশ্চিমা জোটের ঐক্য প্রথমবারের মতো এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলো।

এপ্রিলের ১১ তারিখ এই সাময়িক শিথিলতার মেয়াদ শেষ হলে কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইরান সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই শিথিলতা আরও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যেমনটি রাশিয়া আশা করছে। কিন্তু তাতে করে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও প্রকট হবে।

পরিশেষ

এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একুশ শতকের ভূ-রাজনীতিতে একটি আঞ্চলিক সংকট কীভাবে বিশ্বব্যাপী জোট ও অর্থনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।