তেল, ডলার ও ক্ষমতার নেপথ্যে এক রাজতন্ত্রের আসল পরিচয়
একটি কূটনৈতিক ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা
সাইফুল খান
১৯৩২ সালে আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ মরুভূমির বুকে আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সৌদি আরব রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই ছিল এক অনন্য রাজনৈতিক সত্তা। ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার অদ্ভুত সমন্বয়ে গঠিত এই রাষ্ট্রটি দ্রুতই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে একটি মূল্যবান সম্পদের কারণে, যার নাম তেল।
গত নব্বই বছরেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু এই বন্ধুত্ব কি সত্যিকারের মূল্যবোধ ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে? নাকি এর নিচে লুকিয়ে আছে শুধুই স্বার্থের নিষ্ঠুর হিসেব?
এই প্রবন্ধে সৌদি আরব ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে সম্পাদিত প্রধান চুক্তিগুলোর ঐতিহাসিক পর্যালোচনার মাধ্যমে উন্মোচন করা হবে সেই সম্পর্কের প্রকৃত চরিত্র যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক নীতিশাস্ত্র প্রায়শই তেলের দামে বিক্রি হয়ে যায়।
প্রথম পর্ব: ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র (১৯১৫–১৯৩২)
সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তি কেবল ইবনে সৌদের তলোয়ারের জোরে রচিত হয়নি এর পেছনে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুচিন্তিত কৌশলগত সহায়তা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অশান্ত পরিস্থিতিতে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব উপদ্বীপে একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র খুঁজছিল ব্রিটেন। সেই প্রয়োজনেই ইবনে সৌদকে কূলে টেনে নেওয়া হয়।
দারিন চুক্তি, ১৯১৫: একটি সুবিধাজনক বন্ধুত্বের সূচনা
১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে বাহরাইনের দারিন দ্বীপে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ছিল ব্রিটেন ও ইবনে সৌদের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দলিল। ব্রিটেন ইবনে সৌদের শাসনকে স্বীকৃতি দিল এবং বিনিময়ে পেল একটি মূল্যবান প্রতিশ্রুতি। ইবনে সৌদ ব্রিটিশ স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো বিদেশি শক্তির সাথে জোট করবেন না।
ব্রিটেন তাকে দিল অর্থ, অস্ত্র এবং কূটনৈতিক স্বীকৃতি। এই চুক্তি কার্যত ইবনে সৌদকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একজন প্রভুভক্ত করদাতা শাসকে পরিণত করল, যদিও বাহ্যিকভাবে সেটিকে বলা হলো ‘পারস্পরিক বন্ধুত্বের চুক্তি’।ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইবনে সৌদের হেজাজ ও নজদ রাজ্যের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার করল। পাঁচ বছর পরে এই দুই অঞ্চলকে একত্রিত করেই ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবে ‘কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া’।
চুক্তির শর্তানুযায়ী সৌদি আরব প্রতিশ্রুতি দিল ব্রিটিশ উপনিবেশ ও প্রটেক্টরেটগুলো যেমন কুয়েত, বাহরাইন ও ট্রানসজর্ডান আক্রমণ করবে না। ব্রিটেনের কাছে এই চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বিন্যাসকে নিজের সুবিধামতো সাজিয়ে রাখার একটি মাস্টারপিস।
এই দুটি চুক্তি সৌদি রাষ্ট্র গঠনের কাহিনিকে সম্পূর্ণ নতুন আলোয় দেখায়। ইবনে সৌদ যতটা না নিজের শক্তিতে আরব উপদ্বীপ একীভূত করেছিলেন, ততটাই তিনি ঋণী ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কৌশলগত সমর্থনের কাছে।
দ্বিতীয় পর্ব: আমেরিকান আলিঙ্গন ও তেলের রাজনীতি (১৯৩৩–১৯৭০)
ব্রিটেন যখন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব হারাতে শুরু করল, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের শক্তিশালী পদচিহ্ন এঁকে দিল আরবের বালুতটে। এবার মূল চালিকাশক্তি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নয়, বরং আমেরিকান পুঁজিবাদ ও কর্পোরেট স্বার্থ।
তেল কনসেশন চুক্তি, ১৯৩৩: কালো সোনার সন্ধানে
১৯৩৩ সালে মার্কিন কোম্পানি ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া’ (সোক্যাল) সৌদি আরবে তেল অনুসন্ধানের একচেটিয়া অধিকার পেল। চুক্তির শর্তগুলো ছিল সৌদির জন্য হাস্যকর রকম সুবিধাজনক কমপক্ষে আমেরিকার জন্য।
১৯৩৮ সালে আল-দাম্মাম এলাকায় তেল আবিষ্কারের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেল। এই কনসেশন থেকেই পরবর্তীতে জন্ম নিল ‘অ্যারামকো’ আরব-আমেরিকান অয়েল কোম্পানি। যা পরিণত হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান তেল কোম্পানিতে। মার্কিন পুঁজির এই বিনিয়োগ শুধু ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল না, এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূরাজনৈতিক উপস্থিতির প্রথম শিলান্যাস।
কুইন্সি চুক্তি, ১৯৪৫: ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতমেলানো
১৯৪৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইনস ডে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইন্সিতে ঘটল এক ঐতিহাসিক মিলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মুখে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন ডি. রুজভেল্ট এবং রাজা ইবনে সৌদ মুখোমুখি বসলেন সুয়েজ খালে নোঙর করা সেই জাহাজে।
এই বৈঠকে সম্পাদিত অলিখিত সমঝোতাটি ইতিহাসে ‘কুইন্সি অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত।
সমঝোতার মূল সূত্রটি ছিল অত্যন্ত সহজ এবং প্রচণ্ড রকম বাস্তববাদী:
সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ দেবে; বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল সৌদ রাজপরিবারের ক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এটি ছিল কার্যত একটি চুক্তি যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা সুশাসনের কোনো স্থান ছিল না। একটি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার বিনিময়ে পাওয়া যাবে তেল। এটাই ছিল পশ্চিমা গণতন্ত্রের নায়কদের ‘মূল্যবোধ-ভিত্তিক’ পররাষ্ট্রনীতির মূল দলিল।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও কুইন্সি সমঝোতার ছায়া সৌদি-আমেরিকা সম্পর্কের উপর পড়ে আছে। যখনই সৌদি আরবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ ওঠে, যখনই সৌদি সাংবাদিক হত্যা বা ইয়েমেন যুদ্ধের নৃশংসতার কথা আসে। তখন ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া সর্বদা একই রকম নরম, সর্বদা একই রকম কৌশলগতভাবে সংযত।
ধাহরান সামরিক ঘাঁটি চুক্তি, ১৯৫১
১৯৫১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে একটি সামরিক বিমানঘাঁটি পরিচালনার অধিকার পেল। এই ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রজেকশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠল।
বিনিময়ে সৌদি সেনাবাহিনীকে দেওয়া হলো আমেরিকান প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসহায়তা। এটি ছিল সামরিক নির্ভরতার একটি সুপরিকল্পিত কাঠামো। সৌদি সেনাবাহিনী আমেরিকান অস্ত্রের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়লে, আমেরিকার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
তৃতীয় পর্ব: পেট্রোডলার ষড়যন্ত্র ও শীতলযুদ্ধের অস্ত্র বাণিজ্য (১৯৭০–২০০০)
পেট্রোডলার ব্যবস্থা: ডলারের আধিপত্য রক্ষার মহাকৌশল
১৯৭১ সালে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে ডলারকে সোনার মানদণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করলেন। তখন একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিল ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য কিসের উপর দাঁড়াবে?
উত্তরটি এল সৌদি আরবের মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সাইমন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে সৌদি সরকারের একটি গোপন সমঝোতা হলো। সমঝোতার শর্ত ছিল স্পষ্ট:
এক. সৌদি আরব আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করবে কেবল মার্কিন ডলারে।
দুই. তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থের বড় অংশ বিনিয়োগ করা হবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে।
তিন. বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজবংশকে সামরিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেবে।
এভাবে জন্ম নিল ‘পেট্রোডলার সিস্টেম’। বিশ্ব অর্থনীতির এমন এক কাঠামো যেখানে যেকোনো দেশ তেল কিনতে চাইলে প্রথমে ডলার কিনতে হবে। এই ব্যবস্থা আমেরিকাকে দিল অভূতপূর্ব এক অর্থনৈতিক সুবিধা। নিজের ইচ্ছামতো ডলার ছাপানোর ক্ষমতা, কারণ সেই ডলারের চাহিদা বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যই নিশ্চিত করবে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো, যে দেশগুলো এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছে, তারা প্রত্যেকেই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বা গুপ্তচর কার্যক্রমের মুখোমুখি হয়েছে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইউরোতে তেল বিক্রির কথা বলেছিলেন। তারপর কী হলো, তা ইতিহাস জানে। লিবিয়ার গাদ্দাফি প্যান-আফ্রিকান স্বর্ণমুদ্রায় তেল বিক্রির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারপর তার পরিণতিও ইতিহাস জানে।
আল-ইয়ামামা অস্ত্র চুক্তি, ১৯৮৫: ইতিহাসের বৃহত্তম অস্ত্র বিক্রয়
১৯৮৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সরকার সৌদি আরবের সাথে স্বাক্ষর করল ‘আল-ইয়ামামা’ চুক্তি। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানি চুক্তি। মোট মূল্য ছিল আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরব পেল পানাভিয়া টর্নেডো যুদ্ধবিমান, হক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ বিমান এবং বিস্তৃত রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা। ব্রিটিশ অস্ত্র কোম্পানি BAe Systems (পরবর্তীতে BAE Systems) হলো এই চুক্তির প্রধান সুবিধাভোগী। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল ভিন্ন। ব্রিটিশ তদন্তকারীরা পরবর্তীতে অভিযোগ করেন যে চুক্তির বিপুল পরিমাণ অর্থ সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের কাছে কমিশন ও ঘুষ হিসেবে পাঠানো হয়েছে। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ ‘গুরুতর জালিয়াতি দপ্তর’ তদন্ত শুরু করেছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকার ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ দোহাই দিয়ে সেই তদন্ত বন্ধ করে দিল। সৌদি-ব্রিটিশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ আসলে ‘কর্পোরেট ও কূটনৈতিক স্বার্থ’-এর সুবিধাজনক মুখোশ, এই ঘটনা সেটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
F-15 ঈগল চুক্তি, ১৯৭৮: আকাশ শক্তির নিয়ন্ত্রণ
১৯৭৮ সালে মার্কিন কংগ্রেসের বিতর্কিত অনুমোদনের পর সৌদি আরব পেল অত্যাধুনিক F-15 ঈগল যুদ্ধবিমান। ইসরায়েল এই বিক্রয়ের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু পেট্রোডলার সিস্টেম ও সৌদি তেলের কৌশলগত গুরুত্বের কাছে ইসরায়েলি লবির আপত্তি শেষ পর্যন্ত হেরে গেল।
এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ইসরায়েলের আপত্তি উপেক্ষা করেও সৌদি আরবকে উন্নততম অস্ত্র দিতে রাজি।
চতুর্থ পর্ব: আধুনিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব (২০০০–২০২৬)
মার্কিন-সৌদি কৌশলগত সংলাপ, ২০০৫
২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর সৌদি-আমেরিকা সম্পর্ক এক বিপজ্জনক বাঁকে এসে দাঁড়াল। ১৯ জন বিমান-ছিনতাইকারীর মধ্যে ১৫ জনই ছিল সৌদি নাগরিক। সৌদি মাদ্রাসায় শিক্ষিত ওয়াহাবি মতাদর্শ এবং সৌদি অর্থে পুষ্ট সন্ত্রাসবাদের প্রশ্ন উঠে এল আন্তর্জাতিক আলোচনায়।
তবুও সৌদি-আমেরিকা সম্পর্ক ভাঙল না। ২০০৫ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক ‘কৌশলগত সংলাপ কাঠামো’ প্রতিষ্ঠিত হলো, যেখানে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামরিক সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো।
৯/১১-এর পর সৌদির সাথে ‘সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা’ গড়ে তোলার যে কৌশলগত সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন নিয়েছিল, সেটিকে অনেক বিশ্লেষক আখ্যা দেন ‘অগ্নিকাণ্ডের পর দমকল বাহিনীকে অগ্নিসংযোগকারীর সাথে চুক্তি করা’।
ট্রাম্প-যুগের মেগা অস্ত্র চুক্তি, ২০১৭
২০১৭ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। রিয়াদে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হলো ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি। আমেরিকার ইতিহাসে যেকোনো একক দেশের সাথে সম্পাদিত সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি।
চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল থিয়েটার হাই অ্যালটিচুড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড মিসাইল সিস্টেম, প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।
এই ঘোষণার সময় ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছিলেন। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা সৌদি হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রশ্নগুলোকে পাশ কাটিয়ে বলল এই অস্ত্র চুক্তি আমেরিকায় লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
ইয়েমেনের শিশুদের রক্তের বিনিময়ে আমেরিকান কারখানায় কর্মসংস্থান পশ্চিমা সভ্যতার ‘মূল্যবোধ-ভিত্তিক’ বৈদেশিক নীতির এটিই বোধহয় সবচেয়ে কদর্য দৃষ্টান্ত।
খাশোগি হত্যা ও কূটনৈতিক ভণিতা, ২০১৮
২০১৮ সালের অক্টোবরে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। সিআইএর তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হলো ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবু পশ্চিমা জগতের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর রকম নরম। ট্রাম্প প্রশাসন মোহাম্মদ বিন সালমানকে আড়াল করল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বার্থের দোহাই দিয়ে। ইউরোপীয় দেশগুলো কিছু সময়ের জন্য অস্ত্র বিক্রয় স্থগিত করলেও শীঘ্রই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল।
খাশোগি হত্যা প্রমাণ করে দিল সৌদি আরবের সাথে পশ্চিমের সম্পর্কে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা শুধুই বক্তৃতায়, বাস্তবে তেল ও অস্ত্র বাণিজ্যই হলো সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক।
সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি সহযোগিতা, ২০২০–২০২৬
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি-পশ্চিমা সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী তেল ও অস্ত্রের বাইরেও নতুন মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি ‘পেগাসাস’ সৌদি সরকার কর্তৃক নিজের দেশের ভিন্নমতাবলম্বী ও বিদেশি সাংবাদিকদের নজরদারিতে ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবু পশ্চিমা দেশগুলো সৌদির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো নির্মাণে সক্রিয় অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে।
পঞ্চম পর্ব: সৌদি আরবের আসল চরিত্র
কূটনৈতিক মুখোশে ধর্মের রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান ওয়াহাবি ও সালাফি আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক। দশকের পর দশক ধরে সৌদি সরকার ও রাজপরিবারের সদস্যরা বিশ্বজুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছেন বিশেষত পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে।
এই ধর্মীয় বিনিয়োগের উদ্দেশ্য শুধু পরোপকার নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে সৌদি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম সমাজে সৌদিপন্থী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রভাবটি অত্যন্ত স্পষ্ট। গ্রামের পর গ্রামে সৌদি অর্থে নির্মিত মসজিদ যেমন আছে, তেমনই আছে ওয়াহাবি মতাদর্শে পরিচালিত মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাগুলো শত বছরের বাঙালি-মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘বিদআত’ আখ্যা দিয়ে প্রান্তিক করার চেষ্টা করে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় সৌদির ভূমিকা
সৌদি আরব প্রকাশ্যে ‘স্থিতিশীলতার শক্তি’ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সৌদি অর্থে সজ্জিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধ ও বোমাবর্ষণে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে তা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে স্বীকৃত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ইয়েমেনে কয়েক লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির কারণে। লক্ষাধিক শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞে যে মার্কিন ও ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকারগুলো বেশিরভাগ সময়ই এড়িয়ে যায়।
অভ্যন্তরীণ নিপীড়ন ও ‘ভিশন ২০৩০’-এর আবরণ
মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা সৌদি আরবকে আধুনিক ও উদার রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার একটি বিশাল জনসংযোগ প্রকল্প। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, বিনোদন খাত উন্মুক্ত করা হয়েছে, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হচ্ছে।
কিন্তু একই সময়ে নারী অধিকার আন্দোলনের নেতারা কারারুদ্ধ, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিরা নিপীড়িত এবং সৌদি আদালতে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আধুনিকায়নের এই আবরণ মূলত পশ্চিমা বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করার কৌশল। রাজতন্ত্রের কাঠামো ও নিপীড়ক প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
পারস্পরিক নির্ভরতার ফাঁদ
সৌদি আরবের সবচেয়ে চতুর কৌশলটি হলো পশ্চিমকে এমনভাবে নিজের উপর নির্ভরশীল করে তোলা যে, পশ্চিম কখনো সৌদিকে প্রকৃত অর্থে চাপ দিতে পারবে না। এই ‘পারস্পরিক নির্ভরতার ফাঁদ’ কাজ করে তিনটি স্তরে:
প্রথমত, তেল নির্ভরতা। সৌদি আরব তেল উৎপাদন কমিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা পশ্চিমা অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত করে। ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ এই ক্ষমতার প্রথম সুস্পষ্ট প্রদর্শনী ছিল।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ নির্ভরতা। সৌদি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা পশ্চিমা ব্যাংক, কোম্পানি ও শিল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। এই বিনিয়োগ পশ্চিমা অভিজাতদের সৌদিপন্থী করে তোলে।
তৃতীয়ত, অস্ত্র বাজার নির্ভরতা। মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য সৌদি আরব একটি অপরিহার্য ক্রেতা। এই শিল্পের সাথে যুক্ত হাজার হাজার কর্মী, কারখানা ও লবিস্ট সরাসরি চাপ তৈরি করে সৌদিকে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার পক্ষে।
উপসংহার: স্বার্থের সম্পর্কে নৈতিকতার ভূমিকা
সৌদি আরব ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে নব্বই বছরেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক পর্যালোচনা করলে একটি অনিবার্য সত্য উন্মোচিত হয়। এই সম্পর্কের ভিত্তি কখনো গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল না। এর ভিত্তি সবসময়ই ছিল তেল, অর্থ, অস্ত্র এবং ভূরাজনৈতিক কৌশল।
১৯১৫ সালের দারিন চুক্তি থেকে ২০১৭ সালের ট্রাম্প-যুগের মেগা অস্ত্র চুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি সমঝোতায় একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। পশ্চিম যখনই ‘মূল্যবোধ’ ও ‘নীতি’র কথা বলেছে, তখনই সৌদির তেল বা অর্থ বা কৌশলগত গুরুত্ব সেই নীতিকে নিরব করে দিয়েছে।
সৌদি আরব এই সম্পর্কে কখনো নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় থাকেনি। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সে তার তেল সম্পদ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে এবং বিনিময়ে তার রাজতান্ত্রিক ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করে গেছে।
সবচেয়ে বড় পরিহাসটি হলো যে পশ্চিম সারা বিশ্বে গণতন্ত্র রপ্তানির দাবি করে, সেই পশ্চিমই আরব উপদ্বীপে শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও অনমনীয় রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক।
যখন তেলের মূল্য নৈতিকতার চেয়ে বেশি হয়, তখন কূটনীতি হয়ে ওঠে ব্যবসার আরেক নাম।
এই সত্যটি বোঝার মধ্যেই নিহিত আছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ এবং একটি স্বাধীন জাতির জন্য এই জ্ঞানই হতে পারে নিজের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের পথে সবচেয়ে মূল্যবান দিকনির্দেশক।
লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
