নয়াখবর
শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আল-কুদস দিবসঃ ফিলিস্তিনের কণ্ঠস্বর, মুসলিম উম্মাহর বিবেক

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১৩, ২০২৬ ২:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান একটি বিশেষ দিবস পালন করেন। ইয়াউমুল কুদস বা বিশ্ব কুদস দিবস। এটি কোনো সাধারণ স্মরণ দিবস নয়। এটি একটি জীবন্ত ঘোষণা। যে ঘোষণায় বলা হয়: ফিলিস্তিন ভুলিনি, কুদস ভুলিনি, আল-আকসা ভুলিনি।

আজ ১৩ মার্চ ২০২৬। এই বছরের কুদস দিবস। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যেখানে মুসলমান আছেন, সেখানেই আজ মাযলুম ফিলিস্তিনিদের জন্য কণ্ঠ বেজে উঠছে।

কুদস দিবসের ইতিহাস ও সূচনা

১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি(রহঃ) রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে ‘ইয়াউমুল কুদস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর ডাক শুধু ইরানিদের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য।

“আমি বিশ্বের মুসলমানদের আহ্বান জানাচ্ছি রমজানের শেষ শুক্রবারকে কুদস দিবস হিসেবে উদযাপন করতে এবং বিশ্বের সকল মুসলমানদের আন্তর্জাতিক সংহতি ঘোষণা করতে। যা কদর রাতের শক্তির একটি আভাস বহন করে।”
— ইমাম খোমেইনি, ১৯৭৯

সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে। কেবল ইরানে নয়, লেবানন, ইরাক, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ কুদস দিবসে রাস্তায় নামেন, ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তুলে ধরেন।

কুদস কী এবং কেন সে এতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আল-কুদস। এটি পবিত্র নগরী জেরুজালেমের আরবি নাম। হিব্রু ‘ইরুশালাইম’ বা ইংরেজি ‘জেরুজালেম’ যাই বলুন, এই শহরটি তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের কাছেই পবিত্র। কিন্তু মুসলমানদের কাছে এর বিশেষত্ব অতুলনীয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে কুদস তিনটি কারণে অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারী।

প্রথমত, মসজিদুল আকসা: এটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীর পরেই এর স্থান। কুরআনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে এই মসজিদের কথা। পবিত্র ইসরা ও মিরাজের ঘটনা এখান থেকেই শুরু হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, প্রথম কিবলা: ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। মক্কার কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তনের আগে দীর্ঘ ষোল মাস এটিই ছিল মুসলমানদের কিবলা।

তৃতীয়ত, নবীদের স্মৃতি: ইবরাহিম, দাউদ, সুলায়মান, ঈসা (আ.) সহ অসংখ্য নবীর জীবন এই শহরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ইসলামের ঐতিহ্য অনুযায়ী, নবি মুহাম্মদ (সা.) মিরাজের রাতে আল-আকসায় সকল নবীর ইমামতি করেছিলেন।

ফিলিস্তিনের ক্ষত: একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় থেকে ফিলিস্তিনের ট্র্যাজেডির শুরু। সেই বছর ৭ লক্ষেরও বেশি ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হন। শত শত গ্রাম ধ্বংস করা হয়। এর পর ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়।
দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা অবরোধ, বোমা হামলা, গৃহভাঙন এবং জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির মধ্যে বসবাস করছেন। গাজা, যেখানে প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ বাস করেন ; পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল এবং দীর্ঘদিন ধরে অবরোধের শিকার।

আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘের প্রস্তাব, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট সব কিছুতেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনের দগদগে ইতিহাস লেথা আছে। কিন্তু ন্যায়বিচার এখনও সুদূর পরাহত।

কুদস দিবসের প্রতীকী তাৎপর্য

কুদস দিবস নিছক একটি রাজনৈতিক প্রদর্শনী নয়। এটি একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থান। এই দিনটি বিশ্বমুসলিমকে মনে করিয়ে দেয় –
উম্মাহর সংহতি ও মুসলিম সভ্যতার শিক্ষা হলো, একজন মুসলমানের কষ্ট সকলের কষ্ট। হাদিসের ভাষায়, মুসলমানরা একটি শরীরের মতো। এক অংশে ব্যথা লাগলে পুরো শরীর কাঁদে।

কুদস দিবস মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করা শুধু ফিলিস্তিনিদের দায়িত্ব নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব।

কুদস দিবস মনে করিয়ে দেয় যে, ইসলামের নৈতিক দর্শনে জুলুম বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ফরজ। কুদস দিবস সেই মূল্যবোধেরই বাস্তব প্রকাশ।

ইসলামি ইরানে এই দিনে বিশাল সরকারি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হয়। লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বে বড় সমাবেশ হয়। ইরাকের বিভিন্ন শহরেও লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন।

এছাড়া পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ সহ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতেও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মিছিল, সমাবেশ ও দোয়ার আয়োজন হয়।
এমনকি পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেও যেমন- লন্ডন, ওয়াশিংটন, টরন্টো, বার্লিনে মুসলিম ও মানবাধিকারকর্মীরা কুদস দিবসে ফিলিস্তিনের পক্ষে সমাবেশ করেন।

বাংলাদেশ ও কুদস দিবস

বাংলাদেশের মুসলমানরাও ফিলিস্তিনের প্রতি গভীর সহানুভূতি পোষণ করেন। বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন, ছাত্র সংগঠন এবং মসজিদ-কেন্দ্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে কুদস দিবস পালিত হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল এবং মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসেও ফিলিস্তিনের প্রশ্ন সবসময় উপস্থিত থেকেছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভাজন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তৎকালীন মুসলিম নেতারা সরব ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশও ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত সংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সমালোচনা ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

কেউ কেউ কুদস দিবসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন এটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় এজেন্ডার সেবা করে। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় কেউ কেউ এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তবে একটি বিষয় স্মরণ রাখা দরকার: ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত দাবি – তাদের ভূমি, তাদের অধিকার, তাদের মর্যাদা যে কোনো রাজনৈতিক ব্যবহারের বাইরের সত্য। মানবতার দৃষ্টিতে এটি ন্যায়ের প্রশ্ন। ন্যায় ও ইনসাফের নিশান হাতে কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে। সেই কাজ ইরান করেছে। আমাদের দায়িত্ব তাদের ডাকে ইনসাফের লড়াইয়ে শামিল হওয়া।

আজকের দিনে কুদস দিবসের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৩-২৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর থেকে ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি আবারও বিশ্বমঞ্চে কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস এবং ব্যাপক মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের কুদস দিবসটি বিশেষ অর্থ বহন করে। এটি শুধু একটি দিবস নয়। এটি পৃথিবীর বিবেকের পরীক্ষা। যারা মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেন, যারা শান্তি ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করেন তাদের জন্য আজকের এই দিনটি একটি বিশেষ দিন।

পরিশেষ

আল কুদস আজাদ হবে এই বিশ্বাস কোটি মুসলমানের হৃদয়ে বেঁচে আছে। আল-আকসার মিনারে আজানের পবিত্র ধ্বনি মুক্তভাবে আবার বেজে উঠবে। এই স্বপ্ন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এটি মানবতার স্বপ্ন।আজ এই কুদস দিবসে আমরা সকল মাযলুম ফিলিস্তিনির জন্য দোয়া করি। ইতিহাস সাক্ষী, আমরা তাদের ভুলিনি, ভুলতে পারিনা।আল কুদস আমাদের আত্মপরিচয়ের পবিত্রতম অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।