মুসলিমদের ওয়াকফ করা লাখেরাজ সম্পত্তি হিন্দু জমিদারদের হাতে তুলে দেয় ব্রিটিশ সরকার।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীতে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন শাসক নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার দুঃখজনক ও মর্মান্তিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাসহ উপমহাদেশ থেকে মুসলমানদের সুদীর্ঘকালের শাসন ও কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। একাধারে টানা দুই শো বছর এ দেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব থাকে ঔপনিবেশিক ইংরেজ বেনিয়াদের হাতে। এবং এ অপশাসনের যাবতীয় সুবিধা ভোগ করে স্বার্থান্বেষী হিন্দু সমাজ ও জমিদারশ্রেণি।
ব্রিটিশ কর্তৃত্বের আগে কৃষিপ্রধান এই বাঙ্গালা অঞ্চলের একচতুর্থাংশ জমি ছিল ওয়াকফ কিংবা লাখেরাজ সম্পত্তি। এই সম্পত্তির আয়-রোজগার দিয়ে পরিচালিত হতো এতদ অঞ্চলের তামাম মাদরাসা-মসজিদ, এতিমখানা, সরাইখানা এবং চিকিৎসালয় সমূহ। জনসাধারণের কল্যাণার্থে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ এই ওয়াকফ সম্পত্তিতে কোনো প্রকারের কর বা খাজনা গ্রহণ করতেন না মুসলিম শাসকবর্গ। উপরন্তু তাঁরা জনগণের শিক্ষা বিস্তার কল্পে মুসলিম মনীষীদেরকে ‘জায়গীর’, ‘তমঘা’, ‘আয়মা’, ‘মদদে মাআশ’ ইত্যাদি নামে ভূসম্পত্তি দান করতেন। এই ধরনের ভূসম্পত্তিকে লাখেরাজ বলা হতো।
কেবল মুসলমানই না, হিন্দু প্রজাদের জন্যও থাকত এ ধরনের ভূমিগ্রহণের সুযোগ। হিন্দু সমাজের উন্নয়ন কল্পে তাদের ধর্মীয় মুরব্বিরা শাসকদের কাছ থেকে এ ধরনের জমি গ্রহণ করতে পারতেন।
তাছাড়া মুসলিম ধনাঢ্য বা ধার্মিক অনেক ব্যক্তিবর্গও ধর্ম ও জনকল্যাণমূলক কাজের ব্যয় নির্বাহের জন্য নিজেদের সম্পত্তির বড় একটি অংশ ওয়াকফ করে রাখতেন।
এইসব জমির কল্যাণে বাংলা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনা খরচে পড়াশোনা করতে পারত যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের সন্তানেরা। জনসাধারণ হাসপাতালগুলো থেকে নিতে পারত ফ্রি চিকিৎসাসেবা। জমির আয়ের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ব্যয় করা হতো মুসাফিরদের সেবায়ও। স্থানে স্থানে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য সরাইখানা। দূর-দূরান্তের মুসাফিরদের জন্য এসব সরাইখানায় বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হতো ওয়াকফ বা লাখেরাজ সম্পত্তির রোজগার থেকে।
লাখেরাজ এসব সম্পত্তির ওসিলায় সামাজিকভাবে হিন্দু-মুসলিম সকলেরই কল্যাণ সাধিত হচ্ছিল। মুসলিম ধর্মবেত্তাগণকে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীন প্রচারে কোনো ধরনের আর্থিক হিমশিম খেতে হতো না। স্থানে স্থানে গড়ে ওঠা মাদরাসাগুলোও চলছিল সুচারুরূপে।
ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে ওয়াকফ বা লাখেরাজ সম্পত্তির এই ধারাবাহিকতা বাঙ্গালা অঞ্চলে মুসলমানদের শত শত বছরের ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত ছিল। অবশ্য মুসলিম শাসন থাকার কারণে এই সম্পত্তি থেকে মুসলমানরাই বেশি উপকৃত হচ্ছিল। কিন্তু নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় যখন ইংরেজদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো, ইংরেজরা কয়েক বছরের ব্যবধানে মুসলমানদের হাত থেকে এইসব ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নেয়।
লাখেরাজ সম্পত্তিতে যেখানে কোনো কর বা খাজনা ছিল না, ইংরেজরা ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে এসব জমির ওপর বড় অংকের কর আরোপ করে। বলা হয়ে থাকে, কৃষিজীবী মুসলমানদের নিঃস্ব করতে এবং এসব ওয়াকফ সম্পত্তি তাদের হাত থেকে চিনিয়ে নিতেই ১৯৯৩ সালে ইংরেজরা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথা চালু করে। এই প্রথার মাধ্যমে কৃষকদের নিজস্ব জমিতে তাদের কোনো সত্ত্ব বাকি থাকে না, সত্ত্ব চলে যায় ব্রিটিশের অধীনে থাকা হিন্দু জমিদার শ্রেণির হাতে। কৃষকরা কেবল চাষ ও শ্রমের অধিকার পায়।চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই প্রথার ছুতোয় বাংলার সুফি-দরবেশ ও আলেম-ওলামাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় লাখেরাজ সম্পত্তি এবং তা দান করা হয় ব্রিটিশদের অনুগত হিন্দু জমিদারদের। ১৮২৯ সালে ঢালাওভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয় মুসলমানদের যাবতীয় ওয়াকফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি। ফলে অনিবার্যভাবে বন্ধ হয়ে যায় মুসলমানদের ধর্মীয়, দাতব্য ও শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইংরেজরা বাজেয়াপ্তকৃত এসব সম্পত্তি নিজেদের অনুগত হিন্দু শ্রেণির মধ্যে ঢালাওভাবে বণ্টন করে দেয়।
ব্রিটিশ শাসন বিলুপ্ত হওয়ার দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়েছে, ব্রিটিশ-পরবর্তী পাক-শাসন থেকেও স্বাধীনতা লাভ করেছে এ অঞ্চলের মানুষ, অভ্যূদয় ঘটেছে নতুন বাংলাদেশের, কিন্তু মুসলমানদের হারানো সেই ওয়াকফ সম্পত্তি, যেখান থেকে মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা ওষুধ-চিকিৎসাসহ সামাজিক নানা রকমের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ব্যয় নির্বাহ হতো, তা আজও উদ্ধার হয়নি। অথচ একাত্তরের স্বাধীনতা-সংগ্রামের আগে-পরে বেদখল হওয়া হিন্দুদের ওয়াকফ সম্পত্তি, যেটাকে দেবোত্তর সম্পত্তি বলা হয়, তা পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার ও প্রশাসনের নানা রকম তৎপরতা লক্ষ করা যায়।
তথ্যসূত্র
১. ব্রিটিশ নীতি ও বাংলার মুসলমান। লেখক : ড. আজিজুর রহমান মল্লিক। প্রকাশক : বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২. কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী। লেখক : এমআর আখতার মুকুল।
৩. প্রবন্ধ : একটি নতুন ওয়াকফ আন্দোলন প্রয়োজন। লেখক : শাহ আবদুল হান্নান। আইএমবিডি ব্লগে ১১ আগস্ট ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত।
