নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“লা’নাতুল আকদিস সামিন” বা “অষ্টম দশকের অভিশাপ”

অনলাইন ডেস্ক
জুন ১০, ২০২৬ ৪:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

সাইফুল খান

ইতিহাস কোনো সরলরেখা নয়, বরং এটি একটি বৃত্ত বা চক্রের মতো, যা বারবার আবর্তিত হয়। কোনো সভ্যতার উত্থান এবং তার পতন কীভাবে ঘটবে, তার কিছু চিরন্তন নিয়ম প্রকৃতি ও ধর্মগ্রন্থে আগে থেকেই লিপিবদ্ধ থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র’ বর্তমানে ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও রহস্যময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ, ইসলামি ভবিষ্যৎবাণী এবং খোদ ইহুদিদের নিজস্ব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন আজ তীব্র হয়ে ওঠে- বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্র কি তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিশাপের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?

আসুন উত্তর খুঁজি। আগে বলে নিই, এই বিশ্লেষণ একান্তই আমার মত করে করা। বনি ইসরায়েল বা ইহুদি জাতির ইতিহাসে পূর্ণ সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনা মূলত দুটি। কিন্তু এই দুই রাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রই একতাবদ্ধভাবে ৮০ বছর পার করতে পারেনি।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে হযরত দাউদ (আ:) ও সোলায়মান (আ:)-এর নেতৃত্বে বনি ইসরায়েলের সুবর্ণ যুগের সূচনা হয়। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঠিক ৮০ বছরের মাথায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষমতার লোভ এবং পাপাচারের কারণে অখণ্ড রাজ্যটি দুই ভাগে (ইসরায়েল ও জুদাহ) বিভক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজারের হাতে প্রথম উপাসনালয়সহ এই সভ্যতার চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয়।

পারস্যের সহায়তায় জেরুজালেমে ফিরে এসে ইহুদিরা খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ অব্দের দিকে ‘হাসমোনিয়ান রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠা করে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এই স্বাধীন রাষ্ট্রটিও অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং রোমানদের আগ্রাসনের কারণে ঠিক ৮০ বছরের মাথায় (খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে) তার স্বাধীনতা হারায় এবং পরবর্তীতে ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান জেনারেল টাইটাসের হাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, প্রাচীনকালের ৪২০ বছর যদি একটি সভ্যতার গড় আয়ু হয়, তবে বর্তমান ইসরায়েল কেন মাত্র কয়েক দশকে পতনের দ্বারপ্রান্তে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে শেষ জমানার “সময়ের সংকোচন” বা গতি বৃদ্ধির তত্ত্বে। আসুন হাদিস দেখি,

রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:
“কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ হলো সময় সংকুচিত হয়ে যাওয়া। তখন একটি বছর একটি মাসের মতো এবং একটি মাস একটি সপ্তাহের মতো দ্রুত কেটে যাবে।” (সুনানে তিরমিযী)

আমরা যদি এই আধ্যাত্মিক রেশিও (১২:১) এবং আধুনিক যুগের প্রযুক্তির তীব্র গতিকে সমীকরণে ফেলি, তবে দেখা যায় প্রাচীনকালের ৪০০ বছরে একটি সভ্যতায় যতটুকু উত্থান-পতন, যুদ্ধ ও রূপান্তর ঘটত। আজকের তীব্র গতিশীল বিশ্বে মাত্র ৩৩ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ভূ-রাজনীতিতে ঠিক ততটুকু ওলটপালট হয়ে যায়। প্রাচীন যুগের ধীরগতির ইতিহাসের তুলনায় বর্তমান যুগের ‘ইতিহাসের গতি’ অনেক ফাস্ট। ফলস্বরূপ, বনি ইসরায়েলের প্রাচীন ৪২০ বছরের শাস্তির চক্রটি এই শেষ জমানায় অনেক দ্রুত আবর্তিত হচ্ছে।

পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরায়েলের (সূরা ইসরা) ৪ থেকে ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার করে বলেছেন যে, বনি ইসরায়েল পৃথিবীর বুকে দু’বার বড় ধরনের বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করবে এবং দু’বারই তাদের চরম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বংসের পর দীর্ঘ ১৯০০ বছর ইহুদিরা পৃথিবীজুড়ে যাযাবরের মতো কাটায়। কিন্তু কুরআনের আরেকটি আয়াত (সূরা ইসরা: ১০৪) অনুযায়ী, শেষ জমানার চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতির সময় আল্লাহ তাদের আবার বিভিন্ন দেশ থেকে একত্রিত করবেন (“জিনা বিকুম লাফীফা”)।

১৯৪৮ সালে জায়নবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে। তবে কুরআনের চিরন্তন সতর্কবাণী হলো “তোমরা যদি আবারও (পাপ ও জুলুমের দিকে) ফিরে যাও, তবে আমিও (শাস্তি নিয়ে) ফিরে আসব।” বর্তমান ইসরায়েলের চরম বৈষম্য ও ফি.লিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন তাদের সেই চূড়ান্ত ঐশ্বরিক শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত এবং ইসরায়েলি থিংক-ট্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো “লা’নাতুল আকদিস সামিন”** যার হিব্রু অর্থ “অষ্টম দশকের অভিশাপ” (Curse of the Eighth Decade)।

ইহুদিদের দীর্ঘ ৩০০০ বছরের ইতিহাসে কোনো ইহুদি রাষ্ট্র তার অষ্টম দশক অর্থাৎ ৮০ বছর পার করে টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চক্রের হিসাব অনুযায়ী:
বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি তার প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পার করছে। অর্থাৎ, তারা তাদের অভিশপ্ত ৮০ বছরের একেবারে শেষ সীমান্তে অবস্থান করছে।

এটি কেবল কোনো ধর্মীয় গুঞ্জন বা তাত্ত্বিক অনুমান নয়। খোদ ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই অভিশাপ নিয়ে প্রকাশ্য জনসমক্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ২০১৭ সালে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্পষ্ট বলেছিলেন, “আমি চেষ্টা করছি যাতে ইসরায়েল তার ১০০ বছর পূর্ণ করতে পারে, কারণ হাসমোনিয়ান রাষ্ট্রটিও ৮০ বছর পার করতে পারেনি।”

এহুদ বারাক (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) ২০২২ সালে একটি হিব্রু পত্রিকায় কলাম লিখে সতর্ক করেছিলেন যে, ইসরায়েল বর্তমানে ইতিহাসের সেই অভিশপ্ত অষ্টম দশকে প্রবেশ করেছে এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদের কারণে রাষ্ট্রটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

আইজ্যাক হারজগ (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) এক ভাষণে বলেছিলেন, ইসরায়েল আজ এক ঐতিহাসিক পরীক্ষার মুখোমুখি, যেখানে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ রাষ্ট্রটিকে গ্রাস করতে চাইছে।

রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর হাদিসের সময়-সংকোচন তত্ত্ব, পবিত্র কুরআনের সূরা ইসরা-র ঐশ্বরিক নিয়ম এবং ইহুদিদের ইতিহাসের ৩০০০ বছরের প্রাচীন “অষ্টম দশকের অভিশাপ” সবগুলো সমীকরণ আজ ২০২৬ সালে এসে একই বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। আধুনিক ইসরায়েল আজ কেবল বাইরের শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত নয়, বরং তাদের নিজেদের তৈরি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চরমপন্থা, সামাজিক ফাটল এবং নৈতিক পতন রাষ্ট্রটিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে ফেলছে।
ইতিহাসের চাকা যদি তার চিরন্তন নিয়ম মেনে ঘোরে, তবে আগামী ২ বছরের মধ্যে (২০২৮ সালের ভেতরে) বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রটি বড় ধরনের কোনো অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় বা অভাবনীয় কোনো ধাক্কার মাধ্যমে তার পতনের চূড়ান্ত পর্যায় প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, প্রকৃতির নিয়মকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা কোনো পরাশক্তিরই নেই।

লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।