নয়াখবর
বুধবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুক রিভিউঃ চিপ ওয়ার

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ৮, ২০২৬ ৩:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা থাকে, যেখানে একটি আপাত-নিরীহ উদ্ভাবন পুরো সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। আঠারো শতকে বাষ্পইঞ্জিন যেভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদকে নতুন শক্তি দিয়েছিল, বিশ শতকের মাঝামাঝিতে পারমাণবিক শক্তি যেভাবে শীতল যুদ্ধের চেহারা নির্ধারণ করেছিল। ঠিক তেমনিভাবে একবিংশ শতাব্দীতে সেমিকন্ডাক্টর চিপ বিশ্বশক্তির কেন্দ্রীয় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। আমেরিকান অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ক্রিস মিলার তাঁর ‘Chip War’ বইয়ে এই অসাধারণ কিন্তু প্রায়-অদৃশ্য প্রযুক্তির উত্থান, আধিপত্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অনন্য বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।

বইটি ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। Financial Times ও McKinsey-এর বিচারে এটি সেই বছরের সেরা ব্যবসায়িক বই হিসেবে স্বীকৃতি পায়। The New York Times-এ এটিকে একটি ‘প্রয়োজনীয় পাঠ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। বইটি ইতিমধ্যে বিশটিরও বেশি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে।

ক্রিস মিলার টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসিতে আন্তর্জাতিক ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি আগে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং ‘The Struggle to Save the Soviet Economy’ নামক একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু ‘Chip War’ তাঁর সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ হিসেবে বিবেচিত। বইটি লিখতে গিয়ে তিনি বছরের পর বছর ধরে শিল্প-বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছেন। মিলারের বিশেষত্ব হলো তিনি জটিল প্রযুক্তিগত বিষয়কে ঐতিহাসিক আখ্যানের আলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ পাঠকও অনায়াসে বুঝতে পারেন।

বইয়ের কেন্দ্রীয় থিম ও যুক্তি

বইটির মূল প্রশ্ন হলো কীভাবে একটি ক্ষুদ্র সিলিকনের টুকরো, যা আঙুলের ডগায় রাখা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর নীতি, কূটনীতি ও সামরিক কৌশলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? মিলার দেখান যে আধুনিক সভ্যতার প্রায় প্রতিটি স্তম্ভ স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান, ইন্টারনেট থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সেমিকন্ডাক্টর চিপের উপর নির্ভরশীল। যে দেশ এই চিপ তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে দেশ কার্যত বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার চালকের আসনে বসে থাকে।

মিলার এই বিশ্লেষণকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন। তিনি দেখান যে চিপের আধিপত্যের লড়াই আসলে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান নির্ধারক উপাদান। শীতল যুদ্ধের সময় যেমন পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল জাতীয় নিরাপত্তার মাপকাঠি। আজকের দিনে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব সেই ভূমিকা পালন করছে। বইটি তাই শুধু একটি শিল্পের ইতিহাস নয়, এটি আসলে আমাদের সময়ের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গভীর পর্যালোচনা।

ট্রানজিস্টর থেকে সিলিকন ভ্যালি

বইটির প্রথম ভাগে মিলার চিপ-প্রযুক্তির জন্মকথা বর্ণনা করেন। ১৯৪৭ সালে আমেরিকার নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যে বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে উইলিয়াম শকলে, জন বার্ডিন ও ওয়াল্টার ব্রাটেইন মিলে ট্রানজিস্টর আবিষ্কার করেন। এটি সেই যুগান্তকারী মুহূর্ত যেখান থেকে আধুনিক ইলেকট্রনিক্স শিল্পের সূচনা। ১৯৫৮ সালে টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টসের জ্যাক কিলবি এবং প্রায় একই সময়ে ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টরের রবার্ট নয়েস পৃথকভাবে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট আবিষ্কার করেন। যা একটি চিপের মধ্যে বহু ট্রানজিস্টরকে একত্রিত করার সুযোগ দেয়।

মিলার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেখান কিভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা ক্লারা উপত্যকা, যা পরে ‘সিলিকন ভ্যালি’ নামে বিখ্যাত হয়, বিশ্বের প্রযুক্তি রাজধানীতে পরিণত হয়। ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর থেকে বেরিয়ে আসা প্রকৌশলীরা পরবর্তী দশকগুলোতে ইন্টেল, এনভিডিয়া, এএমডিসহ বেশিরভাগ বড় চিপ কোম্পানি স্থাপন করেন। এই উদ্যোক্তারাই সিলিকন ভ্যালির সংস্কৃতি তৈরি করেন। দ্রুত উদ্ভাবন, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

এই অধ্যায়ে মিলার মুরের সূত্র (Moore’s Law) নিয়েও আলোচনা করেন। ১৯৬৫ সালে ইন্টেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে প্রতি দুই বছরে একটি চিপে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে এবং এই সূত্র দশকের পর দশক ধরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আজকের একটি আধুনিক চিপে ৫০ বিলিয়নেরও বেশি ট্রানজিস্টর থাকতে পারে। যেগুলোর আকার মানুষের একটি চুলের তুলনায় হাজার গুণেরও বেশি সরু। এই অসাধারণ অগ্রগতি চিপকে সর্বব্যাপী করে তুলেছে এবং ডিজিটাল যুগের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সামরিক শক্তি ও চিপের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়গুলোর একটি হলো সামরিক বাহিনীর সাথে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্পর্কের বিবরণ। মিলার দেখান যে আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রাথমিক চিপ শিল্পের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৬০-এর দশকে মিনিটম্যান ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্পের জন্য মার্কিন বিমান বাহিনী বিপুল পরিমাণে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কিনেছিল। যা ফেয়ারচাইল্ড ও টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টসকে প্রাথমিকভাবে বেঁচে থাকতে এবং উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিলার বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন কীভাবে আমেরিকার উন্নত চিপ-নির্ভর অস্ত্রব্যবস্থা স্মার্ট বোমা, প্রিসিশন গাইডেড মিসাইল, স্টেলথ বিমান এবং রিয়েল-টাইম যোগাযোগ ব্যবস্থা ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অপ্রতিম সামরিক সুবিধা তৈরি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই যুদ্ধ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। কারণ তারা বুঝতে পারে যে প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার কারণে তাদের বিশাল সামরিক বাহিনীও আধুনিক যুদ্ধে টিকতে পারবে না।

এশিয়ার উত্থান

বইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো এশিয়ার চিপ শিল্পে উত্থানের কাহিনী। ১৯৮০-র দশকে জাপান আমেরিকান চিপ নির্মাতাদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে। জাপানি কোম্পানিগুলো টোশিবা, হিটাচি, ফুজিতসু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে মেমরি চিপ বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই সময়কালে আমেরিকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়ে এবং মার্কিন সরকার সংরক্ষণবাদী নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

তাইওয়ানের ভূমিকা নিয়ে মিলারের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে চমকপ্রদ। ১৯৮৭ সালে মরিস চাং তাইওয়ানে TSMC (Taiwan Semiconductor Manufacturing Company) প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি বিপ্লবী ব্যবসায়িক মডেল চালু করেন ‘ফাউন্ড্রি মডেল’, যেখানে TSMC শুধু চিপ ডিজাইন করা কোম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদন করে, নিজে কোনো ডিজাইন করে না। এই মডেল সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আমূল বদলে দেয়। আজকে TSMC বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন করে। অ্যাপলের A-সিরিজ চিপ, এনভিডিয়ার AI চিপ এবং আরও অনেক কিছু।
একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়াও মঞ্চে আসে। স্যামসাং এবং SK হাইনিক্স মেমরি চিপ উৎপাদনে বিশ্বনেতা হয়ে ওঠে। স্যামসাং আজকে DRAM ও NAND ফ্ল্যাশ মেমরির সবচেয়ে বড় উৎপাদক। মিলার দেখান কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে এই বৈশ্বিক শক্তির আসনটি অর্জন করেছে। এই পুরো পর্বে পূর্ব এশিয়ার ‘চিপ শক্তিগুলো’ তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান একটি নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া
বইয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং প্রাসঙ্গিক অংশটি হলো চীনের সেমিকন্ডাক্টর মহাপরিকল্পনা এবং এর বিরুদ্ধে আমেরিকার পদক্ষেপ নিয়ে। ২০১৫ সালে চীনা সরকার ‘Made in China 2025’ পরিকল্পনা ঘোষণা করে। যার মূল লক্ষ্য হলো ২০২৫ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর সহ হাই-টেক শিল্পে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা। এই পরিকল্পনার আওতায় চীন শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। সরকারি ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় তহবিল এবং কোম্পানি অধিগ্রহণের মাধ্যমে।
মিলার অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে SMIC (Semiconductor Manufacturing International Corporation)-এর কাহিনী বলেন, যা চীনের সবচেয়ে উন্নত চিপ নির্মাতা। কিন্তু TSMC ও স্যামসাং থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পিছিয়ে থাকা SMIC চীনের চিপ স্বনির্ভরতার স্বপ্ন পূরণে অক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মূল দুর্বলতা হলো ডিজাইন সফটওয়্যার (EDA টুলস), উৎপাদন যন্ত্রপাতি (বিশেষত ASML-এর EUV লিথোগ্রাফি মেশিন) এবং বিশেষ রাসায়নিক উপাদানের উপর পশ্চিমা নির্ভরতা।

ASML-এর বিষয়টি বইটিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়। নেদারল্যান্ডসের এই কোম্পানি বিশ্বের একমাত্র প্রস্তুতকারক যারা EUV (Extreme Ultraviolet) লিথোগ্রাফি মেশিন তৈরি করে। এই মেশিন ছাড়া ৭ ন্যানোমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের চিপ তৈরি করা অসম্ভব। একটি ASML EUV মেশিনের দাম ১৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং এটি তৈরিতে প্রায় ১০০,০০০ যন্ত্রাংশ লাগে যা বিশ্বের ৮০০ সরবরাহকারী সরবরাহ করে। আমেরিকার চাপে নেদারল্যান্ডস চীনে এই মেশিন রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এটি চিপ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই বিরোধের নতুন অধ্যায় শুরু করে। হুয়াওয়ে, যেটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি এবং ৫জি প্রযুক্তির নেতৃস্থানীয় প্রস্তুতকারক, আমেরিকান চিপ ও সফটওয়্যার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে আমেরিকা চিপ সাপ্লাই চেইনের উপর তার নিয়ন্ত্রণকে একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন আরও ব্যাপক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জারি করে চীনে উন্নত চিপ এবং চিপ-তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করে।
তাইওয়ান: বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূখণ্ড
মিলার তাইওয়ানকে ‘সিলিকন শিল্ড’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই ছোট্ট দ্বীপটি বিশ্বের চিপ উৎপাদনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এর উপর যেকোনো আক্রমণ বা অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেবে। TSMC একা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপের প্রায় ৯২ শতাংশ উৎপাদন করে। অ্যাপল, নাইকি, কোয়ালকম, মিডিয়াটেক বিশ্বের প্রায় সব বড় প্রযুক্তি কোম্পানি TSMC-এর উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল।
চীন তাইওয়ানকে তার ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে একত্রীকরণের হুমকি দেয়। যদি চীন তাইওয়ান দখল করে, তাহলে TSMC-এর নিয়ন্ত্রণ পাবে। এটি কার্যত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অবকাঠামোর মালিক হওয়ার সমতুল্য। এই কারণেই মিলার বলেন যে তাইওয়ান প্রণালী আজ বিশ্বের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি। আমেরিকার তাইওয়ানকে সমর্থন করার পেছনে শুধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নয়, এর সেমিকন্ডাক্টর শক্তিও একটি বিশাল কারণ।

২০২০-২১ সালের চিপ সংকট

মিলার বৈশ্বিক চিপ সাপ্লাই চেইনের অবিশ্বাস্য জটিলতা তুলে ধরেন। একটি আধুনিক চিপ তৈরিতে হাজারেরও বেশি পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে বিশেষজ্ঞ কোম্পানি ও দেশের অবদান থাকে। বেলজিয়ামের IMEC গবেষণাগার, জাপানের বিশেষ রাসায়নিক কোম্পানি (Shin-Etsu Chemical, JSR), আমেরিকার EDA সফটওয়্যার কোম্পানি (Synopsys, Cadence), নেদারল্যান্ডসের ASML এই সবকিছু মিলিয়ে চিপ শিল্প পরিচালিত হয়।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ২০২০-২১ সালে বৈশ্বিক চিপ সংকট এই সাপ্লাই চেইনের ভঙ্গুরতা নগ্নভাবে প্রকাশ করে দেয়। হঠাৎ করে গাড়ি কারখানা থেকে ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি পর্যন্ত সবাই চিপের অভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়। আমেরিকার অটোমোটিভ শিল্প একাই ২১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ে। এই সংকট বিশ্বের বিভিন্ন সরকারকে চিপ শিল্পে স্বদেশী বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দেয়। আমেরিকা CHIPS Act (২০২২) পাস করে ৫২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন European Chips Act ঘোষণা করে এবং জাপান সরকারও দেশীয় উৎপাদনে ভর্তুকি শুরু করে।

মিলারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বিষয়কে একটি রোমাঞ্চকর গল্পের আকারে পরিবেশন করতে পেরেছেন। বইটিতে বিমূর্ত তথ্যের পরিবর্তে আছে জীবন্ত চরিত্র, স্বপ্নবাজ উদ্ভাবক, নিষ্ঠুর প্রতিযোগী, দূরদর্শী নীতিনির্ধারক। জ্যাক কিলবির ভেতরে থাকা বিজ্ঞানীর অদম্য কৌতূহল, মরিস চাঙের শিল্পী-মানসের ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টি অথবা TSMC-এর প্রকৌশলীদের রাত-জেগে কাজ করার নিষ্ঠা। এই মানবিক কাহিনীগুলো বইটিকে শুধু তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠযোগ্য করে তুলেছে।

বইটির কাঠামো পাঁচটি প্রধান ভাগে বিভক্ত এবং মোট ৪৬টি অধ্যায় রয়েছে। প্রতিটি অধ্যায় তুলনামূলকভাবে ছোট ও একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কেন্দ্রীভূত, যা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে। মিলার অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিভাষা পরিহার করেছেন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে সরল উপমার মাধ্যমে জটিল ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। তবু স্বীকার করতে হবে যে যারা একেবারে প্রযুক্তি বা অর্থনীতিতে নতুন, তাদের জন্য কিছু অংশ ধীরে পড়তে হবে।
প্রশংসার পাশাপাশি বইটির কিছু সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা প্রয়োজন। প্রথমত, বইটি মূলত আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা। চীন বা এশিয়ার দেশগুলোর নিজস্ব কৌশলগত যুক্তিগুলো তেমন গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, বইয়ের শেষভাগে আমেরিকার উচিত কী করা এই প্রশ্নে নীতিনির্ধারকের মতো আলোচনা করা হয়েছে, যা কখনো কখনো বইটিকে একটি পলিসি ডকুমেন্টের রূপ দেয়। তৃতীয়ত, পরিবেশগত দিক – সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন যে বিশাল পরিমাণ পানি ও রাসায়নিক ব্যবহার করে তা প্রায় অনালোচিত থেকে গেছে।

আরেকটি সমালোচনা হলো বইটি ২০২২ সালে প্রকাশিত হওয়ায় সাম্প্রতিক উন্নয়ন তাতে নেই। যেমন ২০২৩ সালে Huawei-এর Mate 60 Pro ফোনে ৭ ন্যানোমিটার চিপ ব্যবহার, যা চীনের চিপ সক্ষমতা সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া AI চিপের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব যেখানে Nvidia-র GPU চিপগুলো বর্তমান AI বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। সেটি বইয়ে পূর্ণমাত্রায় পায়নি। তবে এগুলো লেখকের দোষ নয়, বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি বিষয়ে লেখার স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা।

মিলার বইয়ের শেষে যে ভবিষ্যৎচিত্র আঁকেন তা বাস্তবতার সাথে অনেকটাই মিলে যাচ্ছে। তিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে চিপকে কেন্দ্র করে আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হবে এবং সত্যিই তা হয়েছে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে তাইওয়ান প্রণালী ভবিষ্যতে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে এবং এই উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে পশ্চিমা দেশগুলো চিপ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করবে এবং CHIPS Act, European Chips Act সেই দিকেই যাচ্ছে।

বইটি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ যখন তার অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে হাঁটছে তখন বিশ্ব প্রযুক্তি-রাজনীতির এই মূল স্রোতটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি, ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মধ্যে এই জটিল সম্পর্ক বোঝা আমাদের নীতিনির্ধারকদের, শিক্ষার্থীদের এবং সচেতন নাগরিকদের সবার কাজে আসবে।

পরিশেষ

‘Chip War’ একটি অসাধারণ বই। কারণ এটি একই সাথে একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস, একটি গভীর ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ-চেতনা জাগ্রত করার আহ্বান। মিলার সফলভাবে প্রমাণ করেন যে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এই ক্ষুদ্র সিলিকনের টুকরো আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রতিযোগিতামূলক সম্পদ হয়ে উঠেছে। যেভাবে উনিশ শতকে তেলের কূপ এবং বিশ শতকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকার জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, তেমনিভাবে একবিংশ শতাব্দীতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আধিপত্যই হবে জাতীয় ক্ষমতা ও নিরাপত্তার মাপকাঠি।
যারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি নীতি, অর্থনৈতিক ইতিহাস বা শিল্পায়নের গতিধারা নিয়ে আগ্রহী। তাদের জন্য এটি অপরিহার্য পাঠ। এমনকি যারা প্রযুক্তিতে একদমই কাঁচা, তারাও মিলারের সাবলীল গদ্যের হাত ধরে এই জটিল বিশ্বে পথ খুঁজে পাবেন। বইটি পড়ার পরে পাঠক আর কখনো তার হাতের স্মার্টফোন, গাড়ির ড্যাশবোর্ড বা ল্যাপটপকে আগের চোখে দেখতে পারবেন না। কারণ সেগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক যুদ্ধের ফসল।

লেখক -ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।