সাইফুল খান
আমেরিকান ও ইরানি সামরিক দর্শনের পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলো দুটি দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলগত পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক কাঠামো ডিজাইন করেছে বৈশ্বিক প্রজেকশন অব পাওয়ার, আগ্রাসী সামরিক অভিযান এবং বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অন্যদিকে ইরান তার সামরিক মতবাদ নির্মাণ করেছে প্রতিরোধ, আত্মরক্ষা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত গভীরতা রক্ষার দর্শনকে ভিত্তি করে। ইরানের এই অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার মডেল যেখানে কম খরচে, দ্রুততার সাথে এবং কার্যকরভাবে প্রতিপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। তা আসলে একটি সচেতন কৌশলগত পছন্দ, দুর্বলতার প্রকাশ নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বিশাল অংশকে ছাড়িয়ে যায়। SIPRI-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল প্রায় ৯১৬ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ। এই বিপুল অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় অস্ত্রের পক্ষে কৌশলগত আখ্যান ও মিথ নির্মাণে মিডিয়া ক্যাম্পেইন, থিঙ্কট্যাঙ্ক ফান্ডিং এবং প্রতিরক্ষা লবিংয়ের মাধ্যমে। এফ-৩৫ প্রোগ্রামের পেছনে ব্যয় হয়েছে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি, অথচ বাস্তব রণক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অর্থের সংকট না থাকলে কার্যকারিতার চেয়ে আধিপত্যের বয়ান নির্মাণই প্রাধান্য পায়। এটাই মার্কিন সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের মূল চরিত্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি ও ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ যাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন, যখন ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করেন, তারা প্রায়শই মার্কিন সামরিক মানদণ্ডকেই একমাত্র রেফারেন্স ফ্রেম হিসেবে ব্যবহার করেন। এই “ইউএস মিলিটারি ক্যাপাসিটি ব্রেইন ফ্রেমিং” থেকে করা বিশ্লেষণ বহু ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর, কারণ এটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন যুদ্ধ-দর্শনকে একই পরিমাপে বিচার করার ভুল করে। কার বেশি স্টিলথ বিমান আছে, কার ক্যারিয়ার ফ্লিট বড় এই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক হয় গ্লোবাল পাওয়ার প্রজেকশনের জন্য, প্রতিরোধমূলক আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্য নয়।
ইতিহাসই এখানে সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫৮ হাজারেরও বেশি সৈন্য হারিয়ে এবং আনুমানিক ৩০ লক্ষ ভিয়েতনামি নাগরিকের মৃত্যুর পরও কৌশলগতভাবে পরাজিত হয়ে প্রত্যাহার করেছে। ইরাকে ২০০৩ সালে “শক অ্যান্ড অ’ কৌশলে বাগদাদের পতন ঘটানো গেলেও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এবং পরবর্তীতে আইএসআইএস-এর উত্থান প্রমাণ করেছে যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব রাজনৈতিক বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। আফগানিস্তানে ২০ বছরের দীর্ঘ উপস্থিতি এবং দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের পরও ২০২১ সালে তালেবানের কাছে কার্যত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গণহত্যা করে ফিরে এসেছে। এর নাম বিজয় নয়। এটি কেবলই ব্যর্থতার ভিন্নরূপ।
ইরানের কৌশলগত লক্ষ্য এই আলোকে অত্যন্ত স্পষ্ট। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে নিজস্ব হাইড্রোকার্বন সম্পদ স্বাধীনভাবে রপ্তানি করার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং গালফ কান্ট্রিগুলোতে মার্কিন ঘাঁটির স্থায়ী উপস্থিতিকে প্রতিহত করা। এটাই তেহরানের প্রতিরোধ কৌশলের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। ২০২৬ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারী ইরান মিডলইস্টের ২৭ টি মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁত প্রতিরোধ হামলা করেছে। ড্রোন ও মিসাইলের লাগাতার এই হামলা না করলে আমাদের বিশ্লেষকরা ইরানের দূর্বলতা প্রমানের চেষ্টায় নেমে পড়তেন। তেলআবিব,বীরসেবা,হাইফা,পশ্চিম তীর, জেরুসালেম সবত্র ইরানের মিসাইলের হিট লেগেছে। এসবই প্রমাণ করে যে ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা কোনো তাত্ত্বিক দাবি নয়, এটি পরীক্ষিত বাস্তবতা।
এই চাপের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা ইতিমধ্যে তার মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তির উল্লেখযোগ্য ক্ষয় স্বীকার করে অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত সামরিক সম্পদ মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছে। এটি নিজেই এক অকাট্য প্রমাণ যে প্রথম ধাক্কায় আমেরিকা ও তার জোট মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগতভাবে প্রত্যাশিত শক্তির অবস্থানে নেই। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে বৈশ্বিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো এককভাবে এগিয়ে। কিন্তু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা এই দুটি বিষয় এক নয়।
সবশেষে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা দরকার। যদি আন্তর্জাতিক জোটশক্তি মিলে হাজার হাজার টন বোমা ফেলে ইরানের নগর সভ্যতাকে ধ্বংস করেও দেয়, তবুও সেটাকে কৌশলগত বিজয় বলা যাবে না। সেটা হবে কেবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আরেকটি নজির। ইরাক ও লিবিয়ার উদাহরণ আমাদের শিখিয়েছে যে রাষ্ট্র ধ্বংস করলে শূন্যতা তৈরি হয়, আনুগত্য নয়। সেই শূন্যতা পূর্ণ হয় প্রতিরোধের নতুন রূপে। তাই এটা এখন প্রায় নিশ্চিত যে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা আর কোনোদিন সেই পুরনো “চালকের আসনে” ফিরে যেতে পারবে না। কোনো বোমায় বা কোনো অবরোধেও না।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পুনর্বিন্যাস ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় ইরানের কৌশলগত ধৈর্য ও প্রতিরোধী দর্শন একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করছে। মনে হয়না এরপরে গাল্ফ কান্ট্রিগুলো একতরফা পশ্চিমের কাছে নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে নতজানু হয়ে থাকবে। বরং উল্টো ইরানের সাথে কৌশলগত এমন সম্পর্কের দিকে যেতে পারে (প্রেডিকশন, ভুল হওয়া স্বাভাবিক) যে স্বার্থগত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারস্য-আরব উভয়ের জন্য অপরিহার্য বিষয় হবে। বিষয়টা এমন হতে পারে দোহা বা রিয়াদের কোন স্থাপনা ধ্বংস হলে তেহরানের স্বার্থে আঘাত লাগবে। অপরদিকে তেহরান বা ইস্ফাহানের কোন স্থাপনা ধ্বংস হলে রিয়াদ,দুবাই বা আম্মানের স্বার্থে আঘাত লাগবে। বিশ্বে কৌশলগত রাজনীতি এখন আর ফ্রেমের ভিতর আটকে থাকেনা। যেকোন কিছু ঘটতে পারে। আর যদি পারস্য-আরব সত্যিই জোটবদ্ধ হয় তবে একটা মাল্টিপোলার সবুজ দুনিয়া আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
