সাইফুল খান
হাকান ফিদানের ছবিতে সয়লাব বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এয়ারপোর্টে পুরো পররাষ্ট্র দফতরের উপস্থিতি দিয়ে শুরু। তারপর জুলাইয়ের নেতৃবৃন্দ, বিরোধীদলের নেতা থেকে শুরু করে সবাই হাকান ফিদানকে পেয়ে মনে হচ্ছে ঘরের কেউ ঘরে ফিরেছে। হাকান ফিদানও ভাগ্যবান। এমন একটা সময়ে এসেছেন সরকার-বিরোধীদল সবাই তাঁকে আন্তরিকভাবে রিসিপশন দিয়ে একাকার। তুরষ্ক ইস্যুতে অবশ্য আমাদের সবারই প্রতিষ্ঠিত সফ্ট কর্নার আছে। সেই ইতিহাস বহু পুরনো, পরের অংশে কিঞ্চিত আলাপ না করলে এই লেখা পূর্ণ হবেনা। হাকান ফিদান ঘুরতে ঘুরতে চলে এলেন? কেন এলেন সেটা হয়তো দু একদিন পরেই জানা যাবে। তবে আগে থেকে যতটুকু জানি, সেটা আবারো আলাপ করি।
বাংলাদেশ এক জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতার মুখে দাড়িয়ে আছে। এরকম পরিস্থিতিতে যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তার প্রতিরক্ষা নীতিকে আধুনিক ও বহুমুখী করা অত্যন্ত জরুরি ।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে ঠিক এই ধরনের একটি বড় পরিবর্তন বা ‘প্যারাডাইম শিফট’ লক্ষ্য করা গেছে। এই সময়ে আঙ্কারা ও ঢাকার মধ্যকার সম্পর্ক কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, একটি গভীর ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে (Strategic Defense Partnership) রূপান্তরিত হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সচিবালয়ের (SSB) প্রধান অধ্যাপক হালুক গোরগুনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো এই অংশীদারিত্বকে এক অভূতপূর্ব গতি প্রদান করে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ওই শাসনামলে তুরস্কের সাথে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সমঝোতাগুলো বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের বাজার নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীল ছিল। তুরস্কের মতো একটি ন্যাটো (NATO) স্ট্যান্ডার্ড সামরিক শক্তির সাথে বড় আকারের চুক্তি করার মাধ্যমে বাংলাদেশ মূলত তার সমরাস্ত্র উৎসের বৈচিত্র্যকরণ (Weapon Source Diversification) নিশ্চিত করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন একক দেশের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পশ্চিমা মানদণ্ডের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে (যেমন ইউক্রেন বা নাগর্নো-কারাবাখ) অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
এই কৌশলগত আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশের আকাশসীমা সুরক্ষায় তুরস্কের তৈরি SİPER (Block-2) দূরপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (SAM) সিস্টেম ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্তকরণ। পূর্বে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনী মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাল্লার এই অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সিস্টেম যুক্ত হওয়ার ফলে দেশের আকাশসীমার গভীরে একটি অভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় বা ‘এন্টি-অ্যাক্সেস/এরিয়া ডিনায়েল’ (A2/AD) জোন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা যেকোনো বহিরাগত বিমান বা ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
আকাশসীমার পাশাপাশি নৌ ও স্থলবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও যুগান্তকারী কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নৌবাহিনী প্রধানের তুরস্ক সফরকালে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন আধুনিক ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার (Asymmetric Warfare) মোকাবিলায় মনোযোগ দিচ্ছে। নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর সুরক্ষায় যুক্ত করা হয়েছে CANiK M2 QCB হেভি মেশিনগান এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা VENOM LR । বর্তমান যুগের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন যেভাবে প্রধান হুমকি হয়ে উঠেছে, তাতে এই রিমোট কন্ট্রোলড অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। একই সাথে স্থলবাহিনীর জন্য তুরস্কের মডুলার প্রযুক্তির Tulpar হালকা ট্যাংক ক্রয়ের চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি সীমান্ত এবং নদীমাতৃক নরম মাটির ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারী মেইন ব্যাটেল ট্যাংকের চেয়ে এই ধরনের গতিশীল ও হালকা ট্যাংক দ্রুত মোতায়েনযোগ্য অপারেশনে (Rapid Deployment) অনেক বেশি কার্যকর।
তবে ওই শাসনামলের প্রতিরক্ষা কূটনীতির সবচেয়ে দূরদর্শী দিকটি ছিল কেবল তৈরি অস্ত্র বা প্রযুক্তি ক্রয় না করে, দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভরতার দিকে মনোনিবেশ করা।
তুরস্কের বিখ্যাত Bayraktar TB2 ড্রোনের ব্যবহারিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশে এই ড্রোনের মেইনটেইন্যান্স হাব এবং যৌথ উৎপাদনের (Co-production) প্রাথমিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন Aselsan, Roketsan বা Baykar) কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) এবং বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা (BOF) ও খুলনা শিপইয়ার্ডের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের যে সমঝোতা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সামরিক লজিস্টিক চেইনকে স্বাবলম্বী করে তুলবে।
ইউনূস সরকারের আমলে তুরস্কের সাথে সম্পাদিত এই সামরিক বোঝাপড়াগুলো কেবল কিছু অস্ত্র কেনার চুক্তি নয়, বরং এটি ‘ফোর্সেস গোল’-এর অধীনে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে স্বনির্ভর করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল। এই সামরিক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্থল, নৌ ও আকাশসীমার সক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করবে। আমি মনে করি হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফর সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। ইন্টারেস্টিংলি সেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সাবেক নিরাপত্তা চীফ এখন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, তাঁর উপর জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের ভাবী সভাপতি। সোনায় সোহাগা কন্ডিশন বিরাজমান।
তুরষ্কের সাথে কি আমাদের সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস নতুন? না। তুরষ্কের সাথে আমাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী পুরনো। খাদেমুল হারামাইন উসমানীদের আমরা খিলাফত মানতাম। সেই সময়ে এই অঞ্চলের ধনী, নবাবেরা আরবে অনুদান পাঠাতেন, হজ্জ্ব যাত্রীদের জন্য। সেই অর্থ যোগ হতো উসমানী তহবিলে। তারমানে তাদের সাথে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কও পুরনো। আজ যেহেতু সামরিক আলাপ। আসুন সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে আনি।
১৬ শতকের শুরুতে পর্তুগীজরা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে মুসলিম বণিকদের জাহাজ ধ্বংস করতে শুরু করে এবং ‘কার্তাজ’ (Cartaz) নামক জোরপূর্বক কর প্রথা চালু করে। লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর দিয়ে বাংলার তথা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের হজের পথ এবং মসলা বাণিজ্যের পথ পর্তুগীজরা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।
১৫১৭ সালে অটোমানরা মিশর জয় করার পর সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং পরবর্তীতে অটোমান নৌ-প্রধানরা (যেমন সায়দি আলী রেইস, পিরি রেইস) পর্তুগীজদের রুখতে বিশাল নৌবহর পাঠান। ১৫৩৮ সাল থেকে ১৫৮০-এর দশক পর্যন্ত আরব সাগর, গুজরাটের দিউ (Diu), এডেন ও ওমানে পর্তুগীজদের সাথে অটোমানদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই তীব্র প্রতিরোধের কারণে পর্তুগীজরা তাদের পুরো শক্তি ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশেই ধরে রাখতে বাধ্য হয়, ফলে তারা স্বাধীনভাবে এসে পুরো বাংলা জয় বা পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার মতো শক্তি ও সুযোগ পায়নি।
পর্তুগীজদের দমনে অটোমানদের সবচেয়ে বড় পরোক্ষ অবদান ছিল সামরিক প্রযুক্তি ও বারুদ সরবরাহ। মোঘল এবং বাংলার সুলতানদের সাথে অটোমানদের গভীর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। অটোমানরা উন্নত মানের কামান, মাস্কেট (বন্দুক) এবং দক্ষ গোলন্দাজ সৈন্য (রুমি সৈন্য নামে পরিচিত ছিল) এই অঞ্চলে পাঠাতো।
বাংলার সুবাদার ও বারো ভূঁইয়ারা পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন, তাতে অটোমানদের এই আগ্নেয়াস্ত্র প্রযুক্তি এবং রণকৌশল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।
মোঘল সাম্রাজ্য মূলত একটি স্থলভিত্তিক শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল, তাদের শক্তিশালী কোনো “ব্লু-ওয়াটার নেভি” বা গভীর সমুদ্রের নৌবাহিনী ছিল না। বাংলার সুবাদাররা নদীভিত্তিক সুরক্ষার জন্য ‘নওয়ারা’ (Mughal River Navy) গড়ে তুলেছিলেন, যা নদীপথে জলদস্যু দমনে কার্যকর হলেও গভীর সমুদ্রে পর্তুগীজদের বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর সাথে পারতো না। এই শূন্যতা পূরণে মুসলিম বিশ্ব তথা বাংলার শাসকরা মানসিকভাবে অটোমান নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করতেন, যাতে তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় পর্তুগীজদের ব্যস্ত ও চাপে রাখতে পারে।
অটোমানদের মূল নৌঘাঁটি ছিল লোহিত সাগরের সুয়েজ এবং পারস্য উপসাগরের বসরায়। সেখান থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে স্থায়ী নৌঘাঁটি স্থাপন করা তৎকালীন ভৌগোলিক ও লজিস্টিক দিক থেকে অটোমানদের জন্য অসম্ভব ছিল। তদুপরি, ১৫৮০ সালের পর অটোমানরা ইউরোপের যুদ্ধে বেশি জড়িয়ে পড়ে এবং ভারত মহাসাগরে তাদের নৌ-অভিযান কমিয়ে দেয়।
অটোমানদের পরোক্ষ সহায়তার পর, বাংলার মাটিতে পর্তুগীজ জলদস্যুদের চূড়ান্তভাবে এবং সরাসরি দমন করেছিলেন মোঘল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ। ১৬৬৬ সালে তিনি ওলন্দাজদের (ডাচ) আংশিক কূটনৈতিক সহায়তায় এবং মোঘল নওয়ারা (নৌবহর) নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে এক বিশাল অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের দুর্গ গুঁড়িয়ে দেন এবং চট্টগ্রামকে পুরোপুরি জলদস্যুমুক্ত করে মোঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন (যার নাম দেওয়া হয়েছিল ইসলামাবাদ)।
এত কথার শেষ কথা, হাকান ফিদানের এই সফর মোটামুটি সামরিক চুক্তির সফর। ভারতের এলার্জি দেখে অনুমান করে নেবেন।
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
