নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুবর্ণক্ষণ

অনলাইন ডেস্ক
জুন ৯, ২০২৬ ৫:২০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

 

সাইফুল খান

২ জুন ২০২৬। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভোট গণনা শেষ হতেই কূটনৈতিক মহলে এক অন্যরকম উত্তেজনা। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের প্রার্থীকে ৯৯ বনাম ৯১ ভোটে পরাজিত করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের জনগনের তরফ থেকে অভিনন্দন। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর এই পদে আসীন হওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এক বছরের এই মেয়াদকে ঢাকার নীতিনির্ধারণী মহল ইতোমধ্যে “কূটনৈতিক গোল্ডেন পিরিয়ড” হিসেবে চিহ্নিত করছে। কিন্তু এই বিশেষণটি আবেগের নয়, কৌশলগত বাস্তবতার। কারণ UNGA সভাপতির আসন নিছক আনুষ্ঠানিক মর্যাদার পদ নয়। এটি বৈশ্বিক আলোচ্যসূচি (agenda) নির্মাণের, উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন আহ্বানের এবং ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নৈতিক লিভারেজ প্রয়োগের এক বিরল সুযোগ।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারবে? আর করতে হলে ঠিক কোন ইস্যুগুলোতে, কোন কৌশলে অগ্রসর হওয়া দরকার?

রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে, যা প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য চাপ তৈরি করছে। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং ইউক্রেন, গাজা, ইরান,মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর তহবিল ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ নেই।

ড. খলিলুর রহমান এর আগে সরকারের “রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপ্রতিনিধি” হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ এই ফাইলের প্রতিটি প্যাঁচ তার জানা। UNGA সভাপতি হিসেবে তিনি এই ইস্যুকে সরাসরি সাধারণ পরিষদের মূল বিতর্কতালিকায় স্থান দিতে পারেন। ওআইসি, আসিয়ান এবং পশ্চিমা দাতাদেশগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি “গ্লোবাল রোহিঙ্গা ফান্ড” এবং “থার্ড-কান্ট্রি রিসেটেলমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক” প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনরুজ্জীবিত করা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আইনি চাপ তৈরি করা এগুলো আর অলীক নয়, বরং সভাপতির কলমের খোঁচায় নির্ধারণযোগ্য।

আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা: দ্বিপাক্ষিক টেবিলের দুর্বলতায় ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতের সাথে পানিবণ্টনের কোনো ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থায় আজো পৌঁছাতে পারেনি। তিস্তা চুক্তি প্রায় দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক জিম্মিদশায়। প্রতি শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গে পানির হাহাকার, আর বর্ষায় ভারতের হঠাৎ পানি ছাড়ায় আকস্মিক বন্যা এই চক্র ভাঙা যাচ্ছে না।

এখানে জাতিসংঘের চেয়ারের শক্তি অনন্য। পানির অধিকার আজ আর শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের অংশ। ড. খলিলুর রহমান “International Transboundary Water Governance” নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে পারেন এবং ভাটির দেশগুলোর পানিপ্রাপ্তির আইনি অধিকার নিশ্চিতকারী একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের খসড়া প্রণয়নে নেতৃত্ব দিতে পারেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি টার্গেট না করেও, এই প্রক্রিয়া বহুপাক্ষিক নিয়মনীতির এমন এক কাঠামো তৈরি করবে যেখানে ভারতের মতো উজানের দেশগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারির মুখে পড়বে।

সীমান্ত হত্যা: বৈশ্বিক মানবাধিকার আইনের ছায়ায় দ্বিপাক্ষিক জবাবদিহিতা একেবারেই নেই ভারতের তরফ থেকে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) কর্তৃক নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা একটি নথিভুক্ত, দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার সংকট। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অধিকার- এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। “জিরো ক্যাজুয়ালটি”র দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি বারবার কাগজে-কলমেই থেকে গেছে।

UNGA সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (UNHRC)-এর সাথে সমন্বয় করে বিশ্বব্যাপী “সীমান্তে অ-মারাত্মক বলপ্রয়োগ নীতিমালা” (Non-Lethal Border Enforcement Standards) সংক্রান্ত একটি রেজুলেশন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উচ্চারণ না করেও, আন্তর্জাতিক ওয়াচডগ সংস্থাগুলোর দৃষ্টি এই সীমান্তে ফেরানো সম্ভব। এর ফলে যেকোনো দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির চাপ অনুভব করবে।

জলবায়ু অর্থায়ন: প্রতিশ্রুতির ফাঁদ থেকে বাস্তব অনুদানের পথে হাটার সময় এখন।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০.৪৭ শতাংশের জন্য দায়ী, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দিক থেকে শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত স্থান পায়। COP-এর পর COP-এ “লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড” ঘোষণা হয়, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভাটির দেশগুলো সেই অর্থ পায় না।

ড. খলিলুর রহমানের ঘোষিত ৬ দফা কর্মপরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু জলবায়ু পরিবর্তন। সভাপতির পদ থেকে তিনি সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে “Climate Vulnerable Forum” দেশগুলোর জন্য একটি সহজলভ্য, ন্যূনতম আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জলবায়ু তহবিল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস করাতে পারেন। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় সুরক্ষায় সরাসরি বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত হতে পারে।

এলডিসি(LDC) উত্তরণ: ২০২৬ সালেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) তালিকা থেকে বের হচ্ছে। এটি উন্নয়নের স্বীকৃতি, কিন্তু একই সাথে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য প্রাপ্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা (GSP/EBA) বাতিলের ঘণ্টা বেজে গেছে। এই ধাক্কা সামলাতে না পারলে দেশের বৃহত্তম রপ্তানিখাত মারাত্মক সংকটে পড়বে।

ড. খলিলুর রহমান UNCTAD-এ ২৫ বছর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগানোর সময়। UNGA-র মাধ্যমে এমন একটি রেজুলেশন আনা সম্ভব যেখানে LDC-তালিকা থেকে উত্তরণকারী দেশগুলোকে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৫ বছরের “Smooth Transition Period” অর্থাৎ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার বর্ধিত মেয়াদ দেওয়ার বিধান থাকবে। এই একটি সাফল্যই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক বিপজ্জনক ক্লিফ থেকে বাঁচাতে পারে।

পরিশেষ,

UNGA সভাপতির পদটি এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অরাজনৈতিক মঞ্চগুলোর একটি। এই চেয়ারে যিনি বসেন, তিনি কার্যত এক বছরের জন্য বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক কূটনীতির ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করেন। ড. খলিলুর রহমানের সামনে সেই সুযোগ এখন উন্মুক্ত।

বাস্তবতা হলো, কূটনৈতিক সাফল্য কেবল মঞ্চের আলোয় নয় পর্দার আড়ালের লবিং, নিরলস দরকষাকষি এবং জোটগঠনের কৌশলেই নির্মিত হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন থেকে জলবায়ু অনুদান, পানির হিস্যা থেকে সীমান্ত হত্যা প্রতিটি ইস্যুতেই আগামী এক বছর বাংলাদেশের কাছে একটি অসাধারণ কৌশলগত জানালা খোলা থাকবে। এই জানালা দিয়ে কতটা আলো ঢোকানো যাবে, তা নির্ভর করবে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও সাহসের ওপর।

লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।