সাইফুল খান
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির উত্থান কেবল একটি সাময়িক কৌতুক নয়, বরং এটি সমকালীন দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল রাজনীতি ও নাগরিক অসন্তোষের এক অভূতপূর্ব মাইলফলক। ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তিনি একটি মামলার শুনানিতে ভুয়া ডিগ্রিধারী ও সমালোচনাকারীদের ইঙ্গিত করে তেলাপোকা এবং পরজীবী শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন বলে গণমাধ্যমে আসে। এই মন্তব্য ভারতের তরুণ সমাজের একাংশকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্নাতক তথা পেশাদার পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দিপক এই শব্দটিকে হাতিয়ার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক দল ককরোচ জনতা পার্টি গড়ে তোলেন।
এটি কোনো সাধারণ মিম পেজ নয়, বরং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট, বিশেষ করে নিট এবং সিবিএসই-র মতো জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যায়নে চরম অনিয়ম এবং তীব্র বেকারত্বের বিরুদ্ধে ভারতের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি প্রতীকী রূপ।
গতকাল ৬ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে এই দলের ব্যানারে তরুণদের একটি বড় অংশের রাজপথ আন্দোলন প্রমাণ করে যে, এই অসন্তোষ এখন আর শুধু ইন্টারনেটের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই।
এই আন্দোলনের জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি এবং অবিশ্বাস্য ডিজিটাল জনপ্রিয়তা ভারতের শাসক শিবিরকে এক ধরনের বড় কৌশলগত অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে এই আন্দোলনের পেজের ফলোয়ার সংখ্যা যখন খুব দ্রুত ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি বিশ লাখ পার করে ভারতের মূল শাসকদল বিজেপির অফিসিয়াল হ্যান্ডেলকেও ছাড়িয়ে যায়, তখন থেকেই ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণে বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ডালপালা মেলতে শুরু করে। তার উপর তাদের মুখে ছিলো ইনকিলাব জিন্দাবাদের মত সাম্প্রতিক বাংলাদেশি গনআন্দোলনের স্লোগান।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত কিছু বিশ্লেষক এবং কট্টরপন্থী গণমাধ্যম এই আন্দোলনকে মোদি সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত ট্রোজান হর্স বা গোপন চাল হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশে প্রথাগতভাবেই যেকোনো অভ্যন্তরীণ বড় আন্দোলন বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে পাকিস্তান, চীন কিংবা বাংলাদেশের হাত থাকার তত্ত্ব সামনে আনা হয়। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা বিতর্ককে এক সুতোয় গেঁথে ভারতের কিছু ডানপন্থী পোর্টাল দাবি করার চেষ্টা করছে যে, মোদি সরকারকে চাপে ফেলতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কোনো সাইবার গ্রুপ বা সুসংগঠিত ‘টুলকিট’ এর পেছনে কাজ করছে। তারা মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুলের এমন নিখুঁত ও ব্যাপক ব্যবহার সাধারণ যুবসমাজের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব নয়।
তবে আন্তর্জাতিক এবং মূলধারার নির্ভরযোগ্য ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর গভীর অনুসন্ধান সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। রয়টার্স, আল জাজিরা বা ভারতের দ্য হিন্দু ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তান, চীন বা বাংলাদেশের সরাসরি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মদদ থাকার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা প্রমাণ মেলেনি। প্রকৃতপক্ষে, একে বিদেশি চক্রান্ত হিসেবে তড়িঘড়ি করে লেবেল করার পেছনে রয়েছে শাসকদলের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষা কৌশল, যাতে মূল অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে নজর ঘোরানো যায়। ভারতের বর্তমান মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশই তরুণ এবং তারা কর্মসংস্থান ও শিক্ষা খাতের এই স্থবিরতায় সরাসরি ভুক্তভোগী। এই তরুণ ভোটাররা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে অত্যন্ত পারদর্শী হওয়ায় তারা পশ্চিমা বিশ্বের মিম-ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণার আদলে ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এক অভিনব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মোদি সরকারের জন্য এই আন্দোলন কোনো সরাসরি সশস্ত্র বা সহিংস হুমকি না হলেও, এটি এমন এক অদৃশ্য ও তরল প্রতিপক্ষ যার কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় প্রথাগত কাঠামো নেই, ফলে একে সহজে দমন করা যাচ্ছে না। ভারতের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে বারবার বিদেশি চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা, মূলত যুবসমাজের প্রকৃত জনদাবি ও ক্ষোভকে আড়াল করার একটি সাময়িক রাজনৈতিক বয়ান মাত্র।
লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
