নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আমার চোখে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

অনলাইন ডেস্ক
মে ৩০, ২০২৬ ৫:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 

সাইফুল খান

ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে, কংগ্রেস নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ও তার দূরদর্শিতা নিয়ে আমার গভীর দ্বিমত ও সমালোচনা রয়েছে। আবেগ বা অন্ধ শ্রদ্ধা সরিয়ে রেখে যদি আমরা দেশভাগ-পূর্ববর্তী ইতিহাস এবং দেশভাগ-পরবর্তী ভারতীয় মুসলমানদের বাস্তবতার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করি, তবে স্পষ্ট দেখা যায় যে তার রাজনৈতিক ভুল, কৌশলগত ব্যর্থতা এবং কংগ্রেসের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকারান্তরে কোটি কোটি অবশিষ্ট মুসলিমকে এক অন্তহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আমার এই সমালোচনার সপক্ষে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিল নিচে তুলে ধরছি:

জওহরলাল নেহেরুকে অন্ধ সমর্থন ও ক্যাবিনেট মিশন ধ্বংসের দায়

মওলানা আজাদ নিজে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৬ সালে যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হচ্ছিল, তখন তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে জওহরলাল নেহেরুকে পরবর্তী সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। এটিকে আমি আজাদের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও কৌশলগত ভুল মনে করি।

তথ্যসূত্র ও প্রমাণ: মওলানা আজাদ নিজেই তার আত্মজীবনী ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম (India Wins Freedom) এ এই ভুলের কথা স্বীকার করে গেছেন। তিনি লিখেছেন:

“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল যে আমি সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলাম এবং জওহরলালকে এই পদের জন্য মনোনীত করতে মহাত্মা গান্ধীকে রাজি করিয়েছিলাম… এটি এমন একটি ভুল যা আমি আজ পর্যন্ত অনুশোচনা ও গভীর দুঃখের সাথে স্মরণ করি।”

ভুলের পরিণতি:সভাপতি হওয়ার পরপরই ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই বোম্বাইয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে নেহেরু একটি অবিবেচকের মতো মন্তব্য করেন যে, কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানের (যা অখণ্ড ভারতের অধীনে মুসলিম প্রধান প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা বলেছিল) শর্তে বাধ্য নয়। নেহেরুর এই একগুঁয়েমি জিন্নাহকে ক্যাবিনেট মিশন থেকে সরে আসতে বাধ্য করে এবং দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আজাদ যদি নিজে সভাপতি থাকতেন বা নেহেরুকে অন্ধভাবে ক্ষমতায় না বসাতেন, তবে ভারতের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।

হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান বুঝতে না পারা এবং মুসলমানদের “ফাঁদে” ফেলা

আজাদ মুসলমানদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, কংগ্রেসের অধীনে তারা একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তিনি কংগ্রেসের ভেতরের কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং দক্ষিণপন্থী নেতাদের (যেমন: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, মদন মোহন মালব্য) আসল চরিত্র ও এজেন্ডা চিনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন।

তথ্য ও বাস্তব চিত্র: দেশভাগের পরপরই যখন দিল্লির বুকে মুসলমানদের ওপর গণহত্যা ও উচ্ছেদ অভিযান চলছিল, তখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল দিল্লির মুসলমানদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাদের “পাকিস্তানের চর” হিসেবে সন্দেহ করতে শুরু করেন। আজাদ নিজে ক্যাবিনেট মিটিংয়ে প্যাটেলের এই মুসলিম-বিদ্বেষী মেন্টালিটির প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজাদ মুসলমানদের এক কাল্পনিক ‘ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের’ স্বপ্ন দেখিয়ে কার্যত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী (Majoritarian) রাষ্ট্রের জালে চিরতরে বন্দি করে দিয়ে গেছেন।

কংগ্রেসের “মুসলিম শো-বয়” হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মওলানা আজাদকে কংগ্রেসের “মুসলিম শো-বয়” (Show Boy) বলে অভিহিত করেছিলেন, যা আজ আমার কাছে এক নিষ্ঠুর বাস্তব সত্য বলে মনে হয়। কংগ্রেস আজাদকে বড় পদে বসিয়ে বিশ্বকে দেখাত যে তারা মুসলমানদেরও দল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আজাদের কোনো মতামতই নেওয়া হতো না।

তথ্য ও প্রমাণ: ১৯৪৭ সালে মাউন্টব্যাটেন যখন দেশভাগের চূড়ান্ত পরিকল্পনা (Mountbatten Plan) পেশ করেন, তখন মওলানা আজাদ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তার প্রিয় সহকর্মী জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেল আজাদের মতামতকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশভাগের নীতি মেনে নেন। এমনকি মহাত্মা গান্ধীও প্যাটেল-নেহেরুর চাপে আত্মসমর্পণ করেন। আজাদ কংগ্রেসের কেবল একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন, কিন্তু মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় চূড়ান্ত সময়ে তার কোনো রাজনৈতিক ওজন বা কর্তৃত্ব ছিল না।

অবশিষ্ট ভারতীয় মুসলমানদের সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতা

দেশভাগের পর ভারতে থেকে যাওয়া প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলমান যখন চরম প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও নিরাপত্তার সংকটে পড়ে, তখন আজাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার অন্যতম সিনিয়র সদস্য ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষস্তরে থেকেও তিনি মুসলমানদের সুরক্ষায় বা তাদের অধিকার আদায়ে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি।

উর্দূ ভাষার পতন: উত্তর ভারতের মুসলমানদের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল উর্দূ ভাষা। স্বাধীনতার পর উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে উর্দূকে কার্যত সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাসিত করা হয়। একজন প্রখ্যাত উর্দূ পণ্ডিত এবং খোদ শিক্ষামন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আজাদ উর্দূ ভাষার এই প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু ঠেকাতে পারেননি।

চাকরি ও প্রশাসনে বৈষম্য: পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের নিয়োগ রাতারাতি সংকুচিত হয়ে পড়ে। আজাদ এই বৈষম্য দূর করতে বা মুসলমানদের জন্য কোনো বিশেষ আইনি সুরক্ষা বা কোটার ব্যবস্থা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।

জামে মসজিদের ভাষণ: দায় এড়ানো এবং ক্ষতে নুনের ছিটা

১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর দিল্লির জামে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে মওলানা আজাদ যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটিকে আমি ভুক্তভোগী মুসলমানদের প্রতি চরম উপহাস এবং নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখি।

বক্তব্যের অংশ:তিনি আতঙ্কিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “আজ তোমাদের কাঁপন দেখে আমার মনে হচ্ছে যে তোমরা আমার কথা শোনোনি… আমি তোমাদের বলেছিলাম দেশভাগ বিপর্যয় ডেকে আনবে।” মুসলমানদের পিঠে ছুরি মেরে আবার মুসলমানদেরই দায় দিয়েছেন তিনি।

আমার মূল্যায়ন: যখন রাষ্ট্র মুসলমানদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, যখন হাজার হাজার মুসলমান দিল্লির শরণার্থী শিবিরে খোলা আকাশের নিচে স্বজন হারানোর আর্তনাদ করছে, তখন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে নিজের এবং নিজের দলের ব্যর্থতা স্বীকার না করে, উল্টো ভুক্তভোগী সাধারণ মুসলমানদের তিরস্কার করা ছিল অত্যন্ত অমানবিক। একজন প্রতারক যেভাবে প্রতারনা করে তিনিও অবশিষ্ট মুসলমানদের তাই করেছেন।

আমার দৃষ্টিতে, মওলানা আজাদের অখণ্ড ভারতের আদর্শ হয়তো তাত্ত্বিকভাবে সুন্দর ছিল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা ছিল সম্পূর্ণ আত্মঘাতী ও বাস্তবতাবর্জিত। জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের অন্ধ বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি ভারতের মুসলমানদের এমন এক রাজনৈতিক সমীকরণে বন্দি করে গেছেন, যেখানে তারা চিরদিনের জন্য এক প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং প্রতিনিয়ত নিজেদের “দেশপ্রেমের পরীক্ষা” দিতে বাধ্য হওয়া এক দোলাচলের মধ্যে পড়ে গেছে। আজাদের এই ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দিতে হচ্ছে।

 

লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।