মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য—
এনবিআরে’র কার্যক্রম, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নীতি ও পদ্ধতি এবং এর আধুনিকায়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এতোক্ষণ আমি আপনাদের দেয়া বক্তব্য শুনেছি। আজকের এই রাজস্ব সম্মেলন– আমি একটি সাধারণ ‘সম্মেলন’ হিসেবে দেখিনা। কারণ, আপনাদের অর্থাৎ এনবিআরের কার্যক্রমের সাফল্যের উপরই সরকারের সকল উন্নয়ন পরিকল্পপনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। সুতরাং, আমি আশা করি, আজকের এই ‘সম্মেলন’ হবে আগামী দিনে আপনাদের আরো অধিক সাফল্যের পথ নির্দেশনার ‘সম্মেলন’।
আমরা কি ধরণের ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্য দিয়ে
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, এটি দেশের যে কোনো শ্রেণী পেশার মানুষের চেয়ে আপনারা বেশি অবগত। আপনারা জানেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও মুক্ত থাকতে পারেনি।
এনবিআরে’র নীতি নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যাক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা কারো প্রতি বিরূপ মনোভাব কিংবা রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা এনবিআরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এনবিআরের উপর মানুষের আস্থা বিনষ্ট হয়েছিল।
ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। দেশের জনগণ বর্তমানে এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যাশা করে। দেশের জনগণ বিশেষ করে করদাতাগণ এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই জন আস্থা অর্জন সম্ভব। করদাতাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব আপনাদেরকেই নিতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর।
বিতাড়িত পতিত পলাতক ফ্যাসিস্ট চক্র দেশকে চূড়ান্তভাবে একটি ঋণনির্ভর- আমদানি নির্ভর
রাষ্ট্রে পরিণত করে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়েছে।
বর্তমান সরকার শুধুমাত্র বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার নীতি বিরোধী। সুতরাং, রাজস্ব আহরণে আমাদেরকে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ আয়ের ক্ষেত্র এবং উৎস্য বাড়াতে হবে।
আয়ের ক্ষেত্র এবং উৎস্য বাড়াতে সরকার গণমুখী উৎপাদন নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্পায়ন বাড়বে। মানুষের আয় বাড়বে। ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে এবং জনগণ আরও উন্নত সরকারি সেবা পাবে।
এক্ষেত্রেও এনবিআরের আরও দক্ষ এবং কার্যকর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একের পর এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যবসার নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে। নানারকম চ্যালেঞ্জ তৈরী হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কর বা রাজস্ব ব্যাবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্ভাবনা সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদেরকে বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি।
Digital Economy,
E-commerce,
Transfer Pricing,
International Taxation,
Trade Finance,
Financial Crime,
Money Laundering,
Artificial Intelligence, Data Analytics এর মতো বিষয়গুলো সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নলেজ থাকতেই হবে।
শুধু প্রচলিত কর আইন জানা থাকায় যথেষ্ট নয়।
একজন আধুনিক রাজস্ব কর্মকর্তাকে অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামগ্রিক কর্মক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। একটি ভালো রাজস্ব ব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার যেখানে মানুষ কর দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন। কর প্রদান পদ্ধতি যথাসম্ভব দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত এবং সহজ করা দরকার।
অনলাইনে কর পরিশোধ করা সম্ভব হলে করদাতার অফিসে আসার দরকার নেই। যথানিয়মে কর আদায় করলে এটি একজন করদাতার জন্য যেমন লাভজনক
একইসঙ্গে রাষ্ট্র এবং সরকারের জন্যও ইতিবাচক,
আপনাদের আচরণ এবং কার্যক্রমের মাধ্যমে করদাতার মনে এই বিশ্বাস জন্ম নিলে কর আদায় অনেকে সহজ হয়ে যেতে বাধ্য।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমানে দেশে Tax-GDP ratio এখনও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
করভিত্তি এখনও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক। সীমিত সংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে।
করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। সারাবিশ্বের জন্যই একটি বিষয় প্রযোজ্য… সেটি হলো আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বেশি কর আদায় করা নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা।
একজন করদাতা যিনি নিয়মিত কর আদায় করছেন রাষ্ট্র যেমন তাকে সম্মানিত করবে একইভাবে যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহার করছেন তাকেও কর প্রদানের জন্য যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ বা আগ্রহী করে তুলতে হবে।
কর ব্যবস্থাপনা কিংবা কর আদায় পদ্ধতি সহজ এবং
দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। যাতে মানুষ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কর আদায়ে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।
আমার কাছে মনে হয়, একই করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদেরকে শনাক্ত করে
তাদেরকে যথাযথ নিয়মে করের আওতায় আনার ব্যবস্থা
করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
এ জন্য ডিজিটালি আধুনিক ডাটা ভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
ভ্যাট আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজস্ব উৎস। তবে ভ্যাট ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসা বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয় সেটিও আপনাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে।
কাস্টমস ভ্যাট কিংবা ট্যাক্স আদায় শুধু এনফোর্সমেন্ট এর বিষয় নয়। বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর ভ্যাট- ট্যাক্স দাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরী হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়।
সুতরাং, দক্ষ ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে মানুষ ভয় করবে না— বিশ্বাস করবে।
আমি আশা করি, দেশের স্বার্থে আপনারা এনবিআর-কে
জনগণের আরো বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন।
এবার একটি আশা, সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশার কথা বলে
আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই, গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত সময়টিতে রাজস্ব আহরণের পরিমান ছিল ইতিবাচক। এটি প্রমাণ করে,
আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন, এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন, ইনশাআল্লাহ।
শুধু প্রয়োজন দেশপ্রেম আর আন্তরিকতা।
আসুন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা সবাই মিলে
একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলি।
