(১৭৯৩ সালে আইন করে যে সম্পদ লুটে নেয়া হয়েছিলো, সেই সম্পদ আজ কোথায়, কার কাছে? পড়া শেষে এই প্রশ্নটি নিজেকে করবেন)
সাইফুল খান
মধ্যযুগের বাংলায় কিংবা সুবিশাল দিল্লির সালতানাতে যখন কোনো পথিক কোনো এক সুদৃশ্য মসজিদ কিংবা মাদ্রাসার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন বাতাসে ভেসে আসত পবিত্র কোরআনের সমবেত তিলাওয়াত কিংবা শিক্ষার্থীদের ব্যাকরণ ও দর্শনের তুমুল বিতর্ক। সেই সুদূর অতীতে আজকের মতো কোনো শিক্ষাবোর্ড ছিল না, ছিল না কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি বাজেট বা ডিজিটালাইজড ব্যাংকিং ব্যবস্থা। অথচ, একেকটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শত শত ছাত্র বছরের পর বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া, পোশাক এবং উন্নতমানের শিক্ষা লাভ করত। শিক্ষকদের দেওয়া হতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মানী। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কী ছিল এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অর্থনৈতিক উৎস? কীভাবে যুগের পর যুগ ধরে টিকে থাকত এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে মধ্যযুগীয় মুসলিম প্রশাসনের একটি সুসংগঠিত, দূরদর্শী এবং অনন্য অর্থনৈতিক দর্শনের ভেতর। যার মূল ভিত্তি ছিল ‘ওয়াকফ’ বা করমুক্ত ভূ-সম্পত্তি অনুদান ব্যবস্থা।
ইসলামি শরিয়াহ এবং মধ্যযুগীয় প্রশাসনিক পরিভাষায় একে বলা হতো ‘আওকাফ’, ‘মদদ-ই-মাআশ’ কিংবা ‘সয়ূরগাল’। সহজ বাংলায়, এটি ছিল জনকল্যাণ ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে চিরতরে উৎসর্গীকৃত এমন এক স্থাবর সম্পত্তি, যা কখনো কেনাবেচা, হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টন করা যেত না। যখনই কোনো সুলতান, সুবেদার, আমীর কিংবা কোনো বিত্তশালী ব্যক্তি একটি মসজিদ বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতেন। তাঁর প্রথম এবং প্রধান কাজ হতো সেই প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য তার সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ কৃষি জমি, বাজার কিংবা পরগনা স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়া বা ওয়াকফ করে দেওয়া।
তৎকালীন দিল্লির সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলকের দরবারি ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দিন বারানী তাঁর তারিখ-ই-ফিরুজশাহী গ্রন্থে এ ব্যবস্থার একটি চমৎকার চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সুলতানরা কীভাবে মাদ্রাসার ব্যয়ভার বহনের জন্য আস্ত গ্রাম বা বিশাল ভূখণ্ড দান করতেন। এমনকি সুলতানি বাংলার সূচনালগ্নে, তেরো শতকে যখন গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী বা সুফি সাধক হযরত জলালুদ্দিন তাবরিজি (র.)-এর মতো ব্যক্তিত্বরা এ অঞ্চলে ইসলাম ও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছিলেন। তখন থেকেই এই ঐতিহ্য শুরু হয়। পান্ডুয়ার বিখ্যাত ‘বাইশ হাজারী ওয়াকফ স্টেট’ এর জীবন্ত প্রমাণ, যা শত শত বছর ধরে একটি বিশাল লঙ্গরখানা ও মাদ্রাসার ব্যয় নির্বাহ করে এসেছে।
মুঘল আমলে এই ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সম্রাট আকবরের দরবারের প্রাজ্ঞ ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে ‘সদর-উস-সুদুর’ নামক একটি বিশেষ দপ্তরের উল্লেখ করেছেন। এই দপ্তরের প্রধান কাজই ছিল সাম্রাজ্যের মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর খোঁজখবর রাখা এবং সেগুলোর অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য করমুক্ত ‘মদদ-ই-মাআশ’ (জীবনধারণের জন্য সাহায্য) ভূমি বণ্টন করা। ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই মুঘল শাসকেরা জঙ্গল কেটে বসতি ও চাষাবাদ করার শর্তে শত শত একর জমি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন।
এই ব্যবস্থার সৌন্দর্য ছিল এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন। ওয়াকফকৃত জমিগুলো রাষ্ট্রীয় সব ধরনের ভূমিরাজস্ব বা ‘খরাজ’ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকত। ফলে, দিল্লির সিংহাসনে কোন সুলতান বসলেন আর কে বিদায় নিলেন, কিংবা কোনো স্থানীয় জমিদার দেউলিয়া হয়ে গেলেন কিনা, তাতে মাদ্রাসার দৈনন্দিন পরিচালনায় কোনো আঁচ আসত না। এই জমিগুলো পরিচালনার দায়িত্ব থাকত একজন ‘মুতাওয়াল্লি’ বা তত্ত্বাবধায়কের ওপর। জমি থেকে যে ফসল উৎপাদিত হতো বা যে রাজস্ব আসত, তা সরাসরি মাদ্রাসার সিন্দুকে জমা হতো। তা দিয়ে যেমন বড় বড় লাইব্রেরির জন্য পাণ্ডুলিপি কেনা হতো, তেমনি দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসাফির ও ছাত্রদের তিন বেলার আহার ও আবাসন নিশ্চিত করা হতো।
একই সাথে এই অর্থনৈতিক মডেলটি পরোক্ষভাবে দেশের কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখত। অনেক সময় প্রত্যন্ত, অনাবাদী বা ঘন জঙ্গল ঘেরা অঞ্চল মসজিদ-মাদ্রাসার নামে দান করা হতো। ফলস্বরূপ, শিক্ষক, ছাত্র এবং স্থানীয় কৃষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় সেসব দুর্গম অঞ্চল উর্বর ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতো, নতুন নতুন জনপদ গড়ে উঠত। শিক্ষা বিস্তারের সমান্তরালে দেশজুড়ে চলত এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব।
এই স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রথম বড় আঘাত আসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ এবং পরবর্তীকালে ১৮২৮ সালের ‘রেজিউমিশন রেগুলেশন’ বা বাজেয়াপ্তকরণ আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ঐতিহ্যবাহী করমুক্ত ওয়াকফ ও লাখেরাজ জমিগুলো কেড়ে নেওয়া শুরু করে। শত শত বছর ধরে চলে আসা আয়ের উৎসটি রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বিখ্যাত ইংরেজ সিভিলিয়ান ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস গ্রন্থে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে স্বীকার করেছেন, কীভাবে এই আইনগুলোর মাধ্যমে বাংলার মুসলিমদের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা ও বনেদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা মধ্যযুগের সেই সুউচ্চ মিনার আর প্রাচীন মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ দেখি, তখন কেবল তাদের স্থাপত্যশৈলীই আমাদের মুগ্ধ করে না, বরং বিস্মিত করে তাদের সেই সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক চেতনা। যেখানে শিক্ষার আলো ছড়ানোর পেছনে কোনো চাতুর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক মুনাফা ছিল না, বরং ছিল একটি স্থায়ী, স্বনির্ভর ও মানবিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। আমরা কি আজো সেই ঐতিহ্যে ফিরতে পেরেছি?
লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
