সাইফুল খান
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, একটি জাতির সত্যিকারের উত্থান নির্ভর করে তার নেতৃত্বের দূরদর্শিতার উপর। শুধু অভ্যন্তরীণ নীতিতে নয়, বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বেইজিং সফর এবং ‘তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ (TRCMRP)-এ চীনের সম্পৃক্ততার আনুষ্ঠানিক আলোচনা সেই দূরদর্শিতারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এই পদক্ষেপ কেবল একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গণ্ডি অতিক্রম করেছে তা নয়, বাংলাদেশের কৌশলগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও পরিবেশগত ভবিষ্যতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কৌশলগত লাভ: স্বায়ত্তশাসনের নতুন সংজ্ঞা
আধুনিক রাষ্ট্রনীতিতে “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” বলতে বোঝায় একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা। বাহ্যিক চাপের কাছে নতি না স্বীকার করে নিজের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার ঠিক এই নীতিতেই অবিচল থেকে চীনের সাথে তিস্তা প্রকল্পে সম্পৃক্ততার পথ বেছে নিয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির সাথে একমাত্র নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থেকে বের হয়ে বহুমুখী অংশীদারিত্বের দিকে যাওয়া এটি দুর্বলতার নয়, বরং পরিপক্ব রাষ্ট্রচিন্তার লক্ষণ। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক চ্যানেলে কোনো ফলপ্রসূ অগ্রগতি না হওয়ায়, বর্তমান সরকার একটি কার্যকর “প্ল্যান-বি” নিশ্চিত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে এমন একটি অবস্থান থেকে কথা বলতে পারবে যেখানে তার হাতে বিকল্প আছে এবং বিকল্প থাকাটাই কূটনৈতিক শক্তির মূল উৎস।
দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে একটি স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। দেশ বিশেষ কারো পক্ষের নয়, বরং নিজের জনগণের পক্ষে।
অর্থনৈতিক লাভ: উত্তরাঞ্চলের রূপান্তর
তিস্তা নদীর অববাহিকায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। প্রতি শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চল ভয়াবহ পানি সংকটে পড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় আবার বর্ষা মৌসুমে বন্যায় হাজার হাজার কৃষক সর্বস্ব হারান।
চীনের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে নদী খনন, ড্রেজিং, রিজার্ভার নির্মাণ এবং সমন্বিত সেচ ব্যবস্থাপনা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরব্যাপী সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়বে এবং উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা চলছে, তা ভাঙতে শুরু করবে। নদী তীরবর্তী এলাকায় শিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে উঠবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই একটি প্রকল্পই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বের করে একটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মেরুতে পরিণত করতে পারে।
রাজনৈতিক লাভ: জনআস্থার ভিত্তি
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রকল্প তারেক রহমান সরকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বছরের পর বছর ধরে যে সমস্যার সমাধান হয়নি, সেই তিস্তা ইস্যুতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে সুদৃঢ় করবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিস্তা একটি আবেগের নাম, উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতীক। এই বঞ্চনার অবসানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া মানে কেবল একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যাশার সাথে সংযোগ স্থাপন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের সক্ষমতা এবং এই পদক্ষেপ সেই সক্ষমতারই প্রমাণ।
বাণিজ্যিক লাভ ও চীনের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
তিস্তা প্রকল্প শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখার একটি সূচনাবিন্দু। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন উভয় দেশের মধ্যে আস্থার যে বন্ধন তৈরি করবে, তা আরও বৃহত্তর সহযোগিতার দরজা খুলে দেবে।
বিশেষভাবে যে ক্ষেত্রগুলোতে অংশীদারিত্ব আরও গভীর হতে পারে তা হলো- অবকাঠামো উন্নয়নে BRI-এর আওতায় নতুন প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যৌথ বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার। ইতিমধ্যে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার। তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্পর্ক একটি পরিণত, পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হবে।
পরিবেশগত লাভ: ইকো-সিস্টেম পুনরুদ্ধার
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে তিস্তার পরিবেশগত পুনরুদ্ধার শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদী তীরের বনায়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উত্তরাঞ্চলের মরুকরণ প্রবণতা রোধ করবে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করবে এবং কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা করবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে একসাথে সাধন করার এই মডেল আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে।
তারেক রহমান সরকারের দূরদর্শী কূটনীতি
আন্তর্জাতিক কূটনীতির নিয়ম বলে, প্রকৃত নেতৃত্ব চেনা যায় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে। তারেক রহমান সরকার এই প্রশ্নে একটি সাহসী অবস্থান গ্রহণ করেছে, এটি কোন কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত না। বরং সুচিন্তিত, ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা একটি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ।
ঢাকা কোনো সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, কোনো শক্তিকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জও জানায়নি। বরং নিজের জনগণের কল্যাণে বিকল্প সন্ধানের এই পরিমিত ও সংযত পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা সম্পর্কে সচেতন এবং পরিপক্ব। একটি জনমুখী সরকার পনের বছর ধরে ঝুলে থাকা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে অনিশ্চয়তায় রাখতে পারে না।
পরিশেষ,
তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততার পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বহুমাত্রিক সাফল্যের দরজা খুলে দিচ্ছে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক রূপান্তর, রাজনৈতিক আস্থা, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার এই পাঁচটি মাত্রায় একসাথে অগ্রসর হওয়ার এই সুযোগ বিরল। তারেক রহমান সরকারের এই ধীর, সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় পদচারণা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আজ আর কারো অনুকম্পা ভিখারি নয়, এই জাতি এখন তার নিজের ভবিষ্যৎ রচনা করতে সক্ষম।
লেখক -ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
