ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে সোমবার (২৪ আগস্ট) এক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ মিছিল পরবর্তী রাজধানীর মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিকের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব মোতাছিম বিল্লাহর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ব্যাংকের গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, সরকারের ভেতরে থাকা এস আলম গ্রুপের সুবিধাভোগীদের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা সংক্রান্ত বিচারিক মামলায় চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের দায়েরকৃত মামলা যখন নিষ্পত্তির কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক সেই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের আইনজীবীকে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। বিচারে এস আলম গ্রুপের পক্ষে রায় নেওয়ার জন্য ইসলামী ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাইয়ুমকে পরিবর্তন করে সরকার দলীয় একজন জুনিয়র আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে যেই আইনজীবী ছিলেন তাকেও পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার আদালত ও বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন, বিচারের নামে প্রহসনের কোনো রায় ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা মেনে নেবে না।
অন্য সব ব্যাংকের মতোই ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, একটি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ব্যতিত চলতে পারে না। তাই দ্রুত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানান।
৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের চলমান কর্মসূচি অব্যহত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৭ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে, খুব শীঘ্রই মহাসমাবেশ সহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে।
৭ দফা দাবি সমূহ
১. পেশাদার পর্ষদ গঠন: অবিলম্বে অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।
২. প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর: ২০১৭ সালে গায়ের জোরে ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করে এই ব্যাংকের যে বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সাধারণ গ্রাহক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এই ব্যাংককে পুনরায় কোনো লুটেরা বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের শিকার হতে দেওয়া যাবে না।
৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকার এবং তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এস আলমসহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের দ্রæত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ: ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রোধে দ্রæত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত: একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে লুটেরাদের বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে তারা যাতে কোনো প্রকার ‘স্থিতাবস্থা’ বা আইনি সুবিধা না পায়, সেজন্য প্রয়োজনে দ্রæত আইন সংশোধন করতে হবে। (উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এই আদালত থেকে এস আলমের ঋণের কোনো অনিয়ম তদন্ত করা যাবে না মর্মে রুলনিশি জারি করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক)।
৬. লুটেরাদের পুনর্বাসন রোধ (আইন সংশোধন): ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী মহোদয় লুটেরাদের পুনরায় ব্যাংকে পুনর্বাসনের যে ছদ্মবেশী সুযোগ রাখা হয়েছিল তা বন্ধ করার জন্য ১৮/ক ধারা বাতিল হবে মর্মে সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু বিল আকারে উপস্থাপনের মাধ্যমে তা এখনো রহিতকরণ করা হয়নি। তাছাড়া এ ধরণের অপকর্মকারীদের আজীবন ব্যাংক তথা অর্থনৈতিক সেক্টরে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
৭. সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী মহোদয়গণ যে, অসত্য ও বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তা অনতিবিলম্বে তা প্রত্যাহার করতে হবে। আমরা দৃঢ়তার সহিত বলতে চাই, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়। এটি দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস, আবেগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। আমরা সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা রক্ষায় অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। উল্লেখ্য, গ্রাহকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনভাবেই আমরা পিছপা হবো না। আমরা খুবই আশ্চর্য হই, দীর্ঘ ২ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ গ্রাহকগণ যখন তাদের আমানতের সুরক্ষার জন্য আন্দোলন করে তখন সেখানে তারা রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করেন। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়।
