সাইফুল খান
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র আধিপত্য বা ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ বজায় ছিল। তা এখন এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মুখে। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এ কথা স্পষ্ট যে, মার্কিন আধিপত্যের পতন কেবল একটি তাত্ত্বিক পূর্বাভাস নয়; এটি এখন বাস্তবতা। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের চাপ, অর্থনৈতিক কাঠামোর রূপান্তর এবং মিত্রদের মধ্যে আস্থাহীনতা – এই চারটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে এই পতন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
হার্ভার্ডের অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক “শিকারী আধিপত্যের” (প্রিডেটরি হেজিমনি) মডেলে অবতীর্ণ হয়েছে। যেখানে প্রতিটি সম্পর্ককেই শূন্য-সমষ্টির খেলা হিসেবে দেখা হয়। এই কৌশলগত বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান পাঁচটি কারণ বিশ্লেষণ করা যায়।
১. মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটির কার্যকারিতা ও কৌশলগত পশ্চাদপসরণ
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছিল তাদের শক্তির প্রধান উৎস। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাতারের আল-উদাইদ ঘাঁটি থেকে শত শত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া, এবং সিরিয়ার কাসরাক বিমানঘাঁটিসহ সকল সামরিক স্থাপনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; এই ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির ক্রমাগত সংকোচনকেই নির্দেশ করে। ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার মুখে এই পিছু হটা একটি বাধ্যতামূলক কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক প্রভাবকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে।
২. ব্যয়বহুল ও অকার্যকর সামরিক অভিযানের চাপ
মার্কিন সামরিক অভিযানের ব্যয় এখন আকাশচুম্বী। ২০২৬ অর্থবছরে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, আর ২০২৭ সালের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা ইরান যুদ্ধের ব্যয়ের কারণে আরও অসম্ভব হয়ে উঠছে। এই ব্যয়ভার শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অস্থিতিশীল। কংগ্রেসে বাজেট পাস করানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদি এই ব্যয়ভার বহন করা মার্কিন অর্থনীতির পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতিকে আরও সংকুচিত করবে।
৩. কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়া
হরমুজ প্রণালী, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ইরানে হামলার পর থেকে প্রণালীটি কার্যত অবরুদ্ধ। প্রায় ১,৬০০ জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে, আর মার্কিন নৌবাহিনীও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এপ্রিলে সৌদি আরব স্পষ্টভাবে মার্কিন নৌ-অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ পাচ্ছে চীন ও রাশিয়া।
৪. আর্থিক আধিপত্যের ভাঙ্গন: ডি-ডলারাইজেশন ও বিকল্প মুদ্রার উত্থান
ডলারের একক আধিপত্য আজ আর প্রশ্নাতীত নয়। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী রিজার্ভের ৭২ শতাংশ ছিল ডলারে, যা ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে নেমে এসেছে ৫৭ শতাংশে। যা গত ৩০ বছরের সর্বনিম্ন। রাশিয়া-চীন বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশই এখন ডলার-বহির্ভূত মুদ্রায় নিষ্পত্তি হচ্ছে। সৌদি আরব, ভারত, ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো তেল বাণিজ্যের জন্য ডলারের বিকল্প মুদ্রা অনুসন্ধান করছে, যা পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
৫. মিত্রদের আস্থাহীনতা ও বহুমুখী জোটের উত্থান
মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্র সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাশিয়ার চেয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বজনীন ধারণা এখন বেশি নেতিবাচক। যুক্তরাষ্ট্রের নেট পারসেপশন মাইনাস ১৬ শতাংশ, রাশিয়ার মাইনাস ১১ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় মাত্র ৩৪ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে, যেখানে চীনকে দেখে ৮৩ শতাংশ। গ্যালাপ জরিপেও ৪৪টি দেশে মার্কিন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ১০ পয়েন্টেরও বেশি কমে গেছে।
অন্যদিকে, ব্রিকস জোট ২০২৬ সালে ১১ পূর্ণ সদস্য ও ১০ অংশীদার দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ ও জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্ররাও এখন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের জন্য চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে। চীন মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। “মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেই” (US hegemony is no longer uncontested)। এই বাস্তবতাই এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ধারা।
উপসংহার
যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও ক্রমহ্রাসমান বৈশ্বিক আস্থা এই চারটি শক্তি একযোগে মার্কিন আধিপত্যের ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। আগামী দশকে আমেরিকা সম্ভবত “বিশ্ব-মোড়ল” না থেকে “কৌশলগত প্রতিযোগী” হিসেবে আবির্ভূত হবে। সে কেবল নিজস্ব গোলার্ধে প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
লেখক – ইতিহাস রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
