নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আল্লামা ইকবাল এবং মাওলানা মওদুদীর সম্পর্ক, মিল-অমিল

অনলাইন ডেস্ক
মে ৩১, ২০২৬ ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

সাইফুল খান

​তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতি এবং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে আল্লামা ইকবালের অবস্থানের সাথে মাওলানা মওদুদীর সম্পর্কটি ছিল বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। এতে যেমন গভীর তাত্ত্বিক মিল ছিল, তেমনি কৌশলগত ও রাজনৈতিক জায়গায় ছিল বড় অমিল।
কংগ্রেসের অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিরোধিতার জায়গায় ইকবাল ও মওদুদী সম্পূর্ণ একমত ছিলেন। আল্লামা ইকবাল স্পষ্ট বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দু-প্রধান অখণ্ড ভারতে মুসলিমরা তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে। পশ্চিমা ধাঁচের ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে তিনি ইসলামের বিশ্বজনীন (Universal) ধারণার পরিপন্থী মনে করতেন। মাওলানা মওদুদীও ঠিক এই কারণেই কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদুদী সম্পাদিত ‘তরজুমানুল কুরআন’ পত্রিকাটির নিয়মিত পাঠক ছিলেন। মওদুদীর ক্ষুরধার লেখনী ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ইকবালকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটে মওদুদীর দর্শনকে তিনি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মনে করতেন। তৎকালীন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ইকবাল মন্তব্য করেছিলেন যে -বিভ্রান্ত ভারতীয় মুসলিমদের সঠিক পথের দিশা দেখানোর সামর্থ্য মওদুদীর চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তিনি মওদুদীর প্রতিভা, নিষ্ঠা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার মাঝে ভবিষ্যৎ ইসলামী পুনর্জাগরণের একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।
​এই বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণের সূত্র ধরেই আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদুদীর সাথে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ নেন এবং তাঁকে লাহোরে আসার আমন্ত্রণ জানান। এটিই ছিল এই দুই চিন্তাবিদের প্রথম প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ। এই ঐতিহাসিক বৈঠকে তাঁদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মুসলিমদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক কর্মক্ষেত্র তৈরি করা। ইকবাল অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মওদুদীর কর্মতৎপরতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন এবং সে কারণেই তাঁকে পাঞ্জাবে (বিশেষ করে পাঠানকোটে) নিজের স্থায়ী কর্মস্থল হিসেবে বেছে নেওয়ার অনুরোধ জানান।

এই তাত্ত্বিক মিলের কারণেই ১৯৩০-এর দশকে ইকবালের আমন্ত্রণে অনুপ্রাণিত হয়েই মওদুদী পাঠানকোটে এসে ‘দারুল ইসলাম’ ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র চিন্তাকেন্দ্র গড়ে তোলা।
আল্লামা ইকবাল ছিলেন মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ অধিবেশনে তিনিই প্রথম মুসলিম-প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে একটি পৃথক অঞ্চলের দাবি তোলেন। তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন এবং জিন্নাহকে মুসলিম লীগের হাল ধরার জন্য বারবার চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন। অপরদিকে, মওদুদী মুসলিম লীগের এই রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের তৎকালীন নেতারা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার। তাঁরা যে রাষ্ট্র বানাবেন তা শুধু “মুসলিমদের শাসন” হবে, “ইসলামী শাসন” হবে না। মওদুদী মনে করতেন, আগে সাধারণ মুসলিমদের ভেতর প্রকৃত ইসলামী মূল্যবোধ ও চরিত্র তৈরি করতে হবে (ইসলামী পুনর্জাগরণ), তারপর রাষ্ট্র এমনিতেই ইসলামী হবে। কোনো জমি বা ভূখণ্ড দখল করা তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল না।

আল্লামা ইকবাল নিজেও কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বা পশ্চিমা ধাঁচের অন্ধ অনুকরণকারী রাষ্ট্র চাননি। তিনি তাঁর ‘পুনর্গঠন’ (Reconstruction) তত্ত্বে ইসলামের আইন ও দর্শনের আধুনিকায়নের কথা বলেছিলেন, যা একটি প্রগতিশীল ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে। তবে মওদুদীর মতো ইকবাল জিন্নাহর নেতৃত্বকে বয়কট করেননি। ইকবাল মনে করতেন, মুসলিমদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমে একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা স্বাধীন ভূখণ্ড প্রয়োজন, যা জিন্নাহর মুসলিম লীগের মাধ্যমেই সম্ভব। আর মওদুদী মনে করতেন, ভুল নেতৃত্ব ও ভুল আদর্শের ওপর ভিত্তি করে আলাদা রাষ্ট্র নিলে তা শেষ পর্যন্ত একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রেই পরিণত হবে।

আল্লামা ইকবাল ও মাওলানা মওদুদী উভয়েই অখণ্ড ভারতের বিরুদ্ধে একটি “ইসলামী আদর্শের” সমাজ চেয়েছিলেন। কিন্তু ইকবাল ছিলেন কৌশলগত বাস্তববাদী। যিনি জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথমে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড (পাকিস্তান) অর্জনকে অপরিহার্য মনে করেছিলেন। অন্যদিকে, মওদুদী ছিলেন আদর্শিক অনমনীয়তাবাদী। যিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের চেয়ে আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে আগে স্থান দিয়েছিলেন এবং মুসলিম লীগকে “জাতীয়তাবাদী” দল আখ্যা দিয়ে দূরে সরে ছিলেন।

(উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে ইকবালের মৃত্যুর পরই মওদুদীর রাজনৈতিক অবস্থান মুসলিম লীগ থেকে আরও দূরত্ব বজায় রাখে এবং ১৯৪১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী গঠন করেন।)

 

লেখক – ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক