নয়াখবর
রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারনার রাজনীতি

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১১, ২০২৬ ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার ভঙ্গের ঐতিহাসিক দলিল

একটি কূটনৈতিক ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা

সাইফুল খান

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে উপস্থাপন করে এসেছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে ভিন্ন এক চিত্র ভেসে ওঠে। যেখানে চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক অঙ্গীকার বারবার কৌশলগত স্বার্থের বেদিতে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

এটি কোনো একটি সরকার বা দলের ব্যর্থতা নয়। ডেমোক্র্যাট হোক বা রিপাবলিকান, উদার হোক বা রক্ষণশীল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই চরিত্রটি বহু দশক ধরে একটি ধারাবাহিক প্রতারনার প্যাটার্ন হিসেবে বিদ্যমান। যখনই মার্কিন ‘জাতীয় স্বার্থ’ প্রকৃতপক্ষে কর্পোরেট স্বার্থ, সামরিক শিল্পের স্বার্থ বা ভূরাজনৈতিক কৌশল আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে, তখনই প্রতিশ্রুতি প্রতারনায় পর্যবসিত হয়েছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বেছে নেওয়া তেরোটি ঘটনার বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপন করছি। এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির গভীর প্রতারনার প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রকাশ।

এক. আদিবাসীদের সাথে ভূমিচুক্তি লঙ্ঘন (১৮শ–১৯শ শতক)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের ইতিহাস শুরু হয় তার নিজ ভূখণ্ডেই আদিবাসী আমেরিকানদের সাথে। রাষ্ট্রটি তার অস্তিত্বের শুরু থেকেই নেটিভ আমেরিকান জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাথে কয়েকশো শান্তিচুক্তি ও ভূমিচুক্তি সম্পাদন করে।

১৮৫১ সালের ফোর্ট ল্যারামি চুক্তিতে সিউ, চেয়েন ও আরাপাহো জাতিকে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমির অধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্ল্যাক হিলসে সোনা আবিষ্কারের পর ১৮৬৮ সালের দ্বিতীয় ফোর্ট ল্যারামি চুক্তিও একই পরিণতি বরণ করল। সোনার লোভে মার্কিন সরকার নিজের স্বাক্ষরিত চুক্তি ছিঁড়ে ফেলল এবং সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আদিবাসীদের নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ করল।

আমেরিকার ইতিহাসবিদরা এই চুক্তি লঙ্ঘনকে বলেন ‘আমেরিকান চুক্তিভঙ্গের সবচেয়ে পদ্ধতিগত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া’। আনুমানিক ৩৭৮টি চুক্তির মধ্যে প্রতিটিই মার্কিন সরকার কর্তৃক লঙ্ঘিত বা সংশোধিত হয়েছে। মূলত বসতি স্থাপনকারীদের বিস্তার ও সম্পদ আহরণের স্বার্থে। এটি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে সুপরিকল্পিত নজির।

যে সভ্যতা নিজের প্রথম চুক্তিগুলো লঙ্ঘন করে বেড়ে ওঠে, সে সভ্যতার কাছে পরবর্তী প্রতিশ্রুতিগুলোর মূল্য কতটুকু — ইতিহাস সে প্রশ্নের উত্তর আগেই দিয়ে রেখেছে।

দুই. ইরানে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন (১৯৫৩)

১৯৫১ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ব্রিটিশ অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (পরবর্তীতে বিপি) জাতীয়করণ করলেন। ইরানের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন জাতীয় স্বনির্ভরতার প্রতীক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক সেজে থাকলেও পর্দার আড়ালে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স যৌথভাবে ‘অপারেশন এজাক্স’ (বা অপারেশন বুট) পরিচালনা করল। কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে মিডিয়া প্রচারণা চালানো হলো, বিক্ষোভ সংগঠিত করা হলো এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটানো হলো।

মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হলেন, কারারুদ্ধ হলেন এবং গৃহবন্দিত্বে মৃত্যুবরণ করলেন। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পুনরায় সিংহাসনে বসলেন মার্কিন-ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে। (সেই একই স্বপ্ন ২০২৬ সালে ট্রাম্প দেখছেন)

এই ঘটনার পরিণতি কতটা সুদূরপ্রসারী ছিল তা বোঝা যায় ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে। যখন মার্কিনবিরোধী ক্রোধ দেশটিকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে গেল। ১৯৫৩ সালের মার্কিন হস্তক্ষেপ না হলে আজকের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।

তিন. জেনেভা চুক্তি ও ভিয়েতনামে নির্বাচন বাতিল (১৯৫৪–১৯৫৬)

১৯৫৪ সালের জেনেভা অ্যাকর্ডস ফরাসি ইন্দোচীনে প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের সমাপ্তি টানল। চুক্তি অনুযায়ী ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হলো। উত্তরে হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকার এবং দক্ষিণে পশ্চিমাপন্থী সরকার। ১৯৫৬ সালের মধ্যে সর্বভিয়েতনামীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরেকত্রিত হওয়ার কথা ছিল।

মার্কিন প্রশাসন ও তার সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনামী সরকার জানত যে নির্বাচন হলে হো চি মিনের বিজয় অনিবার্য। একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অঞ্চলে হো চি মিনের জনপ্রিয়তা ছিল ভূমিধস পর্যায়ের। তাই নির্বাচন বাতিল করা হলো গণতন্ত্রের স্লোগান দেওয়া দেশটি গণতান্ত্রিক রায়কে ভয় পেল।
এই সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে দীর্ঘ ও বিধ্বংসী ভিয়েতনাম যুদ্ধের জন্ম দিল। যেখানে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা ও প্রায় বিশ লক্ষ ভিয়েতনামী বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারালেন। আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি অসম্মান কীভাবে দশকের রক্তপাতের কারণ হতে পারে, ভিয়েতনাম তার ভয়াবহ উদাহরণ।

চার. পিগস উপসাগরের বিপর্যয় (১৯৬১)

১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবান বিপ্লব সফল হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হলো। কিউবায় মার্কিন কর্পোরেট সম্পদ জাতীয়করণ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ওয়াশিংটনকে উদ্বিগ্ন করে তুলল।
সিআইএ কিউবান নির্বাসিতদের প্রশিক্ষণ দিল এবং তাদের আশ্বাস দেওয়া হলো অভিযান শুরু হলে মার্কিন বিমান বাহিনী আকাশপথে সহায়তা করবে, মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রপথে সুরক্ষা দেবে। এই আশ্বাসে ভরসা করে প্রায় ১৪০০ কিউবান বিদ্রোহী ১৯৬১ সালের এপ্রিলে পিগস উপসাগরে অবতরণ করল।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট কেনেডি সহায়তা বাতিল করলেন। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। বিদ্রোহীরা হয় নিহত হলেন, নয়তো বন্দি। প্রতিশ্রুত সহায়তা না পেয়ে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলেন তারা এবং সেই পরিণতির মূল্য দিলেন নিজেদের জীবন দিয়ে। (এখন যেটা মিডলইস্টেও ঘটতে যাচ্ছে)

পাঁচ. কুর্দিদের প্রথম পরিত্যাগ (১৯৭৫)

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে মার্কিন সিআইএ এবং ইরানের শাহ মিলে ইরাকের বিরুদ্ধে কুর্দি আন্দোলনকে গোপনে মদত দেওয়া শুরু করল। কুর্দি নেতা মুল্লা মুস্তাফা বারজানিকে অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক আশ্বাস দেওয়া হলো। বলা হলো, কুর্দিরা লড়াই করলে তাদের পাশে থাকা হবে।
কুর্দিরা লড়াই করলেন, রক্ত দিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ইরাক ও ইরান আলজেরিয়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করল। ইরাক তার সীমান্তে ছাড় দিল, ইরান বিনিময়ে কুর্দিদের সমর্থন প্রত্যাহার করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও নিরবে সরে গেল।

মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পরে যে তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছিল, তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, কুর্দিদের ব্যবহার করা হয়েছিল ইরাককে চাপে রাখার একটি হাতিয়ার হিসেবে, তাদের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সত্যিকারের কোনো সহানুভূতি কখনো ছিল না।

কুর্দিরা শিখেছিল, মহাশক্তির সমর্থন কখনো মৈত্রী নয়, এটি একটি সাময়িক হাতিয়ার। হাতিয়ারের প্রয়োজন শেষ হলে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হয়।

ছয়. আফগান মুজাহিদিনদের পরিত্যাগ (১৯৮৯)

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান আক্রমণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শীতলযুদ্ধের কৌশলগত হিসেব কষে আফগান মুজাহিদিনদের পাশে দাঁড়াল। ‘অপারেশন সাইক্লোন’-এর মাধ্যমে সিআইএ আফগান যোদ্ধাদের কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিল। পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সহায়তায়।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ল। মার্কিন কৌশলবিদরা উল্লসিত হলেন। শীতলযুদ্ধের একটি বড় পর্দা পড়ে গেল। কিন্তু তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনে কোনো আগ্রহ দেখাল না।

পরিণতি হলো ভয়াবহ। আফগানিস্তান ডুবে গেল গৃহযুদ্ধে, গোষ্ঠী সংঘাতে। মার্কিন সহায়তায় সজ্জিত বিভিন্ন দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করল। এই বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকেই উঠে এলো তালেবান। যাদের দমন করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ২০০১ সালে আবার আফগানিস্তানে ফিরতে হয়।

সাত. ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা দাবি (২০০৩)

২০০৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্লাইড প্রেজেন্টেশন দিলেন। দাবি করলেন ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত আছে, রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনের প্রমাণ আছে। এই উপস্থাপনাকে ভিত্তি করে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাক আক্রমণ করা হলো।

যুদ্ধের পর বিস্তারিত তদন্তে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া গেল না। ব্রিটিশ সরকারের চিলকট তদন্ত প্রতিবেদন (২০১৬) স্পষ্টভাবে বলল, যুদ্ধের কোন প্রয়োজনই ছিলো না এবং গোয়েন্দা তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

ইরাক যুদ্ধের মূল্য ছিল বিশাল। এক লক্ষেরও বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হলেন। দেশটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় পতিত হলো এবং এই শূন্যতা থেকেই পরবর্তীতে উঠে এলো আইএসআইএস তথা ইসলামিক স্টেট। একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও মিথ্যা দাবির উপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে দিল।

আট. লিবিয়ায় ম্যান্ডেটের বাইরে যাওয়া (২০১১)

২০১১ সালে লিবিয়ায় গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি সীমিত উদ্দেশ্যে রেজোলিউশন ১৯৭৩ পাস করল। বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষার জন্য নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করতে। রাশিয়া ও চীন এই রেজোলিউশনে ভেটো না দিয়ে ভোটদান থেকে বিরত থাকল এই শর্তে যে অভিযানের সীমা শুধু বেসামরিক সুরক্ষায় থাকবে।

কিন্তু ন্যাটো যা করল তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিমান হামলা শুধু নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। গাদ্দাফির সামরিক বাহিনীকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হলো, বিদ্রোহীদের সক্রিয় সমর্থন দেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফির সরকারের পতন ঘটল এবং গাদ্দাফি নিজে নিহত হলেন।

রাশিয়া ও চীন অভিযোগ করল ম্যান্ডেটকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, ‘বেসামরিক সুরক্ষা’র আড়ালে ‘শাসন পরিবর্তন’ করা হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে রাশিয়া ও চীন আর কোনো পশ্চিমা হস্তক্ষেপ-প্রস্তাবে নিরপেক্ষ থাকেনি। সিরিয়াসহ পরবর্তী প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা ভেটো দিয়েছে।

নয়. সিরিয়ায় কুর্দিদের দ্বিতীয় পরিত্যাগ (২০১৯)

আইএস বা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূমিস্থ মিত্র ছিল সিরিয়ার কুর্দি বাহিনী বিশেষত ওয়াইপিজি ও এসডিএফ। এই বাহিনী হাজার হাজার সদস্যের জীবনের বিনিময়ে আইএসের তথাকথিত ‘খিলাফত’ ধ্বংস করতে সাহায্য করল।

২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সাথে ফোনে কথা বললেন এবং উত্তর সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন। ঘোষণার মাত্র দুই দিন পরেই তুর্কি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ শুরু করল।

কুর্দি বাহিনী, যারা সবে আইএসের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ শেষ করেছে, এখন তুর্কি আক্রমণের মুখে পড়ল। শত শত কুর্দি যোদ্ধা নিহত হলেন, লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন। মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা পর্যন্ত প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেন। বললেন, এটি মিত্রদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

ইতিহাসে কুর্দিরা দুইবার একই পরিণতির শিকার হলো। তাদের মধ্যে একটি তিক্ত প্রবাদ জন্ম নিয়েছে: কুর্দিদের কোনো বন্ধু নেই, পাহাড় ছাড়া।

দশ. আফগানিস্তান থেকে দ্রুত প্রত্যাহার ও কাবুলের পতন (২০২১)

২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তালেবানের সাথে দোহা চুক্তি সম্পাদন করল। আফগান সরকারকে সেই আলোচনা থেকে দূরে রেখে। বাইডেন প্রশাসন সেই চুক্তি বহাল রেখে ২০২১ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিল।

মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা আগাম সতর্ক করেছিলেন, তালেবান দ্রুত ক্ষমতা দখল করবে। কিন্তু প্রশাসন আশাবাদী ছিল। বাস্তবে যা ঘটল তা সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেল। মাত্র ১১ দিনে একটির পর একটি প্রদেশ তালেবানের হাতে পড়ল এবং ১৫ আগস্ট ২০২১ তালেবান কাবুলে প্রবেশ করল।

কাবুল বিমানবন্দরে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মার্কিন দালালেরা বিমানের ডানায় ঝুলে পালানোর চেষ্টা করছে। সারা বিশ্বে প্রচারিত হলো। যারা বিশ বছর ধরে মার্কিন পতাকার ছায়ায় কাজ করেছিলেন, যারা আমেরিকার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের অনেকে তালেবানের হাতে নিহত হলেন।

এগারো. ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফা প্রত্যাহার (২০১৮)

২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সাথে ইরান, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য মিলে একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন করল। জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)। ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করবে, আইএইএ পরিদর্শনের অনুমতি দেবে, বিনিময়ে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে।

ইরান চুক্তির শর্ত মেনে নিয়েছিল । আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বারবার তা নিশ্চিত করলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করলেন এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে ইরানের উপর নতুন ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।

ইউরোপীয় মিত্ররা হতবাক হয়ে গেল। একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি, যেখানে ছয়টি পক্ষ ছিল, সেটি থেকে এককভাবে বেরিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির কাঠামোর প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞার প্রকাশ। এই সিদ্ধান্তের পর ইরান ধীরে ধীরে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করল।

বারো. সোলেইমানি হত্যা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন (২০২০)

২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি মার্কিন ড্রোন বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি সরকারি কনভয়ে আঘাত করল। শহীদ হলেন ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি এবং ইরাকি মিলিশিয়া নেতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিস।

এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করল। সোলেইমানি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারি সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ইরাকে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে কূটনৈতিক সফরে এসেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত বললেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ইরাকের পার্লামেন্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবিতে ভোট দিল। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাল। ইরান প্রতিশোধে ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করল। একটি মার্কিন একক সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেল।

তেরো. মাসকাট আলোচনার মধ্যে সামরিক সংঘাত (২০২৬)

২০২৬ সালে ওমানের রাজধানী মাসকাটে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হলো। এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর তীব্র বৈরিতার পর একটি সম্ভাব্য অগ্রগতির সংকেত। বিশ্ব আশাবাদী হয়ে উঠল।

কিন্তু কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ইরানের উপর বিমান হামলা চালানো হয়। ইরান এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছে ‘কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে।
এই ঘটনা আবারও সেই পুরনো প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এলো। মার্কিন কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল কি সত্যিকারের শান্তির সন্ধান, নাকি এটি সামরিক কৌশলের একটি হাতিয়ার মাত্র? আলোচনা চলাকালে কি সামরিক চাপ প্রয়োগের পূর্বপরিকল্পনা থাকে? এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতের কূটনীতিবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে।

পরিশেষ

এই তেরোটি ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে মনে হতে পারে এগুলো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত। কিন্তু এগুলোকে একসূত্রে গাঁথলে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন উঠে আসে। যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বারবার একটি মূল নীতি অনুসরণ করেছে: পরিষ্কার প্রতারনা।

আদিবাসী আমেরিকানদের ভূমিচুক্তি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মাসকাট আলোচনা পর্যন্ত যখনই মার্কিন কৌশলগত স্বার্থ বদলেছে, প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলো হয় পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছে, নয়তো একেবারে পরিত্যক্ত হয়েছে।
এই বিশ্লেষণ কোনো নির্দিষ্ট দলীয় অবস্থান থেকে করা নয়। ডেমোক্র্যাট রুজভেল্ট, ট্রুম্যান, কেনেডি, ওবামা এবং রিপাবলিকান আইজেনহাওয়ার, নিক্সন, রিগান, বুশ, ট্রাম্প সবার আমলেই এই প্যাটার্ন অব্যাহত থেকেছে। এটি একটি দলের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রকৃতি ও প্রকৃত চরিত্রকে নির্দেশ করে। তারা নিজেদেরকে গ্রেট ডেকে গ্রেটের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে।

উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই ইতিহাস থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো, মহাশক্তির সাথে প্রতিশ্রুতি করা বিপজ্জনক। কৌশলগত অবস্থান, স্বনির্ভরতা এবং বহুমুখী কূটনীতিই একটি ছোট রাষ্ট্রের সত্যিকারের রক্ষাকবচ। যেটা ইরান করে দেখিয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরকালীন মিত্র বা চিরকালীন শত্রু বলে কিছু নেই আছে কেবল চিরকালীন স্বার্থ।

এই পুরনো কথাটি হয়তো কঠোর শোনায়, কিন্তু তেরোটি ঐতিহাসিক ঘটনার নিরিখে এটিই সবচেয়ে সৎ পর্যবেক্ষণ।

লেখক -ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।