নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় প্রভাব

অনলাইন ডেস্ক
জুন ৩, ২০২৬ ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

মিয়ানমারের এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং জান্তা সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও জটিল প্রভাব ফেলবে। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও দীর্ঘায়িত হবে

মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসন বেইজিংয়ের সমর্থনে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করলেও, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে তাদের কোনো প্রকৃত আগ্রহ নেই।

• জান্তার অনীহা: ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মিন অং হ্লাইং। ফলে তার নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া বা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে কখনোই আন্তরিক হবে না।

• প্রহসনের পাইলট প্রজেক্ট: চীনকে খুশি করতে বা আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে জান্তা মাঝে মাঝে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার “পাইলট প্রজেক্ট” বা নাটক তৈরি করতে পারে, তবে তা কখনোই স্থায়ী বা বড় আকারের প্রত্যাবাসন হবে না।

রাখাইন রাজ্যে জান্তা বনাম আরাকান আর্মির সংঘাত বৃদ্ধি

রাখাইন রাজ্যে (যেখান থেকে রোহিঙ্গারা এসেছে) জান্তা বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA)-এর মধ্যে যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে।

• নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া: রাখাইনের সিংহভাগ অঞ্চল এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সেখানে কেবল নিজেদের অস্তিত্ব টেকাতে বিমান হামলা ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে।

• দ্বিমুখী সংকট: একদিকে জান্তা সরকার পুরো রাখাইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তাই তারা চাইলেও রোহিঙ্গাদের সেখানে পুনর্বাসন করতে পারবে না। অন্যদিকে, আরাকান আর্মির সাথে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি না থাকায়, কার সাথে কথা বলে প্রত্যাবাসন হবে—তা নিয়ে একটি বড় কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

নতুন করে পুশ-ইন ও শরণার্থী অনুপ্রবেশের ঝুঁকি

রাখাইনে জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এবং মিয়ানমারের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেখানে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য সাধারণ নাগরিকেরাও চরম খাদ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

• জীবন বাঁচাতে তারা আবারও সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে, যা কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ

মিয়ানমার জান্তা পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায়, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব আরও সুসংহত হচ্ছে।

• দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে জটিলতা: বাংলাদেশ বরাবরই চীনের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রত্যাবাসন শুরুর চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু বেইজিং এখন জান্তাকে টিকিয়ে রাখতে বেশি ব্যস্ত। ফলে বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে চীন নিজের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে (যেমন: রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দর) বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

• সীমান্তে উত্তেজনা: জান্তা বাহিনী প্রায়ই আরাকান আর্মিকে দমন করতে গিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে গোলাবর্ষণ বা আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক হুমকি।
আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক ধসের কারণে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকা দিয়ে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এবং অস্ত্র চোরাচালান বহুগুণ বেড়ে গেছে।

• মিয়ানমারের এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ (যেমন- আরসা বা আরএসও) মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে ক্যাম্পগুলোর ভেতরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।

মিয়ানমারে বেসামরিক মুখোশের আড়ালে সামরিক জান্তার এই ক্ষমতা একত্রীকরণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। এর অর্থ হলো, রোহিঙ্গা সংকটের কোনো দ্রুত বা সহজ সমাধান মিলছে না। বাংলাদেশকে এখন প্রথাগত কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি রাখাইনের মাঠপর্যায়ের বাস্তব শক্তিগুলোর (যেমন: আরাকান আর্মি) মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয়

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, সংকটের গভীরতা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মহলের কৌশল পরিবর্তন করা জরুরি:

• মানবিক সহায়তা এবং বিকল্প চ্যানেল: জান্তা সরকারের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানো দরকার। এর জন্য অ-রাষ্ট্রীয় মাধ্যম (যেমন- স্থানীয় এনজিও, জাতিগত গোষ্ঠী বা সিভিল সোসাইটি) ব্যবহার করা উচিত।

• নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা: জান্তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির উৎসগুলো (যেমন- বিমান জ্বালানি বা অস্ত্র আমদানি) বন্ধ করতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে হবে।

• ক্রিটিক্যাল মিনারেল ও সাপ্লাই চেইন: মিয়ানমার বিরল খনিজ (Rare Earth Elements) এবং তামার একটি বড় উৎস, যা গ্লোবাল টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত হয়। জান্তা যেন এই খনিজ সম্পদ বিক্রি করে যুদ্ধের তহবিল জোগাড় করতে না পারে, সেদিকে বিশ্ববাজারের নজর দেওয়া উচিত।

মিয়ানমারে কেবল একটি ক্ষমতার রদবদল হয়েছে, সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। জান্তার এই “নকল বৈধতা” দেশের ভেতরের গৃহযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধসকে থামাতে পারবে না। ফলে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত বা থাইল্যান্ডের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব চলতেই থাকবে।

মাসুমুর রহমান খলিলির ফেসবুক ওয়াল থেকে