নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে মালয়েশিয়ার গনমাধ্যম?

অনলাইন ডেস্ক
জুন ২৪, ২০২৬ ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

 

সাইফুল খান

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া এবং সেখানে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মালয়েশিয়ার মূলধারার অত্যন্ত প্রভাবশালী ও মর্যাদাপূর্ণ গণমাধ্যমগুলো এই সফরকে কেবল একটি চিরাচরিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখেনি, বরং একে ভারতের দীর্ঘদিনের “আঞ্চলিক একচেটিয়া মনোপলি বা প্রভাব বলয়” থেকে ঢাকার কৌশলগতভাবে বেরিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: ভারতের প্রভাব বলয় এবং ঢাকার “পূর্বমুখী” কৌশল

মালয়েশিয়ার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক New Straits Times (NST) এই সফরের কৌশলগত দিকটিকে সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছে। ড. আজমি হাসান (Dr. Azmi Hassan), সিনিয়র জিওপলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট এবং মালয়েশিয়ার ন্যাশনাল একাডেমি অব আর্টস, কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ (ASWARA)-এর সিনিয়র ফেলো। তাঁর লেখার শিরোনাম -“ঢাকার নতুন পূর্বমুখী নীতি: দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের পুনঃসমীকরণ” (Dhaka’s New Look East Policy: Rebalancing the Geopolitical Equations in South Asia)

ড. আজমি হাসান তাঁর কলামে দেখিয়েছেন যে, বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে নয়াদিল্লির ওপর অতি-মাত্রায় নির্ভরশীল ছিল, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে কুয়ালালামপুরকে বেছে নিয়ে সেই বৃত্ত ভেঙেছেন। তিনি এটিকে ঢাকার “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির একটি বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন, যেখানে বাংলাদেশ ভারতের একক প্রভাবকে কাউন্টার-ব্যালেন্স (ভারসাম্য রক্ষা) করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক আসিয়ান (ASEAN)-এর দিকে ঝুঁকছে। তিনি লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে নয়াদিল্লি বা কোনো পরাশক্তিকে এড়িয়ে কুয়ালালামপুরকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি অত্যন্ত সুনিপুণ এবং গভীর কৌশলগত বার্তা। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের যে একক মনোপলি বা মোড়লপনা কাজ করে, ঢাকা এখন স্পষ্টতই তার বিকল্প খুঁজছে। আসিয়ান-এর অন্যতম প্রভাবশালী ও মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য বানিয়ে এবং এর ঠিক পরেই বেইজিং সফরের সূচি চূড়ান্ত করে তারেক রহমান বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, নতুন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে চায়। এটি ভারতের জন্য একটি বড় আঞ্চলিক ধাক্কা।”

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ‘আসিয়ান’ সমীকরণ

মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় নীতি-নির্ধারণী ও অর্থনৈতিক থিংক-ট্যাংক প্ল্যাটফর্ম Malaysia Brief দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য এবং আসিয়ানের প্রেক্ষাপটে এই সফরের গুরুত্ব নিয়ে সুদীর্ঘ পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে।

প্রফেসর ড. ইসমাইল সাবরি ওথমান (Prof. Dr. Ismail Sabri Othman), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিভার্সিটি অব মালয়া (UM)।
তাঁর বিশ্লেষণের শিরোনাম হচ্ছে- “আসিয়ান-বাংলাদেশ অক্ষ: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব” (The ASEAN-Bangladesh Axis: Shifting from Bilateral Trade to Strategic Partnership)

প্রফেসর ইসমাইল তাঁর বিশ্লেষণে দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং আসিয়ান জোটে বাংলাদেশের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সার্ক (SAARC) যখন ভারতের ভেটোর কারণে অচল হয়ে পড়েছে, তখন তারেক রহমানের দূরদর্শিতা হলো আসিয়ান ব্লকের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাগ্যকে জুড়ে দেওয়া। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন আর কেবল সস্তা শ্রমিক রপ্তানি করার অনুন্নত দেশ নয়, এটি ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের এক বিশাল কনজিউমার মার্কেট। ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পন্ন করার যে রোডম্যাপ কুয়ালালামপুরে দুই নেতা স্বাক্ষর করেছেন, তা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে নতুন মাত্রা দেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক রহমান এই সফরে মালয়েশিয়ার কাছে আসিয়ান ব্লকে ঢাকার প্রবেশের জন্য যে জোরালো লবিং করেছেন, তা ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রচেষ্টাকেই প্রমাণ করে।”

অভিন্ন স্বার্থ ও উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে অংশীদারিত্ব: ‘হালাল ইকোনমি’ থেকে ‘সেমিকন্ডাক্টর’

মালয়েশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ও কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম The Edge Malaysia এই সফরে স্বাক্ষরিত বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত এমওইউ (MoU) গুলোর ওপর গভীর দৃষ্টিপাত করেছে। দাতো’ নাজরিন আনোয়ার (Dato’ Nazrin Anwar), সিনিয়র ইকোনমিক পলিসি কনসালটেন্ট এবং মালয়েশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চ (MIER)-এর উপদেষ্টা। তিনি লিখেছেন, “লেবার মার্কেট ছাড়িয়ে: সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি এবং হালাল অর্থনীতিতে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ নতুন জোড়” (Beyond the Labour Market: The New Malaysia-Bangladesh Nexus in Semiconductors, Energy, and Halal Economy)

দাতো’ নাজরিন দেখিয়েছেন যে, দুই দেশ প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং ও এনার্জি ডিপ্লোমেসিতে পা রাখছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট পেট্রোনাস (Petronas) এবং বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার মধ্যকার এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মালয়েশিয়ার ফার্মগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাতো বলেন, “উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল ‘শ্রমিক ও রেমিট্যান্স’ এর সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে একটি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে রূপ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মালয়েশিয়ার বিশ্ববিখ্যাত সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি, স্মার্ট ইকোনমি এবং শক্তিশালী হালাল ইকোসিস্টেমের অভিজ্ঞতাকে তারেক রহমান বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতিতে দ্রুত ইন্টিগ্রেট করতে চান। এটি দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের এক নতুন অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর তৈরি করবে।”

মানবসম্পদ ও সুশাসন: সিন্ডিকেট ধ্বংসের যৌথ সংকল্প

মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা Bernama এবং তাদের বিশেষ ওপি-এড কলামে অভিবাসন খাতের দুর্নীতি নির্মূল এবং দুই দেশের যৌথ জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। অ্যান্ডি হল (Andy Hall), কুয়ালালামপুর-ভিত্তিক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় শ্রম অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং হিউম্যান রাইটস রিসার্চার। তিনি লিখেছেন, “আনোয়ার-তারেক যুগলবন্দি: অভিবাসন খাতে সিন্ডিকেট ভাঙার চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় নিরাপত্তা” (The Anwar-Tarique Alliance: Dismantling Labor Syndicates and Ensuring National Security)

অ্যান্ডি হলের মতে, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী আমলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার শ্রমবাজার যেভাবে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ মাফিয়া ও সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি ছিল, তার অবসান ঘটাতে দুই দেশের নতুন নেতৃত্বের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সুশাসন (Madani Vision) এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জিরো-টলারেন্স নীতি এখানে মিলে গেছে।

তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলেন, “তারেক রহমানের এই সফরে মানবপাচার প্রতিরোধ এবং কাউন্টার-টেররিজম রিসার্চ নিয়ে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি দ্বিপাক্ষিক ডকুমেন্ট এক্সচেঞ্জ হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উভয় নেতাই বুঝতে পেরেছেন যে, বিগত দিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট সিন্ডিকেটগুলো কেবল শ্রমিকদের শোষণই করেনি, বরং তা দুই দেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করেছিল। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ডিজিটাল এবং বৈষম্যহীন করার মাধ্যমে দুই দেশ তাদের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গাটি সফলভাবে দূর করতে পেরেছে।”

উপসংহার: মালয়েশিয়ার এই শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণ মেলালে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কুয়ালালামপুরের চোখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল একটি সাধারণ মৈত্রী সফর ছিল না। ভূ-রাজনৈতিকভাবে এটি ছিল ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির প্রতি একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা যে, নতুন বাংলাদেশ আর কোনো একক দেশের আঞ্চলিক আধিপত্য মেনে নিতে প্রস্তুত নয়; বরং আসিয়ান অঞ্চলের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ঢাকা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বাবলম্বী।

লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।