সাইফুল খান
১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে যখন আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়। তখন নব্য শাসকগোষ্ঠী উসমানীয় (অটোমান) আমলের অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে দেশকে পশ্চিমা ধাঁচে আধুনিকায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই দর্শনকে বলা হতো “কামালিজম” (Kamalism), যার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতা (Laiklik)।
এই নীতির অধীনে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য একের পর এক কঠোর আইন পাস করা হয়।
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (TBMM) বা সংসদে একই দিনে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক আইন পাস করা হয়, যা তুরস্কের হাজার বছরের ইসলামি কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
আইন নম্বর ৪৩১ খিলাফতের অবসান। এই আইনের মাধ্যমে উসমানীয় খিলাফতকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন শেষ খলিফা ২য় আব্দুল মেজিদ এবং উসমানীয় রাজপরিবারের সকল সদস্যকে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) পরের দিন ভোরের মধ্যে তুরস্কের ভূখণ্ড ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়!
আইন নম্বর ৪৩০ শিক্ষা ব্যবস্থার একীকরণ – Tevhid-i Tedrisat Kanunu। এই আইনের মাধ্যমে তুরস্কের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে (Maarif Vekaleti) দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সুন্নি ইসলামি বিশ্বের প্রধান স্তম্ভ, সব ধরনের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র এবং সুফি খানকাহ ও দরগাহগুলো চিরতরে নিষিদ্ধ ও সিলগালা করে দেওয়া হয়।
আইন নম্বর ৪২৯ শরিয়াহ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয় বিলুপ্তি। উসমানীয় আমলের ‘শরিয়াহ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়’ (Şeriyye ve Evkaf Vekaleti) বিলুপ্ত করে তার জায়গায় ‘ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর’ (Diyanet İşleri Başkanlığı) গঠন করা হয়। তবে এই নতুন সংস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে এনে এর সমস্ত রাজনৈতিক ও আইনি ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং এটি কেবল নামাজের সময়সূচি ও সীমিত ধর্মীয় আচার দেখভালের সংস্থায় পরিণত হয়।
২৫ নভেম্বর, ১৯২৫। তুর্কিদের বাহ্যিক অবয়ব থেকে ইসলামি ও প্রাচ্য সংস্কৃতির ছাপ মুছে ফেলে তাদের ইউরোপীয়দের মতো দেখাতে এই আইন করা হয়।
টুপি আইন-আইন নম্বর ৬৭১৷ এই আইনের মাধ্যমে উসমানীয়দের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ‘ফেজ টুপি’ (Fez) এবং পাগড়ি পরা সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আইন করা হয়, সকল সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের জনসমক্ষে ইউরোপীয় ধাঁচের হ্যাট বা হ্যামবার্গ হ্যাট পরতে হবে।
এই আইনের বিরুদ্ধে আনাতোলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন: রিজে, মারাশ, এরজুরুম) তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার ‘আদালতে ইস্তিকলাল’ (স্বাধীনতা আদালত) গঠন করে সামরিক আদালতের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করে। টুপি পরতে অস্বীকৃতি জানানো এবং এই আইনের সমালোচনা করার অপরাধে “ইসকিলিপলি আতিফ হোজা (İskilipli Atıf Hoca)” নামক একজন প্রখ্যাত আলেমকে ১৯২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফাঁ.সি দেওয়া হয়।
ধর্মীয় পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইন পাশ হয় ৩ ডিসেম্বর, ১৯৩৪। আইন নম্বর ২৫৯৬। এর মাধ্যমে মুসলিম ওলামা এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতদের জন্য উপাসনালয়ের (মসজিদ/গির্জা) বাইরে ধর্মীয় পোশাক বা আলখাল্লা পরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। কেবল মাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত প্রধান মুফতি (Diyanet İşleri Başkanı) এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিলেন।
হিজাবের ওপর অলিখিত সামাজিক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। যদিও নারীদের হিজাব বা বোরকা সরাসরি নিষিদ্ধ করে কোনো লিখিত সংসদীয় আইন পাস করা হয়নি, তবে সরকারি ডিক্রি এবং প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি অফিসে হিজাব পরা নারীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় (বাংলাদেশে এই প্রাকটিস শুরু হয়েছিলো, এখনো কিছু কিছু জায়গায় আছে)। সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্র থেকে হিজাব পরিহিত নারীদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
১ নভেম্বর,১৯২৮। ল্যাটিন হরফ প্রবর্তন ও আরবি ভাষার উচ্ছেদ করা হয়। এই আইনটি ছিল তুর্কি সমাজকে তাদের অতীত ইতিহাস ও ইসলামি ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার। আইন নম্বর ১৩৫৩, তুর্কি বর্ণমালা আইন। এর মাধ্যমে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসা আরবি-ফারসি ভিত্তিক উসমানীয় তুর্কি লিপির ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ল্যাটিন (ইংরেজি) অক্ষরের ওপর ভিত্তি করে নতুন তুর্কি বর্ণমালা চালু করা হয়। এখানে উল্লেখ্য উসমানী আমলে রাজপরিবারে ফার্সি ভাষাও চালু ছিলো।
১৯২৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশের সব ধরনের সংবাদপত্র, বই, সরকারি দলিলপত্র এবং আদালতে আরবি অক্ষরের ব্যবহার সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। এর ফলে রাতারাতি তুরস্কের ৯৯% মানুষ নিরক্ষর হয়ে পড়ে! তারা তাদের পূর্বপুরুষদের লেখা বই, ইতিহাস, দলিল এমনকি কবরের ফলক পড়ার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলে। একই সাথে সরকারিভাবে আরবি ও ফারসি ভাষার সব ধরনের ক্লাস ও শিক্ষাদান স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কামালিস্ট সরকারের সংস্কার যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন সরাসরি মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় ইবাদত ও আযানের ওপর আঘাত আসে।
সরকারি ডিক্রি জারি- ৩০ জানুয়ারি, ১৯৩২। অফিসিয়ালি কামাল আতাতুর্কের নির্দেশে এবং সরকারি ধর্মীয় সংস্থা ‘দিয়ানেত’-এর আদেশে ১৯৩২ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে তুরস্কের সকল মসজিদে আরবি ভাষায় আযান দেওয়া এবং সালাতের ভেতর আরবিতে ইকামত দেওয়া সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরিবর্তে তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করা আযান জোরপূর্বক চালু করা হয় (যেমন: আল্লাহু আকবার-এর জায়গায় বলা হতো তানরি উলুদুর)।
১৯৩২ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আরবি আযানের নিষেধাজ্ঞা কেবল প্রশাসনিক আদেশে চললেও,১৯৪১ সালের ২ জুন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসমত ইনোনুর শাসনামলে তুর্কি দণ্ডবিধির (Turkish Penal Code) ধারা ৫২৬ সংশোধন করা হয়। এই নতুন সংশোধনী অনুযায়ী: “যারা আরবি ভাষায় আযান দেবে বা ইকামত দেবে, তাদের ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ থেকে ২০০ লিরা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়।”
এই আইনের অধীনেই ঘরের ভেতর বা বাইরে যেকোনো জায়গায় আরবি হরফে কুরআন শিক্ষা দেওয়া, তিলাওয়াত শেখানো বা হিফজ করানো রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে গণ্য হতে শুরু করে। যেহেতু মাদ্রাসাগুলো আগেই বন্ধ করা হয়েছিল, তাই আরবি কায়দা বা কুরআন নিজের সন্তানদের শেখানোও অপরাধের তালিকায় চলে যায়।
এই দুই দশক (বিশেষ করে ১৯৩২ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত) তুরস্কের গ্রামীণ এবং রক্ষণশীল অঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় সময়। আইনগুলো বাস্তবায়নের জন্য গ্রামীণ সামরিক পুলিশ এবং বেসামরিক গোয়েন্দাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
গ্রামীণ অঞ্চলের জেন্ডারমারি পুলিশ বা ঘোড়সওয়ার বাহিনী যেকোনো সময় সন্দেহ হলেই সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, শস্যের গোলা বা খামারবাড়িতে অতর্কিত হানা দিত। যদি ঘরের কোনো গোপন কুঠুরি, সিন্দুক বা বালিশের নিচেও কোনো আরবি কায়দা, উসমানীয় আমলের ধর্মীয় বই বা কুরআনের অনুলিপি পাওয়া যেত, তবে পুরো পরিবারকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হতো। (বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট জমানায় জিহাদি বই, গোপন মিটিংয়ের নামে গন গ্রেফতার দিয়ে অনুধাবন করতে পারেন।)
আরবি কুরআন বা আযানের অপরাধে ধরা পড়লে ওলামা এবং সাধারণ মানুষদের প্রথমে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের দাড়ি কেটে ফেলা হতো, প্রহার করা হতো এবং মাসের পর মাস অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হতো (কল্পনা করুন আয়নাঘর)। অনেকে ‘আদালতে ইস্তিকলাল’-এর বিচারে দীর্ঘমেয়াদি সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতেন।
এই সময় তুর্কি মুসলমানরা তাদের ঘরের মূল্যবান ও প্রাচীন ইসলামি বই এবং কুরআনের কপিগুলো জেন্ডারমারির হাত থেকে বাঁচাতে কাপড়ে মুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন বা খড়ের গাদার ভেতর লুকিয়ে রাখতেন। বহু প্রাচীন পান্ডুলিপি পুলিশি তল্লাশির ভয়ে নদী বা কুয়ায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ।
গ্রামে যখন কেউ গোপনে আরবিতে আযান দেওয়ার চেষ্টা করত, তখন অন্য যুবকেরা লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে গ্রামের প্রবেশমুখে পাহারা দিত, যাতে দূর থেকে জেন্ডারমারি বা সরকারি ঘোড়সওয়ারদের আসতে দেখলে সংকেত দেওয়া যায়। সংকেত পাওয়া মাত্রই আযান বন্ধ করে সবাই সাধারণ চাষী বা শ্রমিকের ছদ্মবেশ ধারণ করত।
@
কামালের দুই দশকের চরম অন্ধকার সময়ে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে যিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন আল্লামা সুলাইমান হিলমি তুনাহান (১৮৮৮–১৯৫৯)। তিনি ছিলেন উসমানীয় আমলের একজন শীর্ষস্থানীয় আলিম, ফিকহ শাস্ত্রবিদ এবং আইনবিদ। যখন সব মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হলো, তিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কুরআন শিক্ষা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী এক প্রজন্মের মধ্যে তুরস্ক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে যাবে। তাই তিনি শুরু করলেন এক গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ। যেহেতু সাধারণ ঘরবাড়ি, মসজিদ বা বাগানে বসলে সহজেই সরকারি গোয়েন্দা (MIT) বা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল, তাই সুলাইমান হিলমি তুনাহান এক অভিনব বুদ্ধি বের করলেন। তিনি তার ছাত্রদের নিয়ে দূরপাল্লার ট্রেনের পুরো একটি বগি বা কয়েকটি বগির টিকিট কাটতেন।
ট্রেন যখন স্টেশন ছেড়ে এক শহর থেকে অন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতো, তখন তিনি সাধারণ যাত্রী সেজে ছাত্রদের নিয়ে বসতেন।
ট্রেন চলতে শুরু করলেই শুরু হতো হিফজ এবং কুরআনের পাঠ। জানালা দিয়ে বাইরে নজর রাখা হতো। ট্রেন যখন কোনো স্টেশনে থামার উপক্রম হতো, সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের কপিগুলো লুকিয়ে ফেলা হতো এবং শিক্ষকরা সাধারণ কাপড়ের ব্যবসায়ী বা মুসাফিরের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন।
স্টেশন পার হয়ে ট্রেন আবার গতি নিলে পাঠদান শুরু হতো। এভাবে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চলন্ত ট্রেনের গতিকে কাজে লাগিয়ে তারা কুরআন শিক্ষা সচল রেখেছিলেন।
শুধু ট্রেন নয়, সুলাইমান হিলমি তুনাহান এবং তার অনুসারীরা শহরের উপকণ্ঠে প্রত্যন্ত খামারবাড়ি ভাড়া নিতেন। সেখানে ছাত্ররা দিনের বেলা কৃষি শ্রমিক বা রাখাল হিসেবে কাজ করত, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। আর রাতের আঁধারে মোমবাতি জ্বালিয়ে চলত কুরআনের দরস। কখনো কখনো তারা শহরের কোলাহল থেকে দূরে জনমানবহীন পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিতেন সুরা কাহফের যুবকদের মত এবং দিনের পর দিন সেখানে অবস্থান করে দ্বীনি ইলম অর্জন করতেন।
এই কাজের জন্য সুলাইমান হিলমি তুনাহানকে বহুবার গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, কারাবরণ করতে হয়েছে এবং অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তার মিশন থেকে এক চুলও নড়েননি।
সুলাইমান হিলমি তুনাহান এবং তার মতো অন্যান্য মনীষীদের (যেমন: বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি) এই গোপন ও আত্মত্যাগী সংগ্রামের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। তারা যদি সেদিন এই ঝুঁকি না নিতেন, তবে তুরস্কের সমাজ ব্যবস্থা থেকে ইসলাম সম্পূর্ণ হারিয়ে যেত।
তুরস্কের ইতিহাসের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান ঘটে ১৯৫০ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে। কট্টর সেক্যুলার দল ‘সিএইচপি’ (CHP) নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয় এবং জননেতা আদনান মেন্দেরেস (Adnan Menderes)এর ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় আসে।
ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায়, ১৯৫০ সালের ১৬ জুন, আদনান মেন্দেরেসের সরকার তুর্কি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দণ্ডবিধির ৫২৬ ধারা বাতিল করে এবং দীর্ঘ ১৮ বছর পর তুরস্কে পুনরায় সরকারিভাবে আরবি ভাষায় আযান দেওয়ার অনুমতি ফিরিয়ে দেয়। যেদিন এই আইন পাস হয়, সেদিন পুরো তুরস্কের মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিয়েছিল এবং প্রতিটি মসজিদে একের পর এক বহুবার আরবিতে আযান দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আবেগ প্রকাশ করেছিল। মানুষের ভিতর লুকিয়ে রাখা ধর্মীয় আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে।
১৯৫০ সালে তুরস্কে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয় এবং আদনান মেন্দেরেসের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় এসে আরবি আযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ঠিক যেন বাংলাদেশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন আদনান মেন্দেরেস হয়ে এসেছিলেন। এরপর সুলাইমান হিলমি তুনাহানের এই গোপন আন্দোলন প্রকাশ্যে আসে। আজ তুরস্কে এবং ইউরোপে তাদের হাজার হাজার “কুরআন কোর্স” (Kur’an Kursu) এবং ছাত্রাবাস রয়েছে। তুরস্কের ইসলামি পুনরুত্থানের পেছনে এই সুলাইমানি জামাত অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এই নীরব বিপ্লবের ফলেই তুরস্কের সাধারণ মানুষের অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ন থাকে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নাজমুদ্দিন এরবাকানের “মিল্লি গুরুশ” (National Outlook) আন্দোলনের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ২০০২ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের একে পার্টির (AK Party) ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে। এরদোয়ানের গত দুই দশকের শাসনামলে হিজাবের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। ‘ইমাম হাতিপ’ (ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত রূপ) স্কুলগুলোর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে।
আজকের তুরস্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটি তার অটোমান বা ইসলামি অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত তৎপর। তবে তুরস্কের ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি বিপরীতমুখী ধারা আমাদের সামনে আসে। বর্তমান তুরস্কের সরকার ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা, ফিলিস্তিনসহ বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর পক্ষে দাঁড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
তুরস্কের ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর বা “দিয়ানেত” (Diyanet) এখন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এর বাজেট ও প্রভাব তুরস্কের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বেশি। তারা বিশ্বজুড়ে মসজিদ নির্মাণ এবং ইসলামি সংস্কৃতির প্রচার করছে।
তুর্কি ড্রামা বা সিরিজগুলো (যেমন: দিরিলিস আরতুগ্রুল, কুরুলুস ওসমান, পায়িতাহত আব্দুল হামিদ) বিশ্বজুড়ে মুসলিম যুবসমাজের মধ্যে এক ধরনের ইসলামি আত্মমর্যাদাবোধ ও ইতিহাস সচেতনতা তৈরি করছে।
তুরস্কে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে ধর্মবিমুখতা বা ‘ডেইজম’ (Deism – ঈশ্বরে বিশ্বাস কিন্তু ধর্মে উদাসীনতা) এবং সেক্যুলার জীবনযাত্রার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। দীর্ঘদিনের লিবারেল সরকারের অধীনে বড় হওয়া সত্ত্বেও অনেক তরুণ আধুনিক পশ্চিমা জীবনধারা এবং তীব্র জাতীয়তাবাদের (Nationalism) দিকে ঝুঁকছে। তুরস্কের সমাজ এখনো গভীরভাবে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে কট্টর কামালিষ্ট-সেক্যুলার পক্ষ, যারা সুযোগ পেলেই তুরস্ককে ১৯৩০-এর দশকের সেই কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাদী ও ইসলামপন্থী পক্ষ। ক্ষমতার হাতবদল হলে এই সমীকরণ যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
যে তুরস্কে একসময় চলন্ত ট্রেনের বগিতে লুকিয়ে কুরআন পড়তে হতো, সেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আজ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে স্বকণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করেন। সুলাইমান হিলমি তুনাহানদের মতো মুখলেস মানুষেরাই তুরস্কের মাটিকে ইসলামের জন্য উর্বর করে রেখেছিলেন।
তুরস্কে ইসলামের ভবিষ্যৎ হয়তো শতভাগ মসৃণ নয় এবং সেখানে সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের দ্বন্দ্ব চলতেই থাকবে; তবে এটা নিশ্চিত যে, তুরস্কের সমাজ থেকে ইসলামকে উপড়ে ফেলার যে চেষ্টা একদা করা হয়েছিল, তা চিরতরে ব্যর্থ হয়েছে। তুরস্ক এখন আর ইসলামকে বর্জন করার মডেলে বিশ্বাসী নয়, বরং আধুনিকতা ও ইসলামের এক অনন্য সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে তারা আগামী পৃথিবীর বুকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
