সাইফুল খান
ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে যাদের নাম লেখা থাকে, তারা কি সত্যিই সিদ্ধান্ত নেন? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্ট এই প্রাতিষ্ঠানিক মুখগুলোর পেছনে কি আরেকটি জগৎ আছে, যেখানে মঞ্চের পর্দা কখনো ওঠে না?
এই প্রশ্নটি নিছক কল্পনার নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিজ্ঞানী C. Wright Mills ১৯৫৬ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Power Elite’-এ দেখিয়েছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের একটি ত্রিভুজ পরস্পরের স্বার্থে কাজ করে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো সেই ত্রিভুজের বাইরে মূলত প্রতীকী। এটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; এটি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সমাজবিজ্ঞান।
কিন্তু এই অভিজাত নেটওয়ার্কের শিকড় কত গভীর? এর বয়স কত? এবং কীভাবে ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলো জেসুইট থেকে শুরু করে আধুনিক বিলডারবার্গ গোষ্ঠী পর্যন্ত এই ক্ষমতার জালকে বিস্তৃত করেছে ও টিকিয়ে রেখেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের পাঁচ শতাব্দীর পেছনের ইতিহাস পেরোতে হবে।
জেসুইট: পোপের গোয়েন্দা বাহিনী থেকে বৈশ্বিক শিক্ষা-সাম্রাজ্য
১৫৩৪ সাল। ইউরোপ তখন কাঁপছে। মার্টিন লুথারের ধর্মসংস্কার আন্দোলন ক্যাথলিক চার্চের শতাব্দী পুরনো একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে ফেলছে। ইংল্যান্ড বেরিয়ে গেছে রোমের বলয় থেকে। জার্মানির অর্ধেক রাজ্য প্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের মুহূর্তে ‘ইগনেসিয়াস লয়োলা’ নামক একজন প্রাক্তন স্পেনীয় সেনা অফিসার প্যারিসে বসে গড়লেন এমন একটি সংগঠন, যা শুধু প্রার্থনা নয় লড়াই করবে।
‘সোসাইটি অব জেসাস’ বা জেসুইটদের গঠনটা ছিল সেনাবাহিনীর মতো। শীর্ষে ‘সুপিরিয়র জেনারেল’, নিচে স্তরে স্তরে আনুগত্য এবং পোপের প্রতি নিঃশর্ত বশ্যতার শপথ। পোপ তৃতীয় পল ১৫৪০ সালে স্বীকৃতি দিলেন। কিন্তু জেসুইটদের আসল অস্ত্র ছিল শিক্ষা যেটা তরবারির চেয়েও ধারালো।
পরের দুই শতকে জেসুইটরা এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়লেন। চীনে মাতেও রিচি (Matteo Ricci) স্থানীয় পোশাক পরলেন, চীনা ভাষা শিখলেন, মিং রাজদরবারে ঢুকলেন বিজ্ঞানী হিসেবে এবং সম্রাটের বিশ্বাসভাজন হয়ে ধর্মপ্রচার করলেন। জাপানে, ভারতে, ব্রাজিলে একই কৌশল। স্থানীয় সংস্কৃতিকে ব্যবহার করো, রাজদরবারে ঢোকো, তারপর প্রভাব বিস্তার করো। এই পদ্ধতিকে পরবর্তীকালে আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুপ্রেরণা বলে অনেক বিশ্লেষক চিহ্নিত করেছেন।
ইউরোপে জেসুইটরা রাজদরবারের ‘আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা’ হিসেবে ঢুকলেন। ফ্রান্সে, স্পেনে, পর্তুগালে, অস্ট্রিয়ায় রাজপরিবারের স্বীকারোক্তি শুনতেন জেসুইট পাদ্রিরা। রাজার সবচেয়ে গোপন কথা জানত যে কান, সেই কান জেসুইটদের। এই অবস্থান ছিল তথ্যশক্তির এক অসাধারণ কেন্দ্র।
কিন্তু ক্ষমতা টিকল না। ১৭৫৯ সালে পর্তুগাল, ১৭৬৩ সালে ফ্রান্স, ১৭৬৭ সালে স্পেন একের পর এক দেশ জেসুইটদের বিতাড়িত করল। অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজতন্ত্রের উপর পোপের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ১৭৭৩ সালে পোপ চতুর্দশ ক্লিমেন্ট নিজেই সংগঠনটি বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন। কিন্তু মাত্র চল্লিশ বছর পরে, ১৮১৪ সালে, পোপ সপ্তম পিউস জেসুইটদের পুনরুজ্জীবিত করলেন কারণ চার্চ বুঝেছিল, এমন অস্ত্র ছেড়ে দেওয়া যায় না।
আজ জেসুইটরা বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। Georgetown, Fordham, Boston College-সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশ জেসুইট প্রতিষ্ঠান। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছেন বিশ্বের কূটনীতিক, সিআইএ কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও রাজনীতিবিদ। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ গড়া এবং সেই মানুষদের মাধ্যমে বিশ্ব পরিচালনা এই কৌশলটি পাঁচ শতকে একটুও পুরনো হয়নি।
ফ্রিম্যাসন: আলোকিতকরণের আড়ালে বিপ্লব ও রাষ্ট্র নির্মাণ
১৭১৭ সাল। লন্ডনের একটি মদের দোকান ‘গুজ অ্যান্ড গ্রিডিরন’-এ চারটি লজ একত্রিত হয়ে প্রথম গ্র্যান্ড লজ প্রতিষ্ঠা করল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একদল পুরুষের ভ্রাতৃত্বমূলক আড্ডার আসর। ভেতরে ছিল ইউরোপের সবচেয়ে বিস্ফোরক চিন্তার কেন্দ্র।
ফ্রিম্যাসনদের উত্থান আলোকিতকরণ বা এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের সাথে হাত ধরে এসেছে। যুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মনিরপেক্ষতা এই তিনটি ধারণাই সেই সময়ে ছিল বিপজ্জনক। চার্চ এবং রাজতন্ত্র যে বিশ্বব্যবস্থা হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল, ফ্রিম্যাসনরা সেটিকে ভেতর থেকে ভাঙতে চাইছিল।
তাদের সদস্য তালিকা পড়লে চমকে যেতে হয়। ভলতেয়ার যাঁর লেখা চার্চের ভিত কাঁপিয়েছিল। মোজার্ট যাঁর অপেরা ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এ ফ্রিম্যাসনারির প্রতীক ছড়িয়ে আছে। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের একজন, যিনি প্যারিসে থাকাকালীন ফরাসি এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাবিদদের সাথে ফ্রিম্যাসন লজে মিলিত হতেন। জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি। প্রথম চৌদ্দজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এগারোজনই ছিলেন ফ্রিম্যাসন!
ওয়াশিংটন শহরের নগর পরিকল্পনা করেছিলেন পিয়ের শার্ল ল্যাঁফঁ, তিনি একজন ফ্রিম্যাসন। গবেষকরা দেখিয়েছেন, ক্যাপিটল হিল থেকে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত রাস্তার নকশায় ফ্রিম্যাসনারির জ্যামিতিক প্রতীক রয়েছে। মার্কিন ডলারের নোটে ‘সর্বদর্শী চোখ’, ‘নোভুস অর্ডো সেক্লোরাম’ বা ‘নতুন যুগের নতুন ব্যবস্থা’ লেখাটি এগুলো কাকতালীয় নয় বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।
ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯) ফ্রিম্যাসনদের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদরা একমত নন, তবে অস্বীকার করার জায়গাও কম। বিপ্লবের অন্যতম নেতা লাফায়েত, মিরাবো, ভলতেয়ার প্রায় সবাই ছিলেন ফ্রিম্যাসন। ‘স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব’ ফরাসি বিপ্লবের এই স্লোগানটি এবং ফ্রিম্যাসনারির ভ্রাতৃত্বের আদর্শের মধ্যে সংযোগটি আকস্মিক নয়।
রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে রাজনৈতিক আন্দোলন ঊনবিংশ শতাব্দীতে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার পেছনে ফ্রিম্যাসন নেটওয়ার্কের সক্রিয় ভূমিকার তথ্য ইতালি, স্পেন ও লাতিন আমেরিকার ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে। ইতালির ঐক্যবদ্ধকরণ আন্দোলনের নেতা গ্যারিবল্ডি ছিলেন ফ্রিম্যাসন। অটোমান সাম্রাজ্যকে ভেঙে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র গড়ার মূল শক্তি ‘ইয়াং টার্কস’ আন্দোলনের অনেক নেতাও ফ্রিম্যাসন লজের সদস্য ছিলেন!
এই সমস্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, ফ্রিম্যাসনারি শুধু একটি ভ্রাতৃত্বমূলক আড্ডার আসর ছিল না। এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী মানুষেরা একটি ভাষায় কথা বলতেন, পরস্পরকে চিনতেন এবং পরস্পরের স্বার্থে কাজ করতেন।
বিলডারবার্গ: আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোপন বৈঠক
১৯৫৪ সালের মে মাস। নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট শহর আর্নহেমের কাছে ‘হোটেল ডে বিলডারবার্গ’-এ জড়ো হলেন পশ্চিমা বিশ্বের ৮০ জন প্রভাবশালী মানুষ। তাঁদের মধ্যে রাষ্ট্রনেতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বহুজাতিক কর্পোরেশনের প্রধান, গণমাধ্যমের মালিক ছিলেন। আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ হবে না এটাই নিয়ম।
তখন থেকে প্রতি বছর এই ‘বিলডারবার্গ সভা’ হয়। বিভিন্ন দেশে, কড়া নিরাপত্তায়, সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ রেখে। অংশগ্রহণকারীরা কী আলোচনা করেন, কোনো সিদ্ধান্ত হয় কিনা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয় না। ২০১০ সালের আগে সংগঠনটির নিজস্ব কোনো ওয়েবসাইটই ছিল না।
কারা আসেন এই সভায়? তালিকা দেখলে মাথা ঘুরে যায়। বিল ক্লিনটন ১৯৯১ সালে বিলডারবার্গ সভায় যোগ দেন। পরের বছর তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি। টনি ব্লেয়ার ১৯৯৩ সালে গেলেন দুই বছর পরে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা এবং ১৯৯৭-এ প্রধানমন্ত্রী। ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ফ্রান্সে অপরিচিত মুখ ছিলেন, ২০১৪ সালে বিলডারবার্গে গেলেন, তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রেসিডেন্ট। এই ‘কাকতালীয়’ মিলগুলো এতটাই নিয়মিত যে সাংবাদিক ও গবেষকরা বলেন বিলডারবার্গ যেন নেতৃত্বের ‘পরীক্ষা কেন্দ্র’, যেখানে বাছাই হয় পরের প্রজন্মের বিশ্বনেতা। আমাদের ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস বিল্ডারবার্গের মিটিংয়ে কোনদিন এটেন্ড করেছেন কি না, সেরকম কোন তথ্য নেই।
দীর্ঘদিন বিলডারবার্গের মুখপাত্র ছিলেন ড্যানিশ রাজনীতিবিদ এটিয়েন ডাভিনিয়ন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন: ‘আমরা ইউরোপীয় একক মুদ্রার (ইউরো) সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই বিলডারবার্গে এটি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।’ এটি নিছক একটি আলোচনা-সভার স্বীকারোক্তি নয় এটি প্রমাণ যে রাষ্ট্রীয় পার্লামেন্টে ভোটের অনেক আগেই কিছু সিদ্ধান্ত অন্য কোথাও নেওয়া হয়।
বিলডারবার্গের নিয়মিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছে রকফেলার পরিবার, রথসচাইল্ড ব্যাংকিং পরিবার, গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মর্গান, রয়্যাল ডাচ শেলের মতো প্রতিষ্ঠান। আর গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে আসেন নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য ইকোনমিস্টের সম্পাদক ও মালিকরা। যারা পরে সেই সভার কোনো সংবাদ প্রকাশ করেন না। সাংবাদিকতার নীতিশাস্ত্রের এই লঙ্ঘনটি প্রকাশ্যে ঘটে, তবু কেউ প্রশ্ন তোলে না।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ও ত্রিপক্ষীয় কমিশন: নীতি তৈরির আড়ালের কারখানা
১৯২১ সালে নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’ বা সিএফআর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন অভিজাতশ্রেণি বুঝেছিল, আমেরিকা এখন আর গৃহকোণে বসে থাকতে পারবে না। বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আর সেই নেতৃত্বের নীতি কারা তৈরি করবে? প্রকাশ্য পার্লামেন্ট নয় বরং একটি গোষ্ঠী, যারা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, একই ক্লাবে যান, একই স্বার্থ রক্ষা করেন।
সিএফআরের সদস্যপঞ্জি মার্কিন ‘প্রতিষ্ঠানের’ মেরুদণ্ড বলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় প্রতিটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এই সংগঠনের সদস্য। হেনরি কিসিঞ্জার, জবিগনিয়েভ ব্রেজিনস্কি, ম্যাডেলিন অলব্রাইট, কন্ডোলিজা রাইস, হিলারি ক্লিনটন তালিকা বেশ দীর্ঘ। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল ধারাগুলো যে ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ থেকে তৈরি হয়, সেটি সিএফআর।
সিএফআরের প্রকাশনা ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ পত্রিকায় যে নীতি প্রস্তাব প্রকাশিত হয়, কয়েক বছরের মধ্যে সেটি মার্কিন সরকারি নীতিতে পরিণত হওয়ার উদাহরণ অসংখ্য। ইরাক আক্রমণ, আফগান যুদ্ধ, চীন নীতি এই সিদ্ধান্তগুলো ‘জনপ্রতিনিধিরা’ নিয়েছেন বলে ইতিহাস বলে, কিন্তু মূল ধারণাগুলো সিএফআরের কাগজ থেকে এসেছে।
২০২৬ সালে ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধও হঠাৎ সিদ্ধান্তের ফল না। এর পেছনে আছে ত্রিশ বছরের পরিকল্পনা। আরেকটি লেখায় সেটা পরিষ্কার করবো।
১৯৭৩ সালে রকফেলার ও ব্রেজিনস্কি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ট্রিলেটারেল কমিশন’ বা ত্রিপক্ষীয় কমিশন। নামটি বলে দেয় উদ্দেশ্য। উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ ও জাপান (পরে এশিয়া-প্যাসিফিক) এই তিন অঞ্চলের অভিজাতদের একটি সমন্বিত নীতি-কাঠামোর আওতায় আনা। এটি প্রকাশ্যেই বলেছিল যে জাতীয় সরকারগুলো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে অপর্যাপ্ত তাই বৈশ্বিক ‘ব্যবস্থাপনা’ দরকার।
১৯৭৬ সালে জিমি কার্টার মার্কিন রাষ্ট্রপতি হলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার ২৬ জন সদস্যের মধ্যে ১৯ জনই ছিলেন ত্রিপক্ষীয় কমিশনের সদস্য। এটি গণতন্ত্র নয় এটি একটি বিশেষ মতাদর্শিক ও শ্রেণিগত গোষ্ঠীর দ্বারা রাষ্ট্রযন্ত্র দখলের চিত্র।
ফেডারেল রিজার্ভ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং: যে ক্ষমতার কথা পাঠ্যবইয়ে নেই
১৯১০ সাল। নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের জেকিল আইল্যান্ডে গোপনে জমা হলেন সাতজন মানুষ। সিনেটর নেলসন অলড্রিচ, ব্যাংকার পল ওয়ারবার্গ এবং রকফেলার ও মর্গান পরিবারের প্রতিনিধিরা। ছদ্মনাম ব্যবহার করলেন যাতে কেউ চিনতে না পারে। এই বৈঠকের ফসল হলো ‘ফেডারেল রিজার্ভ আইন’ যা ১৯১৩ সালে পাস হয়।
ফেডারেল রিজার্ভ বা ‘ফেড’ মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকানায় একটি সমিতি, যা মার্কিন ডলার ছাপানোর এবং সুদের হার নির্ধারণের একচেটিয়া অধিকার রাখে। ডলারের মূল্য, ঋণের খরচ, মূল্যস্ফীতি, সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা, এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় বেসরকারি ব্যাংকারদের বোর্ডরুমে।
ইতিহাসবিদ অ্যান্টনি সাটন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একই মার্কিন ব্যাংকিং গোষ্ঠী বিবদমান উভয় পক্ষকে অর্থায়ন করেছে। যুদ্ধ তাদের কাছে মতাদর্শের লড়াই নয় বিনিয়োগ। যে পক্ষ জিতুক, মুনাফা নিশ্চিত। এই তথ্যগুলো কোনো গোপন সূত্র থেকে নয় মার্কিন কংগ্রেসের শুনানির নথি থেকে পাওয়া।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মাধ্যমে এই ব্যাংকিং অভিজাতদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে কাঠামোগত সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া, স্থানীয় শিল্প ধ্বংস করে বিদেশি পুঁজির পথ খোলা। এই ‘ঋণ-কূটনীতি’ প্রাক্তন বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ তাঁর নোবেল-পুরস্কার-পরবর্তী গ্রন্থ ‘Globalization and Its Discontents’-এ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
গণমাধ্যমের মালিকানা: কে ঠিক করে মানুষ কী ভাববে?
১৯৮৩ সালে মার্কিন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করত ৫০টি ভিন্ন কর্পোরেশন। ২০২৩ সালে সেটি কমে এসেছে মাত্র ছয়টিতে Comcast, Disney, Warner Bros. Discovery, Paramount, News Corp এবং Sony। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের মানুষ কী দেখবেন, কী পড়বেন, কোন যুদ্ধকে ‘ন্যায্য’ মনে করবেন। এই সিদ্ধান্ত নেয় মুষ্টিমেয় কর্পোরেট বোর্ডরুম।
এই ছয়টি কর্পোরেশনের বোর্ড সদস্যদের তালিকা পরীক্ষা করলে পাওয়া যাবে সিএফআরের সদস্য, বিলডারবার্গের অংশগ্রহণকারী এবং বড় ব্যাংকের পরিচালকদের নাম। এটি কাকতালীয় নয়। এটি একটি ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি যেখানে তথ্যের উৎস এবং নীতি-নির্মাতারা একই বৃত্তে ঘোরেন।
প্রাক্তন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম কোলবি ১৯৭৫ সালের কংগ্রেসীয় তদন্তে স্বীকার করেছিলেন যে সংস্থাটি মার্কিন ও বিদেশি গণমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে ‘এজেন্ট’ রেখেছে। এই প্রকল্পের নাম ছিল ‘অপারেশন মকিংবার্ড’। সাংবাদিক এবং সম্পাদকরা গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সংবাদ লিখছেন বা আটকে দিচ্ছেন এই তথ্য আর গোপন নেই, কিন্তু পাঠ্যবইয়েও নেই।
‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’: উচ্চাভিলাষ যখন প্রকাশ্যে স্বীকৃত
১৯৯০ সাল। মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ কংগ্রেসে ভাষণ দিলেন। বললেন: ‘আমরা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সুযোগ দেখছি, এমন একটি বিশ্ব যেখানে জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্নের ভূমিকা পালন করতে পারে।’ ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ শব্দগুচ্ছটি তখন থেকে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভাষা নয় রাষ্ট্রপ্রধানের মুখের কথা।
তারও আগে, ১৯৭৪ সালে, রিচার্ড গার্ডনার যিনি কিনা কার্টার প্রশাসনের সদস্য এবং সিএফআর সদস্য ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ পত্রিকায় লিখলেন: ‘জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে টুকরো টুকরো আক্রমণের মাধ্যমে ক্ষয় করতে হবে।’ এটি কোনো গোপন নথি নয় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী পররাষ্ট্রনীতি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রকাশ্য বক্তব্য।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম যা প্রতি বছর সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্বের প্রভাবশালীদের নিয়ে বসে এর প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব তাঁর বইয়ে ‘গ্রেট রিসেট’ বা মহা-পুনর্বিন্যাসের কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর ‘বিরল সুযোগ’। কীভাবে? ব্যক্তিমালিকানার ধারণা দুর্বল করে, রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙে, একটি কেন্দ্রীভূত বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করে। এই বক্তব্য বই আকারে প্রকাশিত, কেনা যায় যেকোনো দোকানে তবু মূলধারার গণমাধ্যম এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না।
পরিশেষ
এই পুরো আলোচনার শেষে একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। এতক্ষণ যা বললাম এটি কোন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; এটি একটি ব্যবস্থার বিশ্লেষণ। পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ধরে নেয় একটি কেন্দ্রীয় গোপন সংস্থা সবকিছু পরিকল্পনা করছে। বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল এবং কোনো কোনো দিক থেকে আরও উদ্বেগজনক। একটি শ্রেণিগত ও মতাদর্শিক গোষ্ঠী যারা একই স্কুলে পড়েছেন, একই ক্লাবে যান, একই সংগঠনের সদস্য এবং পরস্পরের সন্তানদের বিয়ে দেন। তারা স্বাভাবিকভাবেই একই স্বার্থে কাজ করে। এর জন্য গোপন শপথের দরকার নেই। এটি একটি সাধারণ সামাজিক বাস্তবতা, বৈশ্বিক মাত্রায়।
C. Wright Mills থেকে শুরু করে নোম চমস্কি, জোসেফ স্টিগলিৎজ এবং অ্যান্টনি সাটন পর্যন্ত যে গবেষকরা এই ব্যবস্থার কথা বলেছেন, তাঁরা কেউ পাগল নন বা ষড়যন্ত্রকামী নন। তাঁরা প্রকাশ্য তথ্য, কংগ্রেসীয় শুনানি, মুক্ত নথি এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা হলো: বিশ্বব্যবস্থা পরিচালিত হয় এমন একটি অভিজাত নেটওয়ার্কের দ্বারা, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে থেকে কাজ করে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির বাইরে।
এই বাস্তবতাকে চেনাই হলো প্রথম পদক্ষেপ। কারণ যে সমস্যাকে চেনা যায় না, তার সমাধানও খোঁজা যায় না।
লেখক -ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
