নয়াখবর
শনিবার, ৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লোকসানের ঘানিতে চিড়ে চ্যাপ্টা কৃষক

online
মে ১৬, ২০২৬ ৩:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নিজস্ব প্রতিবেদক: আলু পেঁয়াজ রসুনে এ বছর বড় ধরনের লোকসান গুনেছেন কৃষক। উৎপাদন খরচও তুলতে পারেনি প্রান্তিক চাষিরা। বোরো মৌসুমে নতুন করে যুক্ত হয় জ্বালানি সংকট। এতে বোরো চাষে বিঘাপ্রতি বাড়তি খরচ হয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এত খরচের পর ফসল ঘরে তোলার আগেই উজান থেকে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে হাওড়ের হাজার হাজার একর জমির ধান। চড়া মজুরিতে শ্রমিক এনে যতটুকু সম্ভব ঘরে তোলা গেলেও সেই ধান বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থা কৃষকের, তাদের ঘরে ঘরে এখন নীরব কান্না।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দেশের হাওড়াঞ্চলের সাতটি জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মোট কৃষিজমির ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। সাতটি হাওড় জেলায় এবার ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল।

এ বছর সরকারিভাবে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু  হাওড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে ফড়িয়াদের কাছে ভালো মানের (শুকনা) ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এমনিতেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না, এর সঙ্গে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঢলন প্রথা। ফসল ভালো মতো শুকানো হয়নি এমন অজুহাতে প্রতি মণে দুই থেকে তিন কেজি বেশি দিতে হচ্ছে কৃষককে। এভাবেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন কৃষকেরা।

সুনামগঞ্জ জেলার দেকার হাওড়ের কৃষক সুজন মিয়া এবার ২৫ বিঘার বেশি জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। অথচ বৃষ্টি ঢলের পানি জমি তলিয়ে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকার মতো ধান পেয়েছেন তিনি। ভারী বৃষ্টির কারণে ধানের রঙ কালো হওয়ায় তা ন্যায্য দামে বিক্রিও করতে পারছেন না।
সুজন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘ফড়িয়াদের কাছে ৪২ কেজিতে মণ ধরে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। একদিকে দাম কম, অন্যদিকে ওজনেও বেশি দিতে হচ্ছে। এবার আমরা শেষ।’

দুই দশকের বেশি সময় ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার মো. উজ্জ্বল হোসেন। তিনি বলেন, ধানের মণ ৪০ কেজি হলেও দুই থেকে আড়াই কেজি অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। শুধু ধান নয়, আলু এবং পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও বিক্রির সময় ৪২ কেজিতে মণ ধরা হয়। অথচ কৃষকরা যখন নিজে কিছু কিনতে যান, তখন ৪০ কেজিতেই এক মণ হিসেবে কিনতে হয়।
উজ্জ্বল উল্লেখ করেন, এক বিঘা জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত শ্রমিকের মজুরিসহ মোট খরচ হয় ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে কাঁচা ধানের দাম ১ হাজার টাকা এবং শুকনা ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতি বিঘায় কৃষকের প্রায় ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। আবার বাজারে বিক্রি করতে এসে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে মণে ৪২ কেজিতে বিক্রি করতে হয়। ওজনে বেশি নেওয়া বা দামের এই অনিয়ম রোধে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। এসব অনিয়ম ও সিন্ডিকেট রোধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন চাষি উজ্জ্বল হোসেন।

ওজনে বেশি কেন নেওয়া হয় জানতে চাইলে একই উপজেলার ধান ব্যবসায়ী (আড়তদার) স্বপন হোসেন বলেন, অনেকের ধান ভেজা বা ধানে বাতাস দেওয়া থাকে না, যার ফলে একটু বেশি ওজন নেওয়া হয়। তবে জোর করে কারও কাছ থেকে ওজন বেশি নেওয়া হয় না। আর নিজে ইচ্ছে করলেও নিয়ম পাল্টানো সম্ভব নয়, বাকি দশজনে যে নিয়মে ব্যবসা করে সেই নিয়মই মানতে হবে।

কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ওজন অনিয়মে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে গত ২৭ এপ্রিল নির্দেশ জারি করেছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সংস্থাটির মহাপরিচালক নাসির উদ-দৌলার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে পেঁয়াজ ও আমসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনাবেচার সময় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী পণ্যের ওজনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘ধলতা বা শুকনা’ (ঢলন প্রথা) গ্রহণের অজুহাতে কৃষকদের বাধ্য করে প্রতি ৪০ কেজিতে দুই থেকে ছয় কেজি পর্যন্ত  অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা অনৈতিক এবং ‘ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮’ এর অধ্যায় ৪, ধারা ২৯ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এমতাবস্থায় কৃষকদের আর্থিক হয়রানি থেকে রক্ষা এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

যুগ যুগ ধরে দেশের কৃষকরা বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন, যার মূল কারণ হিসেবে মধ্যস্বত্বভোগীদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন কৃষি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি  বলেন, এই মধ্যস্থতাকারীরাই বর্তমানে কৃষি অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বাজারের পূর্ণ দখল নিয়ে রেখেছে। তবে কেবল তাদের সরাসরি বাদ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, কারণ তাতে বেগুন বা টমেটোর মতো পচনশীল ফসল মাঠেই পচে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সমাধান হিসেবে সরকারের বর্তমান আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তার মতে, কৃষকদের জন্য বিকল্প ক্রেতা তৈরি করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে শিল্পপতিদের বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে যাতে দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠে। এর ফলে কৃষকদের আর মহাজনদের ওপর নির্ভর করতে হবে না; শিল্প কারখানাই হবে তাদের ফসলের বিকল্প বাজার। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে বিদেশের বাজারের সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীরা ৪০ কেজির জায়গায় ৪৫ কেজিতে মণ ধরার মতো কারচুপি করার সুযোগ পাবেন না।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেখানে ৪০ কিলোগ্রামকেই মানদণ্ড হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেখানে তার চেয়ে বেশি ওজন নেওয়াকে এক প্রকার মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।

তিনি বলেন, এটি কৃষকদের প্রতি চরম অবিচার এবং এই অনাচার বন্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সরকারি সিদ্ধান্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি আরো বলেন, কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা বা আইন দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত এবং যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। এই দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে সরকারের সব প্রশাসনিক কৌশল ও তদারকি পদ্ধতিকে পুরোপুরি কাজে লাগানো বলে মনে করেন নাজের হোসাইন।