নিজস্ব প্রতিবেদক: অতীতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণখাতগুলোতে ক্ষেত্রগুলোতে একচেটিয়া আধিপত্য লক্ষ্য করেছি বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, এসবখাতে বিদ্যমান ব্যবস্থার সিঙ্গে যোগসাজশপূর্ণ পুঁজিবাদের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই মাফিয়াতন্ত্র যাতে পুনরায় জেঁকে বসতে না পারে কিংবা তারা যদি এখনো সুপ্ত অবস্থায় থেকে থাকে, তবে তাদের নির্মূল করাই হবে বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সরকার যদি এটি সফলভাবে করতে পারে, তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পথে এটি হবে অনেক বড় পদক্ষেপ।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর বনানীতে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ফাহমিদা খাতুন।
পিআরআইয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার সভাপতিত্ব করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. শামস মাহমুদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
সেমিনারে ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি অরাজনৈতিক সরকারের সময়েও দেখা গেছে সংস্কার নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো সফলতা দেখা যায়নি। যদিও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে সফলতা আসেনি। এর মূল বাধা কোথায়? আসলে সংস্কার একটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। এখানে বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগীদের পক্ষ থেকে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসে এবং তারাই সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারা সংখ্যায় ছোট একটি গোষ্ঠী হলেও সরকারের নীতি নির্ধারণে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তারা এমন এক শক্তিশালী গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে ওঠে যারা রাষ্ট্রকে পর্যন্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
তিনি বলেন, আগামী ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জাতীয় সংসদে আগামী বছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। বাজেটের ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান খাত হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। অদক্ষতা এবং সক্ষমতার অভাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬.৯ শতাংশ। তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সরকার পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু খরচ প্রয়োজন হলেও, এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে কমিয়ে আনা সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার একটি বড় অংশ।উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দক্ষতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়, যা আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিপিডির ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বছরের বাজেটের আকার হবে ৯ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বিশাল অর্থের যোগান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আদায়ের হার আশানুরূপ নয়। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং বাকি ৩৫ শতাংশ আগামী দুই মাসে আদায় করতে হবে। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জনবলের দক্ষতা দিয়ে এই লক্ষ্য পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে ঋণের অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি থাকলেও আমাদের মূল চিন্তার বিষয় হলো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানি আয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের ক্ষমতা যদি না বাড়ে, তবে এই ঋণ সাধারণ মানুষের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চলছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য টিকে থাকা এবং উন্নতি করা বেশ কঠিন। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য একটি আবেদন করা হয়েছে, তবে সেপ্টেম্বর মাসের পর তার ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে । অনেকেই আশঙ্কা করছেন, অন্য দেশগুলোর উদাহরণ ও বিভিন্ন যুক্তির কারণে এই আবেদন গৃহীত নাও হতে পারে । স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও তা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
