#নির্বাচনী ইশেতহারে প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিলো পদ্মা ব্যারেজ
#ফারাক্কার সংকট থেকে মুক্তি পাবে দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ
#কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন
নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, নদী ভাঙন রোধ, পানি সংরক্ষণ, কৃষি জমিতে লবণাক্ততা কমানো, বন্যায় সুরক্ষা নিশ্চিকরণ এবং খনন কর্মসূচী বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এসব কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিলো নির্বাচনী ইশতেহারে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার গঠনের প্রায় তিন মাস পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আগামী বুধবার (১৩) মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফারাক্কার সংকট থেকে সরাসরি উপকার পাবেন দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ। এছাড়া কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন তারা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে ব্যয় করা হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যার পুরো অর্থ যোগান দেবে সরকার (জিওবি)। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত। সাত বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটি দেশের খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী এবং বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলায় বাস্তবায়িত হবে।
জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নদী সিস্টেম হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী পুনরুজ্জীবিত করা হবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (সাতক্ষীরা, খলনা ও বাগেরহাট জেলায় লবণাক্ততা কমানো, স্বাদু পানি নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ করা হবে। পদ্মা নির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও আর্সেনিক দূষণ হ্রাস করা করা। পাশাপাশি চলমান জিকে সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশা্হী সেচ প্রকল্পের পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মধ্য পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
উদ্যোগী সংস্থা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী সরাসরি পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক দশক ধরে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ভারত সরকার তাদের কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করায় বাংলাদেশে পদ্মার পানি প্রবাহ মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে। এর ফলে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাসিয়া, ইছামতী ও ভৈরব নদীগুলো প্রায় শুকিয়ে গেছে। এই পানি সংকটে কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ এবং নৌচলাচল ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি সুপেয় পানির অভাবের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এখন চরম হুমকির মুখে। এই সংকট মোকাবিলায় বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলাজুড়ে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পদ্মা নদীর উপযুক্ত স্থানে একটি ‘ব্যারেজ’ বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাপাউবো’র দাবি, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা, পলি অপসারণের মাধ্যমে জলাদ্ধতা হ্রাস করা এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের একনেক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট (প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার), ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক, দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু। পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গড়াই অফটেক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিস পাস, নেভিগেশন লক, গাইড বাঁধ, অ্যাপ্রোচ এমব্যাঙ্কমেন্ট ইত্যাদি করা হবে। চন্দনা অফটেক অবকাঠামোতে চারটি স্পিলওয়ে নির্মাণ হবে। হিসনা অফটেক অবকাঠামোতে পাঁচটি স্পিলওয়ে হবে। পদ্মা ব্যারাজ সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের ফলে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে।
গড়াই অফটেক সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে ৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে। গড়াই-মধুমতি নদী ড্রেজিং হবে, ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার খনন হবে। হিসনা নদী সিস্টেমে নিষ্কাশন পুনঃখনন হবে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার। এফ্ল্যাক্স বাঁধ নির্মাণ হবে ১৮০ কিলোমিটার।
এদিকে, গত ৬মে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে পদ্মা ব্যারেজের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা জানান পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছিলেন, আগামী একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটি মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে মার্চ ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি/সমন্বয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে কৃষি সংক্রান্ত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ হবে বলে উল্লেখ করেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি বলেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি সঠিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় এবং গুণগত মান রক্ষা করা হয়, তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিতে একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়, তবে একটি বড় সাফল্য প্রত্যাশা করা যায়।
তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন একটি রাস্তা তৈরির সময় যেন কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি না হয়। আমাদের এই প্রকল্পগুলোকে রক্ষা করতে হবে। অনেক সময় সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বা সক্ষমতার অভাব থাকে। বড় ব্যয়ের প্রকল্পটি যেন সঠিক মান বজায় রেখে সম্পন্ন হয়, সেটি নিশ্চিত করা এখন বড় বিষয়।
দেশের নদীগুলোর ওপর বর্তমানে সরকার যেসব বিশাল প্রকল্প গ্রহণের উৎসাহ দেখাচ্ছে, তা কেবল অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এ ধরনের প্রকল্প শেষ পর্যন্ত নদী ধ্বংসের পথকেই প্রশস্ত করবে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির।তিনি বলেন, তিস্তা বাঁধের ফলে আদতে আমাদের কতটা সফলতা এসেছে আর কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তার কোনো সঠিক বিশ্লেষণ বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। যথাযথ পর্যালোচনার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে যা উদ্বেগের বিষয়।
