ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় “প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের নতুন শর্তাবলী ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে অবিলম্বে কার্যকর করার”- দাবি সহ ৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম এক সংবাদ সম্মেলন করেছে। রবিবার সকালে মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক। এসময় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও আমানতকারী সাধারণ গ্রাহকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শুধুমাত্র একটি ব্যাংক নয়, এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আস্থা, বিশ্বাস ও নিরাপত্তার প্রতীক। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটি ২০১৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ ইসলামী ছিল দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী বেসরকারী ব্যাংক। কিন্তু ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক দখল ও লুটপাটের শিকার হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পূর্বের বিতর্কিত বোর্ড বাতিল, এস আলমের শেয়ার ফ্রিজ ( লেনদেন বা হস্তান্তর স্থগিত) এবং তারল্য সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকে আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল। ফলে ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। এতে করে ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি হয় এবং তারল্য সংকট কাটতে শুরু করে। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে হঠাৎ করেই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা শুরু হয়। এর প্রেক্ষিতে গ্রাহকদের দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ জুন সম্পূর্ণ বোর্ড বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর জহির হোসেনকে দিয়ে এক-সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড গঠন করে!
সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে এক-সদস্যের বোর্ড গঠন করা হলেও, বর্তমান প্রশাসক জহির হোসেন এককভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও ৩ মাসের বেশি সময় পার হওয়ার পরও দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ব্যাংকের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দোহায় দিয়ে তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে চলছেন।
চলতি বছরের ২৪ মে থেকে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকবৃন্দ ব্যাংকে সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তাসহ অবিলম্বে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন, প্রকৃত মালিকদের নিকট তাদের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও লুটেরাদের বিচারের দাবিতে মনববন্ধন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি পেশ, সংবাদ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেছিল। এছাড়া গত ১৭ জুন গভর্নর মহোদয়ের নিয়োগকৃত ডেপুটি গভর্নর কবির আহমদসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে আমরা ব্যাংকের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেছি এবং যত দ্রুত সম্ভব সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও ইসলামী ব্যাংকের উপযোগী একটি পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও স্বাভাবিক লেনদেনের পরিবেশ তৈরি করার দাবি জানিয়েছি।
অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক এতোদিনে শুধুমাত্র ফ্যাসিস্টের দোসর, ব্যাংক লুটকারী এস আলমের সহযোগী খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে প্রত্যাহার ও সংসদে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক কোম্পানী আইন থেকে ১৮/ক ধারা বাতিল করেছেন। সেজন্যে আমরা ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ব্যাংকের তারল্য সংকট মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু ফান্ড সরবরাহ করার ফলে গ্রাহকদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। কিন্তু ব্যাংকটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইতোপূর্বে আমরা যে ৭ দফা দাবি পেশ করেছি তার কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরে আসেনি। উল্লেখ্য ইসলামী ব্যাংকে, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও সমস্যা নিরসনের জন্য ব্যাংকসমূহের মালিকদের সংগঠন বিএবি (বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস) ও ব্যাংক সমূহের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন ‘‘এবিবি (এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ) প্রকৃত মালিকদের নিকট তাদের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে ইসলামী ব্যাংককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে যোগ্য, অভিজ্ঞ পুরাতন মালিকদের আবার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। তারা আরো বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকিং সংকট নিরসন না হলে, তা ব্যাংকিং সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অধ্যাপক নুর নবী মানিক আরও বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় নতুন এক নির্দেশনা জারি করেছে। প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের নতুন শর্তাবলীর আওতায় সকল ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়। এটি দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস, আবেগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। আমরা সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা রক্ষায় অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনভাবেই আমরা পিছপা হবো না। আমরা খুবই আশ্চর্য হই, দীর্ঘ ৪ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ গ্রাহকগণ যখন তাদের আমানতের সুরক্ষার জন্য আন্দোলন করে তখন সেখানে তারা রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করে। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়। গভর্নর মহোদয় প্রায়ই বলেন ব্যাংকিং কোম্পানি আইন তারা অনুসরণ করে ব্যাংক পরিচালনা করছেন, তাহলে কিভাবে এস আলম এককভাবে ১০% এর পরিবর্তে ৮২% শেয়ার মালিক হলো প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন ৭ দফা দাবি পূরণের মাধ্যমেই ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে – আগামীকাল সোমবার ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের অভিমুখে মিছিল। মঙ্গলবার ঢাকা ব্যতিত সকল জেলা সদর ও মহানগরীর ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনে অবস্থান কর্মসূচি এবং বৃহস্পতিবার দেশের সকল উপজেলা শাখার সামনে গ্রাহকদের অবস্থান কর্মসূচি। এরপরও যদি দাবি মানা না হয়, তাহলে গ্রাহফোরাম ঢাকায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের মহাসমাবেশ করে দাবি আদায়ে বাধ্য করবে বলে হুশিয়ারি প্রদান করে।
উল্লেখ, ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের উত্থাপিত ৭ দফা দাবি হচ্ছে –
১. পরিচালক পর্ষদ গঠন: অবিলম্বে অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালক পর্ষদ গঠন করতে হবে।
২. প্রকৃত মালিকানা ও শেয়ার বাজেয়াপ্তকরণ: ২০১৭ সালে গায়ের জোরে ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করে এই ব্যাংকের যে বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সাধারণ গ্রাহক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এই ব্যাংককে পুনরায় কোনো লুটেরা বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের শিকার হতে দেওয়া যাবে না। এস আলমের অবৈধভাবে অর্জিত ৮২% শেয়ার ও পাচারকৃত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকের দায় শোধ করতে হবে এবং মূল উদ্যোক্তা/আদি মালিকদের কাছে ব্যাংকের মালিকানা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্ব: ব্যাংকের পরিচালনা বজায় রাখতে আগামী দুই বছর কোনো ঊর্ধ্বতন নির্বাহীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা যাবে না এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ নবায়ন করতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরে সক্রিয় এস আলমের চিহ্নিত দালাল ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের অবিলম্বে শনাক্ত করে ব্যাংক থেকে বহিষ্কার করতে হবে।
৫. অপপ্রচার রোধ: ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে চলমান উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপপ্রচার রোধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত: একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ব্যাংকের লুণ্ঠিত ৮২ হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করতে হবে এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থ ঋন আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যান ব্যাংকের লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারের কো উদ্যোগ নেয়নি বরং দুদক ও আদালতের মামলা দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
৭. লুটেরাদের পুনর্বাসন রোধ: আমরা লক্ষ্য করছি এস আলমকে পুনর্বাসন ও ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করার জন্য একটা বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে, যা অনতি বিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তারা সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পরিবেশের অবনতির চেষ্টা করছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ্য করছি ব্যাংকের দায়েরকৃত মামলা যথাযথ ও গুরুত্বসহ পরিচালনা না করে সিনিয়র আইনজীবি সরিয়ে জুনিয়র আইনজীবি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যিনি এসে শেয়ার ও লুটপাটের মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন।
