বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীবিকার ওপর জীবাশ্ম জ্বালানির বিরূপ প্রভাব এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে “এনার্জি টক ৫: কারেন্ট পাওয়ার এন্ড এনার্জি ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ: ওয়ে ফরওয়ার্ড” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (বিডব্লিউজিইডি), পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর সম্মিলিতি আয়োজনে ১০ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রেস ক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মোঃ নূরআলম শেখ এর সঞ্চালনায় ও এডভোকেট কুদরত ই খুদা এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি প্রশাসক, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহন করেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তরিকুল ইসলাম, উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক, মনোয়ার মোস্তফা।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু, প্রশাসক, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি স্থায়ী সমাধান নয়; তাই সোলার এনার্জি দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। সোলার খাত এগিয়ে নিতে সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় ক্ষতিকর শিল্প ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
শরীফ জামিল, সদস্য সচিব, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) “বাংলাদেশের জ্বালানি খাত: জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা ও আমদানি নির্ভরতার সংকট” বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ২০১০ সাল থেকে জ্বালানি পরিকল্পনায় আমরা যদি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতাম, তাহলে আজকের এই দুর্বিপাকে পড়তে হতো না। জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার শুধু বর্তমানের জন্য নয়—এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের ওপর পড়ে। তাই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার এবং নিজেদের সংকট সম্পর্কে সচেতন হয়ে আন্তরিকভাবে ভূমিকা রাখা।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী , পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় “জীবাশ্ম জ্বালানির বিরূপ প্রভাব: পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান সংকট” নিয়ে বলেন, কয়লার সিসা, ক্যাডমিয়ামসহ ভারী ধাতু স্বাস্থ্য, বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ঝুঁকি তৈরি করছে এবং অটিজমসহ মানসিক বিকাশগত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাড়তি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও মানুষের কর্মক্ষমতা ও জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে তিনি পরিবার পর্যায়ে সৌরশক্তি ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
হাসান মেহেদী, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) ও সদস্য সচিব, বিডব্লিউজিইডি “বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ” বিষয়ে বলেন, দেশে ২৯,৫৯৩ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার বিপরীতে সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়েছে ১৭,২০১ মেগাওয়াট; প্রায় ১২,০০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অব্যবহৃত। বিদ্যুৎ খাতে বছরে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রেক্ষাপটে তিনি এলএনজি ও কয়লা আমদানির বদলে দেশের নিজস্ব সূর্য ও বাতাসকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। ২০৩০–২০৫০ সালের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও বাজেটের মাধ্যমে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মনোয়ার মোস্তফা, উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক বিশেষ অতিথি হিসেবে বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে অতএব আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনা সভার শুরুতে উদ্বোধনী পর্বের পর তিনটি পৃথক অধিবেশনে জ্বালানি খাতের বর্তমান বাস্তবতা, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা ও আমদানি নির্ভরতার প্রভাব এবং বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা ও সনদ বিতরণের মাধ্যমে সভা সমাপ্ত হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে আরও টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও ন্যায়সঙ্গত পথে এগিয়ে নিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
