১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পরাজয়ের পর যুগোস্লাভিয়ার নামে নতুন এক রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যদিও দেশটির নামকরণ হয় ১৯২৯ সালে। যার অর্থ দক্ষিণ স্লাভিয়া বা দক্ষিণে স্লাভিক জাতির দেশ।
সেই যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল বসনিয়া। যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক মহান মুসলিম নেতা, যিনি ইউরোপে মুসলিম আইডেন্টিটি রক্ষার লড়াই করেছেন জীবনভর এবং তার দূরদর্শী চিন্তা আর কর্মের কারণেই আজ ইউরোপের বুকে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা নামে একটি মুসলিম রাষ্ট্র টিকে আছে। যদিও এই টিকে থাকার জন্য বহু মানুষের জীবন দিতে হয়েছে। বসনিয়ার সেই নেতার নাম আলিয়া ইজেতবেগোভিচ।
.
বসনিয়া এক সময় ছিল ইউরোপে উসমানী সাম্রাজ্যের শেষ সীমানা। প্রায় ৪০০ বছর ধরে বসনিয়া উসমানী সাম্রাজ্যের প্রদেশ। এরপর ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির শাসনে এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্ট যুগোস্লাভিয়ার অংশ হয়।
যুগোস্লাভিয়ার লোকজনের এথনিসিটি মূলত স্লাভিক বা স্লাভ। কিন্তু তারা বিভক্ত হয়ে পড়েন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। পূর্বের সার্বিয়ানরা অর্থোডক্সে বিশ্বাসী আর পশ্চিমের ক্রোয়েশিয়ানরা ক্যাথলিকে। আর মাঝখানে ছিল বসনিয়াক মুসলিমরা। বসনিয়াক মুসলিমরা মূলত উসমানীদের হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেন। অ*স্ত্রের জোরে নয়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।
এই তিন বিশ্বাসের লোকজনের এথনিসিটি, ভাষা, চেহারা সবই এক ছিল। কিন্তু তারা আলাদা হয়ে পড়েন শুধুমাত্র নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে যুগোস্লাভিয়ায় ধর্মের উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। মার্শাল টিটো টানা ৪০ বছর ধরে কঠোরভাবে যুগোস্লাভিয়া শাসন করেন এবং পতনের আগ পর্যন্ত দেশটিতে ধর্মের উপর কড়াকড়ি ছিল। তবে আলবেনিয়ার মতো ছিল না।
আলবেনিয়াতে যেমন ধার্মিক মানুষদের জেলে ভরে রাখা হতো, সেখানে যুগোস্লাভিয়াতে নেমে আসতো নীরব সাজা। যারা মসজিদে নামাজ পড়তেন, তারা কোনো চাকরি-বাকরি পেতেন না। তরুণীদের হিজাব পরিধানে কড়াকড়ি ছিল। এছাড়া বসনিয়ার অসংখ্য শরীয়াহ আদালত, মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
ফলে কমিউনিজমের ভূত যখন বসনিয়ার মুসলিমদের আইডেন্টি মুছে ফেলছিল, ঠিক সেই সময়ে আলিয়া ইজেতবেগোভিচের মতো এক নেতা তৈরি হচ্ছিলেন। যার লড়াইই ছিল তার ধর্মীয় পরিচয়কে টিকিয়ে রাখা।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে আলিয়া ‘ইয়ং মুসলিম পার্টি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তাদের লক্ষ্য রাজনীতি ছিল না, বরং মুসলিম তরুণদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া এবং দাতব্য কাজ করা। কিন্তু কমিউনিস্ট সরকার এই সংগঠনকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। যার ফলে আলিয়া ইজেতবেগোভিচকে জেলে যেতে হয়।
পরবর্তীতে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ তার এই সাজাকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাকে জেলে পাঠিয়ে তার জীবনরক্ষা করেছিলেন। কারণ জেলে না গেলে তাকেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে হতো, যেখানে তার এলাকার অনেক পরিচিতদের মতো মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা ছিল।
ইজেতবেগোভিচ পরবর্তীতে জেল থেকে বের হয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন এবং একটি ল ফার্মে চাকরি নেন। কিন্তু তার চিন্তা জুড়ে ছিল কীভাবে তিনি নিজের এবং তার দেশের মুসলিমদের পরিচয়কে রক্ষা করবেন। কারণ কমিউনিস্ট শাসক মুসলিম পরিচয়কে মুছে ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
যার ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৭০ সালে, ইজেতবেগোভিচ “ইসলামিক ঘোষণা” শিরোনামে ৪০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি তুলে ধরেন তিনি এবং বসনিয়াক মুসলিমরা তাদের আত্মপরিচয় ও তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। তারা এমন এক যুগোস্লাভিয়া গঠন করতে চান যেখানে এই পরিচয় সংরক্ষিত থাকবে এবং সকলে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চা করতে পারবেন।
এই বই প্রকাশের পর ১৯৮৩ সালে তাকে আবার আটক করা হয় এবং ১৪ বছর জেলবন্দী করে রাখা হয়। জেলের মধ্যে তাকে টানা রোদের ভেতর মাথায় পাথর দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো, যাতে তার মনোবল ভেঙে যায়। কিন্তু এসব করেও তার মনোবল ভাঙা যায়নি।
বরং তিনি বিচার চলাকালে কোর্টে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বিচারককে বলেন, আমি নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে গর্ব করা ছাড়া আর কিছুই করিনি। আমি একজন মুসলিম এবং স্লাভ। আমি তোমাদের জাতিগোষ্ঠীরই একজন। তুমি কীভাবে আমাকে অস্বীকার করতে পারো? আমি কোনো বেআইনি কাজ করছি না, কিন্তু তুমি আমাকে হুমকি হিসেবে দেখছো এবং যা কিছু অবৈধ মনে করছো তা সবই তোমার কল্পনা।
জেলে বসেই তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘Islam Between East & West’ লিখেছিলেন। ২১ বছর বয়সে প্রথম কারাবন্দী হওয়ার আগে থেকে লেখা শুরু করেছিলেন।
জেলে নিজের লোকের মাধ্যমে পাচার করা কাগজে তিনি লেখালেখি করতেন। পরে সেসব বাইরে পাচার করে দিতেন। ১৯৮৪ সালে আমেরিকায় তার এই বিখ্যাত বইটি প্রকাশ হয় এবং বেস্ট সেলার হয়।
ইজেতবেগোভিচ নিজেকে একজন “ইউরোপীয় মুসলিম” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা দুটি বিশ্বকে বিভক্তকারী বিশাল সীমান্তে অবস্থিত একটি আদর্শ দেশ। আমাদের ধর্ম প্রাচ্য থেকে এসেছে, এবং আমাদের শিক্ষা ইউরোপ থেকে। আমাদের হৃদয় এক বিশ্বের, আমাদের মন অন্য বিশ্বের। এর মধ্যেই এক ধরনের ক্ষমা ও উদারতা নিহিত আছে। আমরা যদি সৎ মানুষ হই, তবে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে বসনীয়রা প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করে তারা কারা এবং তারা কোন বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত। সেই প্রশ্নের আমার উত্তর হলো: আমি একজন ইউরোপীয় মুসলিম। এবং আমি এই সংজ্ঞায় সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট।”
ইজেতবেগোভিচকে দুর্বল করার জন্য তার মেয়ের মাধ্যমে তাকে প্রস্তাব পাঠানো হয় তিনি যদি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান তাহলে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। জবাবে তিনি বলেন, আমি কীসের জন্য ক্ষমা চাইব? আমি কোনো ভুল করিনি। আমি একজন মুসলিম, আমি একজন গর্বিত স্লাভ মুসলিম পরিচয়ের জন্য ক্ষমা চাইব?
তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করায় তাকে আরো কয়েক বছর জেলে কাটাতে হয়। কিন্তু তার সেই বই প্রকাশের পর জনমতের চাপে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। ১৯৮৯ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। পরের বছর মার্শাল টিটো মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে যুগোস্লাভিয়ার পতন শুরু হয়।
আলিয়া ইজেতবেগোভিচ ১৯৯০ সালে পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন’ (এসডিএ) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট। সেটা হলো বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করা এবং রাজনৈতিকভাবে সমন্বয় সাধন করা, কিন্তু একই সাথে এটি সমগ্র যুগোস্লাভিয়া জুড়ে সকল মুসলিমের দল হওয়ারও আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত – অর্থাৎ, সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো, কসোভো এবং ম্যাসিডোনিয়ার মুসলিমদেরও।
১৯৯০ সালের নভেম্বরে এসডিএ নির্বাচনে বিজয় অর্জন করে। এবং আলিয়া ইজেতবেগোভিচ দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সার্বিয়া আর বসনিয়া তখনও একসাথে। ক্রোয়েশিয়া আর স্লোভেনিয়া নামে দুটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হওয়ায় বসনিয়াও সেই পথে হাঁটে। আলিয়া ইজেতবেগোভিচ এমন যুগোস্লাভিয়া কিংবা বসনিয়া চাননি যেখানে ক্রোয়েশিয়া আর স্লোভেনিয়া থাকবে না। কারণ সেটি হবে বৃহত্তর সার্বিয়া। সে কারণ তারা স্বাধীনতার ঘোষণা করে এবং স্বাধীনতার পক্ষে গণভোটের আয়োজন করে। সার্বিয়া সেই গণভোট প্রত্যাখান করে এবং শুরু হয় বসনিয়া যুদ্ধ।
যুদ্ধ বললে অবশ্য ভুল হবে। কারণ এটি ছিল একটি গ ণ হ ত্যা। যুগোস্লাভিয়ার রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সামরিক কর্মকর্তা, সবখানে সার্বদের আধিপত্য ছিল। মূলত ইজেতবেগোভিচ যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখনই তাকে মেনে নেয়নি দেশটির আর্মি। কারণ তারা কোনো মুসলিম নেতার অধীনে যেতে ইচ্ছুক ছিল।
সেই সময় যুগোস্লাভিয়ার সেনাবাহিনী ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ সেনাবাহিনী। আর সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল সার্বদের হাতে। ফলে সার্বরা যখন বসনিয়ার মুসলিমদের উপর হামলা শুরু করে তখন সেটা কোনো যুদ্ধ ছিল না, বরং সেটা ছিল গ ণ হ ত্যা। ফলে বসনিয়া গ ণ হ ত্যার ছবিগুলো যদি দেখেন তাহলে দেখবেন বসনিয়ার মুসলিমরা লড়াই করছে সাধারণ পোশাকে, সাধারণ অস্ত্র দিয়ে। বিপরীতে সার্বরা লড়াই করছে একটি সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে।
আলিয়া ইজেতবেগোভিচ এই গ ণ হ ত্যা বন্ধ করার জন্য বিশ্বনেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন হয় আপনারা হস্তক্ষেপ করুন অথবা আমাদের অস্ত্র দিন। কিন্তু জাতিসংঘ ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা ছিল লজ্জাজনক। তারা হস্তক্ষেপও করেনি, বরং উল্টো সেখানে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে নিরস্ত্র বসনিয়াক মুসলিমরা সার্বদের হাতে গ ণ হ ত্যার শিকার হয়।
এর মধ্যে সেব্রেনিকা গ ণ হ ত্যা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এটি ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ এরিয়া। কিন্তু সার্বিয়ান বাহিনী সেটি দখল করে ভয়াবহ গ ণ হ ত্যা চালায়। সার্বরা প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী ছিল। সেই সময় এমনও হয়েছে যে প্রতিবেশী কিছুদিন আগেও কোনো বসনিয়াক মুসলিমের বাড়িতে দাওয়াত খেয়েছে, আনন্দ করেছে, তারাও সেই মুসলিম প্রতিবেশীকে হ ত্যা করতে কার্পণ্য করেনি। সেব্রেনিকায় ৪৮টি মসজিদের প্রতিটি তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, একটি ইটও অবশিষ্ট রাখেনি।
সেই সাথে টানা চার বছর তারা বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো অবরোধ করে রেখেছিল। সেখানে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাবার সবকিছুতে অবরোধ করা হয়েছিল। এরপরও সেখান থেকে পালিয়ে যাননি আলিয়া ইজেতবেগোভিচ। সেই সময় সারায়েভোতে ইতালিসহ আরো কিছু দেশ থেকে বন্দুক প্রেমীরা সপ্তাহের শেষে বিমানে চড়ে শহরের বাইরে আসতেন। যাকে বলা হতো স্নাইপার সাফারি।
সারায়েভোর বিভিন্ন অলিগলিতে নিঃশব্দে স্নাইপার দিয়ে গুলি করে হ ত্যা করা হতো। যেন বনে কেউ প শু শিকার করছে। তাদের কাছে সবচেয়ে মজার ছিল শি শু দে র হ ত্যা করা। শি শু দের হ ত্যা করার জন্য সবচেয়ে বেশি টাকা দিতে হতো, আর বৃদ্ধ মুসলিমরা ছিল ফ্রি।
১৯৯৫ সালের দিকে বসনিয়ার মুসলিমরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ঠিক সেই সময় জাতিসংঘ আর যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে, যেন বসনিয়ার মুসলমানরা সার্বদের পরাজিত করে পুরো অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করার মতো বিজয় অর্জন না করতে পারে। এবং তারা তাদের চিরাচরিত ডিভাইড অ্যান্ড রুল প্রয়োগ করে সার্বিয়া আর বসনিয়ার মধ্যে সীমানা টেনে দেয়।
যার ফলে বসনিয়া ছোট এক দেশে পরিণত হয়। তবে বসনিয়াক মুসলিমরা নিজেদের পরিচয় সমুন্নত রেখেছে। যা সম্ভব হয়েছে আলিয়া ইজেতবেগোভিচের মতো এক মহান নেতার কারণে। যিনি জেলে টানা ১৪ ঘণ্টাও মাথায় পাথর বহন করেছেন, সেখান থেকে তিনি স্বাধীন দেশের রাজা হয়েছিলেন।
Zahid Hasan Mithu ভাইয়ের ফেসবুক ওয়াল থেকে
