নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্রিকেট, জুয়া আর বাইজি নাচ একাকার

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬ ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, ভারতবর্ষে এটি ধর্ম! আর এই ধর্মকে ঘিরে এখন জুয়া আর বাইজি নাচের যে অশ্লীল মেলবন্ধন ঘটেছে ভারতে, তা ক্রীড়াজগতের জন্য এক কালো অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ম্যাচ ফিক্সিং থেকে অনলাইন বেটিং, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মনোরঞ্জনের পুরনো সংস্কৃতি বাইজি নাচ; সব মিলিয়ে ক্রিকেট আজ এক সঙ্কটের মুখে।

স্মৃতির সরণিতে বাইজি সংস্কৃতি

‘বাইজি’ শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘বাই’ থেকে, যার সঙ্গে সম্মানসূচক ‘জি’ যোগ হয়ে ‘বাইজি’। অতীতে উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের রাজদরবারে ধ্রুপদী নৃত্য-গীতে পারদর্শী এই শিল্পীরা পেশাদার নর্তকী ও গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন । মুঘল আমল থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে লখনউয়ের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের নির্বাসিত জীবন ঘিরে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ, চিৎপুর, বউবাজার অঞ্চলে জমে উঠত বাইজিদের ‘মুজরা’ বা মেহফিল।

নিকি বাইজি, হীরা বুলবুল, গওহর জান, সিদ্ধেশ্বরী থেকে শুরু করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নার্গিসের মা জদ্দনবাই। এঁরা ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী । স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ থেকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাইজিদের গানে মুগ্ধ হয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথ তো কাশী থেকে আসা সরস্বতী বাইজির মাত্র দুটি গানের জন্য এক রাতে ৩০০ টাকা দিতে দ্বিধা করেননি, যা সে যুগে বিরাট অঙ্কের টাকা ছিল।

কিন্তু সেই বাইজি সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিকও ছিল। ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় উঠে এসেছে “বাড়ি বাড়ি বা বাঈ ভেডুয়া নাচায় বাঈ, মনোগত রাগ সুর ধরে, মৃদু তান ছেড়ে গান, বিবিজান নেচে যান, বাবুদের লবেজান কোরে” । বাবুদের আমোদ-প্রমোদের বাহন হয়ে উঠেছিল এই শিল্প। আজ ঠিক সেই চিত্রই ফিরে এসেছে ক্রিকেটাঙ্গনে, তবে পর্দার আড়ালে।

ক্রিকেটের মাঠে জুয়ার ছায়া

২০০০ সালের এপ্রিল। ভারত সফরে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হ্যানসি ক্রনিয়ে পুলিশের জালে ধরা পড়েন বুকমেকারদের সঙ্গে ফোনালাপে। তিনি স্বীকার করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচ হেরেছেন এবং ভারতের তৎকালীন অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন তাঁকে বুকমেকারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে একের পর এক ফিক্সিং কেলেঙ্কারি আঘাত হেনেছে ভারতীয় ক্রিকেটে।

২০১৩ সালে আইপিএলে স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। রাজস্থান রয়্যালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের জুয়া ও স্পট ফিক্সিংয়ে জড়ানোর প্রমাণ মেলে। এস. শ্রীশান্ত-সহ একাধিক খেলোয়াড় নিষিদ্ধ হন এবং দুই দলকেই দুই বছরের জন্য আইপিএল থেকে নিষিদ্ধ করা হয় ।

পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ, সালমান বাট লর্ডস টেস্টে ইচ্ছাকৃত নো বল করার ঘটনায় আজীবনের কলঙ্ক বহন করছেন । বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলও বিপিএলে ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন ।

অনলাইন জুয়ার বিষবাষ্প

বর্তমানে ফ্যান্টাসি স্পোর্টস অ্যাপ ও অনলাইন বেটিং ক্রিকেটের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে খেলা আর জুয়ার সীমারেখা মুছে যাচ্ছে। ‘ড্রিম ইলেভেন’, ‘মাই ইলেভেন সার্কেল’-এর মতো ফ্যান্টাসি অ্যাপ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও আইপিএলের প্রধান স্পনসর হয়ে বসেছিল।

২০২৩ সালে ‘বাইজুস’-এর সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পর ড্রিম ইলেভেন ভারতীয় দলের প্রধান স্পনসর হয় ৩৫৮ কোটি টাকায়। আইপিএলের প্রধান স্পনসর মাই ইলেভেন সার্কেলের সঙ্গে চুক্তি ছিল ৬২৫ কোটি টাকার । অর্থাৎ শুধু এই দুই স্পনসরশিপ চুক্তি থেকেই বিসিসিআই পেত প্রায় ৯৮৩ কোটি টাকা।

কিন্তু সম্প্রতি ভারত সরকার অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করে কঠোর আইন পাস করেছে। ‘প্রমোশন অ্যান্ড রেগুলেশন অব অনলাইন গেমিং বিল’-এ অনলাইন জুয়া অফার, প্রচার ও অর্থায়নকে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনে জড়িতদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে ক্রিকেট বোর্ডের রাজস্বের বিরাট অংশ হুমকির মুখে ।

বাইজি সংস্কৃতি আর জুয়ার মিলন

আশ্চর্যের বিষয়, বাইজি সংস্কৃতির সঙ্গে ক্রিকেট-জুয়ার যোগসূত্র আজও অটুট। একসময় বাবুরা বাইজিদের পেছনে লক্ষ লক্ষ টাকা উড়িয়ে দিতেন সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায়। আজ ক্রিকেটের বুকমেকার ও ফিক্সাররা একইভাবে অর্থের বিনিময়ে খেলোয়াড়দের কেনাবেচা করে চলেছেন।

সম্প্রতি মহাদেব বেটিং অ্যাপ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোন জান্নাতুল হাসানের নাম উঠে এসেছে তদন্তে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ১১উইকেট.কম নামে বাংলাদেশের একটি বেটিং অ্যাপে বিনিয়োগ করেছেন তিনি । সাকিব নিজেও ২০১৯ সালে জুয়াড়ির প্রস্তাব গোপন করার দায়ে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন ।

শঙ্কার কালো মেঘ

বিসিসিআই সম্প্রতি ম্যাচ ফিক্সিংকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়েছে, “ক্রিকেটে দুর্নীতির বিস্তার খেলাটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সততা ও ন্যায্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। যদি জনগণ প্রতিযোগিতার সততার ওপর থেকে বিশ্বাস হারায়, তাহলে ক্রিকেটের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে” ।

শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যে ম্যাচ ফিক্সিং দমনে আইন পাস করেছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ কোটি রুপি জরিমানার বিধান রয়েছে ।

ক্রিকেট, জুয়া আর বাইজি নাচ তিনটি ভিন্ন ধারার এই বিষয়বস্তু আজ একাকার হয়ে গেছে অর্থের বিষবাষ্পে। একসময় বাইজি শিল্পীরা ছিলেন সম্মানিত শিল্পী, কিন্তু বাবু কালচারে তারা পরিণত হয়েছিলেন আমোদ-প্রমোদের পণ্যে। ঠিক তেমনি ক্রিকেট আজ শুদ্ধ খেলার জায়গা থেকে সরে এসে পরিণত হয়েছে বুকমেকার ও ফিক্সারদের হাতিয়ারে।

ঈশ্বরগুপ্তের সেই কবিতার ভাষায় বলা যায় “বাবুদের লবেজান কোরে”। আজ বাবু নয়, বুকমেকারদের লবেজান করছে ক্রিকেট। প্রশ্ন একটাই এই বিষবাষ্প থেকে ক্রিকেটকে বাঁচাতে আমরা কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নিতে পেরেছি? নাকি জুয়া আর বাইজি সংস্কৃতির খপ্পরে পড়ে ক্রিকেটও কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে এক দিন?