নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রজব গাজীর ঘরে ফেরা

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬ ৬:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

টি এস হিজলী

“কখন ফিরবে, বাবা?” সকালে বাড়ি থেকে বাজারে যাবার সময় তার ছোট্ট মেয়েটার প্রতিদিনের প্রশ্ন এটি। “তাড়াতাড়িই ফিরবো, মা” রজব গাজীর এই উত্তরটাও প্রতিদিনের। “আজ তোমার জন্য কী আনবো, মা?” অন্য সব দিন মেয়ে কিছু না কিছু আনতে বলে; জেলিবন, আঙ্গুর, মোগলাই, রঙ্গীন কাগজ, মেহেদি – একেকদিন একেকটা জিনিস। কিন্তু আজ সে তার মায়ের শিখিয়ে দেওয়া কথা বললো, “আমার জন্য তুমি তোমাকেই নিয়ে এসো, তাড়াতাড়ি এসো।” কথাটা আজ মায়ের শিখিয়ে দেওয়া বটে, তবে এটা ছোট্ট মেয়েটার যে প্রতিদিনেরই প্রাণের চাওয়া। রজব গাজী মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু দিলো, দীর্ঘ নিঃশ্বাসে মেয়ের গায়ের গন্ধ নিলো। মেয়েও বাবাকে আদর করে চুমু দিলো অনেকগুলো। রজব গাজীর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী আর সুখী মানুষ মনে হলো। একবার মনে হলো, আজ সারাদিন বাড়িতেই থেকে যায়। কিন্তু অনেক রোগী আসবে তার গাজী হোমিও হলে, তাকে না পেয়ে মন খারাপ করে চলে যাবে – এ কথা মনে হতেই রজব গাজী আর দেরি করল না। রাস্তায় বের হয়ে একটা অটোরিকশায় চাপলো বাজারের উদ্দেশ্যে। রজব গাজী সেই অর্থে কোনো চিকিৎসক নন। তিনি কোরআনের হাফেজ। ডিগ্রি নিয়েছেন মাদ্রাসা থেকেও। কিন্তু তিনি অন্যান্য মৌলভীদের মত ওয়াজ করে আয় রোজগার করেন না। অসাধারণ কণ্ঠ তার, কেউ কেউ বলে “মধুঝরা কণ্ঠ”। এর জন্য রোজার মাসে খতম তারাবি পড়ানোর জন্য অনেক বড় বড় মসজিদ থেকে প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু সে কখনোই তাতে রাজি হয়নি। তবে কথা সে ঠিকই বলে- ধর্ম নিয়ে, নৈতিকতা নিয়ে, ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে। দেশ দুনিয়ার কথা তার মুখে যেমন থাকে, তেমনি থাকে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার কথা। রজব গাজী কথা বলে তার হোমিও হলে যারা আসে তাদের সাথে কিংবা ঘরোয়া কোনো বৈঠকে।
তার কাছে যারা আসে তারা সবাইতো আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নেবার জন্য আসে না, তার কথা শুনতেও আসে অনেকে। রজব গাজীর মুখের কথা শোনাতেও আনন্দ। আর গাজীও মানুষের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলে, তাদের কথা শুনে লাভ করে মানসিক প্রশান্তি। তবে এরই মাঝে চলে তার ডাক্তারি চিকিৎসা। হোমিওপ্যাথি কলেজ থেকে ডিগ্রিও নিয়েছে সে। তবে সে মানুষকে ঔষধের চিকিৎসা যতটা না দেয়, তারচেয়ে অনেক বেশি দেয় পরামর্শ। রোগীর সমস্যা মন দিয়ে শুনবে, পরিবারের খোঁজ নেবে, আরো নেবে হাঁড়ির খোঁজ। সবার আগে তার পরামর্শ খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে। তার কথা, মানুষের বেশিরভাগ রোগের জন্য দায়ী খাদ্যাভ্যাস। অসুখ বিসুখে না পড়ার জন্য তার চার উপদেশ – ক্ষুধা না লাগলে না খাওয়া, ক্ষুধা রেখেই খাবার শেষ করা, খাদ্য উত্তমরূপে চিবিয়ে খাওয়া, আর নিয়মিত শরীর ও মনের ব্যায়াম করা। কায়িক পরিশ্রম শরীরের শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম, আর রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর থেকে অন্যের ভালো কামনা করা হলো মনের ব্যায়াম।

আজকেও তার হোমিও হলে অনেক মানুষ। সুস্থ এবং অসুস্থ মানুষ। তাদের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিলো আগের মতোই। কিন্তু আজ কেন জানি একটু বেশি বেশি তাকাচ্ছে সে ঘড়ির দিকে। দুপুরে বাড়ি থেকে আনা শুকনো রুটি দুটো খাওয়ার পর থেকে সময় কেন যেন কাটছিলোই না। একবার মনে হলো চলে যায় আজ একটু আগেভাগেই। কিন্তু বিকেল বেলা থেকেই মানুষের সমাগম বেশি বাড়তে থাকে। আজ যেন আসছে আরো একটু বেশি। রোগী দেখা শেষ হতেই সূর্যাস্তের পর গেল আরো ঘণ্টা দেড়েক। যারা কেবল তার সঙ্গে কথা বলার টানে এসেছেন তাদেরকে আজ আর সময় দিলো না সে। ছোট মেয়ের জন্য আজ আরো একটু আগেই বাড়ি ফেরার তাগিদ ছিল তার। ফেরার পথে চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট হেঁটে বাড়ি ফেরেন। বাজার পেরিয়ে কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হলো বাড়ির জন্য, মেয়ের জন্য কিছুই নেওয়া হয়নি আজ। ফিরে এসে আজ আর কোনো খাদ্যবস্তু কিনলো না সে; মেয়ের পছন্দের টিউব মেহেদি কিনলো আর কিনলো কিছু রজনীগন্ধা। রাস্তাটা চলেছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। রজব গাজী শেষ ফাল্গুনের সন্ধ্যায় হেঁটে চলেছে সেই পথ ধরে। পেছনে প্রায় পূর্ণ চাঁদ। হয়তো আগামীকালই পূর্ণিমা। এই রাস্তাটায় সন্ধ্যায় হাঁটতে তার বড় বেশি ভালো লাগে মূলত পাশ দিয়ে মাঝে মধ্যে থাকা হাসনাহেনার জন্য। তার হাতে থাকে রজনীগন্ধার সুবাসও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে হাসনাহেনার অস্তিত্ব ভোলানো গন্ধের কাছে। পথটার দুপাশ দিয়ে কৃষ্ণচূড়া, কদম, সোনালু, মেহগনি, নিম আর আম-কাঁঠালেরা বেড়ে উঠেছে যেন রজব গাজীর পছন্দেই। কেউ কেউ জানে যে এতে রজব গাজীর বিনিয়োগও রয়েছে কম না। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এরা তাকে মোহিত করে তাদের রূপ ও গন্ধে। আম্রমুকুলের ঘ্রাণ ছিল কদিন আগেও। কাঁঠাল মুচির যে এত মিষ্টি সুগন্ধ হয় কজন তা উপভোগ করতে পারে! এইতো আর কিছুদিন পর মেহগনির ফুল আসবে রাশি রাশি। তাদের সুবাসটাই বা কজন বুঝতে পারে! কৃষ্ণচূড়া সাজবে মাস দেড়েক পরেই। তারপর আসবে কদমের পালা। বর্ষার প্রথম কদম ফুল হাতে নিয়ে রজব গাজী তো খুঁজতে থাকেন মহাবিশ্বের সকল রহস্যের বিষ্ময়। সেই ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকা তার তো শেষই হতে চায় না। আর এই যে নিমগাছগুলি! এদের পাতাগুলিই তাদের হৃদয় হরণ করার জন্য যথেষ্ট যাদের দেখার দৃষ্টি আছে।

রজব গাজী হাঁটছে। পথটা আজ বেশ লম্বা আর রহস্যময় লাগছে যেন। হঠাৎ তার নিজের ছায়ার দিকে দৃষ্টি গেল। বিশাল ছায়া। রাস্তায় বিজলী বাতি নেই, পেছনে চাঁদ, সামনে সুদীর্ঘ ছায়া। একবার মনে হলো চাঁদ তাকে পশ্চিমে তার গন্তব্যে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে যেন। এখন রাস্তার দুপাশের গাছগুলোর পর বিস্তৃত ভরা ধান ক্ষেত। নিজের ছায়া দেখছে আর হাঁটছে রজব গাজী। হঠাৎ তার ছায়ার সাথে যুক্ত হলো আরো কয়েকটি ছায়া। মুহূর্তেই ছায়াগুলো কায়া হয়ে এবার ঘিরে ধরলো রজব গাজীকে।
-তোমরা কী চাও?
– তোমাকে মেরে ফেলবো।
– আমার অপরাধ কী?
– জানি না।
– তাহলে মারবে কেন?
– তাও জানি না।
আর কিছু বলার সময় পেলো না গাজী। চা পাতির কোপ পড়তে থাকলো মুহুর্মুহু। পেট চিড়ে গেলো। বুকে চাকু বসলো। নাক কেটে পড়লো। চোখ উপড়ে গেলো …
প্রথম কোপটাই যা একটু ব্যথা দিতে পেরেছিল গাজীকে। তারপর আর শরীরের কোনো কষ্ট হয়নি তার। শুধু নাক কাটার সময় আর চোখ উপড়ে যাওয়ার সময় যেন সে ভীষণভাবে অনুরোধ করছিল “আমার মুখটা বিকৃত কোরোনা! তোমরা যে ধর্মেরই হও, কোনো ধর্ম মানো চাই না মানো, তোমরা মানুষ তো! মানুষ না হলেও মানুষের মতোই কারো সন্তান তো। হে আদম সন্তানেরা! আমার লাশকে তোমরা বিকৃত কোরোনা। আমার ছোট্ট মেয়েটা অন্তত যেন তার বাবার অক্ষত মুখটা দেখতে পারে…!”
কিন্তু গাজীর সেই কণ্ঠ আর এই পৃথিবীর কারো কানে কখনো পৌঁছোবে না।

গাজীর বোধগুলো কীভাবে যেন সব সজাগ তখনো। জীবন আর মৃত্যুর পার্থক্য এখনো সে বুঝতে পারছে না কিছুই। প্রিয় মুখগুলোর কথা মনে পড়ছে তার। মায়ের মুখ, বাবার মুখ, ভাইবোনদের মুখ। যে দুটো সন্তান জন্মের পরপরই মারা গেছে ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে সে। স্ত্রীর কথা মনে হতেই সবচেয়ে অসহায় একটা মুখ ভেসে উঠলো। ছোট মেয়েটার গায়ের গন্ধ ভেসে আসছে… ওকি আসছে তবে! এই মুখ ও কীভাবে দেখবে …
ভাবনা বন্ধ করতে ঘুম নামলো অন্তরের চোখটাতে। লম্বা ঘুম। পরদিন হাতুড়ির শব্দে ঘুম ভাঙলো তার। বুঝতে পারলো হাসপাতালের মর্গে তার কপাল ফেঁড়ে মগজ বের করছে দুজন মাতাল। মৃতকে কষ্ট দিতে তাদের কষ্ট হয় বলেই কী কাজটা করার আগে মাতাল হয়ে নেয় ওরা? আশ্চর্য! তার ব্রেন তো বের করে নেওয়া হয়ে গেছে! তারপরও সে ভাবতে পারছে কীভাবে? তাহলে কি ভাবতে পারার জন্য মস্তিষ্ক ছাড়া অন্যকিছু লাগে?

পরদিন তার বাড়ি থেকে যখন কাফনে জড়ানো গাজীর দেহটা খাটিয়ায় রওনা হলো তখন বেলা ডুবু ডুবু। তিন মাইল পথ পূর্বদিকে যাত্রা এবার। কবরস্থান তার দোকান যে বাজারে সেই বাজারের কাছেই। খাটিয়ায় চড়ে গাজী এগোচ্ছে তার চিরচেনা সেই পথটি ধরেই। স্টীলের খাটিয়া। গাজীর ব্যথা লাগছিল খুব। মানুষ কেন যে কাঠের খাটিয়া বাদ দিয়ে এই স্টীলের খাটিয়ার ব্যবহার শুরু করলো এটা তার মাথায় ঢুকছে না। বিরক্তিকর! যারা বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তাদের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে সে। দেখতে পাচ্ছে তাদেরকেও যারা সাথে সাথে চলছে। সেই হুজুররাও সাথে চলছে যারা ওয়াজ করতো রসিয়ে রসিয়ে, কখনোবা কৃত্রিম কান্নার স্বরে, কখনোবা আবার শব্দদূষণকারী ধমকের স্বরে, কিন্তু যারা ইতোমধ্যে অত্র এলাকায় তাদের ওয়াজের মাঠ হারিয়েছে রজব গাজীর কারণেই। তারাও মন খারাপের ভান করে হাঁটছে। কিন্তু গাজী তাদের ভেতরে ভীষণ সন্তুষ্টির হাসি স্পষ্ট দেখতে পেলো, আর দেখতে পেলো তাদের ভেতর বিরাজমান ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিলবিল করা সাপ আর বিচ্ছুর চকচকে চোখ।

কিছু লোক হাঁটছে যাদের মাঝে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছে না রজব গাজী। ভীষণ অবাক হলো সে! এতো প্রাণহীন মানুষ হেঁটে বেড়ায় পৃথিবীতে?

পাশাপাশি চলছে আরো কিছু সাধারণ মানুষ যারা তাকে ভালোবাসতো। তাদের ভেতরটাও দেখতে পাচ্ছে গাজী, দেখছে ভেতরের ক্ষরণ। তাদের ভালোবাসা দেখে গাজীর নিজেকে বড় বেশি ভাগ্যবান মনে হলো। ভালোবাসার কান্না, ভালোবেসে কান্না এই জগতের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কাছে ভালোবেসে অশ্রুপাতের চেয়ে মূল্যবান কিছুই আর পৌঁছে না এই পৃথিবী থেকে।

মাগরিব নামাজের বিরতি দিয়ে গাজীর যাত্রা চলছে আবার। পূর্ণিমা চাঁদ পূর্ব আকাশে। দেখতে পাচ্ছে গাজী। কী করে চোখ ছাড়া দেখতে পাচ্ছে সে! দেখার জন্য তবে কী লাগে মানুষের? চাঁদ সামনে এবার, ছায়া পেছনে। সামনে কেবল আলো আর আলো। কাঁঠাল মুচির গন্ধ, হাসনাহেনার গন্ধ শেষবারের মতো নিয়ে নিচ্ছে গাজী। আচ্ছা, তার নাসারন্ধ্রও তো একেবারেই বন্ধ, ভেতরে বরফজমাট রক্তে আর বাইরে তুলোয়। তবুও কী করে গন্ধ পাচ্ছে সে? ঘ্রাণ নেবার জন্য কি তবে নাক নয়, অন্য কিছু লাগে?

এশার নামাজ শেষে রজব গাজীকে নামানো হলো ছোট্ট মাটির ঘরে। বাঁশের টুকরো সাজানো হচ্ছে উপর দিয়ে, মাটির পুরু আস্তরণ পড়বে তার উপর। আকাশের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীটা শেষবারের মতো দেখে নিতে চাইলো সে। জোছনালোকিত রাত; কিন্তু রজব গাজীর মনে হলো এই কবরের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার আজ আচ্ছন্ন করে ফেলেছে উপরের পৃথিবীটাকে।

(ছোটগল্প)

গল্পকার-সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ

বগুড়া সরকারী আজিজুল হক কলেজ