সরাসরি বক্তব্য
আজকের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম আয়োজনের জন্য আমি এলজিআরডি, ইউএনডিপি এবং ব্রিটিশ হাই কমিশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের আন্তর্জাতিক কমিউনিটির বন্ধুগণ, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং উপস্থিত সকল অংশীজনকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। আজকের এই চমৎকার আয়োজনের জন্য মিস সোনালী এবং জনাব মেহেদীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, এটি আমাদের নির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার। একই সাথে আমাদের মাঝে উপস্থিত রয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় এলজিআরডি মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান; তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাজ্ঞ, শ্রদ্ধেয় ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ।
এই সেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘ফ্রম পলিসি টু অ্যাকশন’ আমাদের নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মাত্র ছয় মাস আগে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশ আজ পরিবর্তনের পথে ধাবমান; আমাদের শহরগুলোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর আজ আমরা যে শহর গড়ে তুলব, সেটাই কিন্তু নির্ধারণ করে দেবে আগামী দিনের কেমন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই।
আমাদের শহরগুলোই মূলত জাতীয় অর্থনীতির অঅন্যতম চালিকাশক্তি। আমাদের জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে এই নগর এলাকা থেকে, যেখানে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুতগতির অনাকাঙ্ক্ষিত নগরায়ন আমাদের আবাসন, গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং জলবায়ু অভিবাসন, যা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
বড় শহর নয়, আমাদের লক্ষ্য মানবিক ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়া। এমন এক নগরব্যবস্থা, যা মানুষের জীবনে সত্যিকারের গুণগত ও দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। আমরা এমন শহর চাই, যেখানে সবার জন্য সুযোগ থাকবে, সুবিচার থাকবে এবং সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে। যেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা হবে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, পরিবেশ ও জলাশয়কে অক্ষুণ্ণ রেখে। নাগরিকরা যেখানে নিরাপদে বসবাস করবেন, আত্মমর্যাদা নিয়ে চলাফেরা করবেন এবং সব ধরনের মৌলিক সেবা ও নাগরিক অধিকার সমানভাবে উপভোগ করবেন।
নগরের টেকসই উন্নয়নকে আমরা কতগুলো বড় বড় অট্টালিকা বা কত কিলোমিটার চওড়া রাস্তা তৈরি হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করতে পারি না; বরং এই নগরায়নের ফলে কতজন মানুষের জীবনের মান সত্যি সত্যি উন্নত হলো এবং সেই পরিবর্তন কতটা অর্থবহ ও স্থায়ী হলো, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সাফল্যের আসল মাপকাঠি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নগর নীতিমালার কাঠামো শক্তিশালী করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমরা খুব স্পষ্ট করেই বিশ্বাস করি, একটি সুন্দর নীতিমালা তৈরি করাই কিন্তু শেষ কথা নয়; এটি কেবল কাজের সূচনা মাত্র। আসল পরীক্ষা হলো সেই নীতিমালার কার্যকর, বাস্তবমুখী ও টেকসই বাস্তবায়ন।
এজন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি খাত, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের মাঝে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ নগরের সমস্যাগুলো কোনো ভৌগোলিক প্রশাসনিক সীমানা মানে না, আবার তা কেবল একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্বের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। আবাসন, যোগাযোগ, ড্রেনেজ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, সবকিছু মিলেই কিন্তু একটি সামগ্রিক নাগরিক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
তাই আমাদের সমাধান প্রক্রিয়াকেও হতে হবে সমন্বিত ও বহুমুখী। নাগরিক সমস্যা সমাধানে আমরা ৩৬০ ডিগ্রি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করতে চাই। নাগরিকদের চাহিদা মেটাতে আমাদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও নিজস্ব সম্পদের পরিধি বাড়াতে হবে। আমরা এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর কাঠামো গড়ে তুলতে চাই, যা বিশেষ কোনো শ্রেণির জন্য নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী শিক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক গণপরিবহন এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সমঅধিকার নিশ্চিত করবে। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার।
একই সাথে নগর পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে জলবায়ু সহনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের ভবিষ্যৎ সংকট নয়; এটি আমাদের অবকাঠামো, জনজীবন ও জীবিকার ওপর এখনই সরাসরি আঘাত হানছে। আমাদের খাল-বিল, নদী-নালা, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ চত্বরগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ‘ন্যাচার-বেসড সল্যুশন’ বা প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা ও তীব্র তাপদাহ দূর করতে হবে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে শহরগুলোকে মানুষের বসবাসের জন্য সুস্থ ও সতেজ রাখতে হবে।
নীতিমালা প্রণয়নে অবশ্যই সেই সাধারণ নাগরিকদের কথা শুনতে হবে, যাঁরা প্রতিদিন নগরের এই বাস্তব সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে বেঁচে আছেন। তৃণমূলের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। উপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমরা যে শহর গড়তে চাই, তা হবে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, বিপুল বিনিয়োগ আসবে এবং লাখো তরুণের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। মূল শহরের সাথে আশেপাশের অঞ্চলগুলোর কানেক্টিভিটি বাড়াতে হবে, যাতে উন্নয়নের সুফল নির্দিষ্ট একটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত না থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সঠিক উন্নয়ন অংশীদারদের সাথে কার্যকর পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে নাগরিক সেবায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম মাত্র; আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনের উন্নয়ন। তাই প্রযুক্তিভিত্তিক শহর গড়ার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে সেই শহরটি যেন প্রকৃত অর্থেই ‘মানবিক’ হয়। এমন এক মানবিক শহর, যেখানে প্রতিটি মানুষ তাঁর মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবেন।
আমরা জানি, এই চ্যালেঞ্জগুলো অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অচলায়তন রাতারাতি বা একদিনে পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত সুদৃঢ় ও গভীর। বাস্তবমুখী ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো দূর করতে আমরা সকল অংশীজনকে সাথে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমাদের যে গৃহীত নীতিমালা রয়েছে, তা একটি চমৎকার সূচনা। আসুন, সবাই মিলে বিশ্বমানের সেরা চর্চাগুলোকে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতায় রূপান্তর করি এবং শহরগুলোকে আরও আধুনিক ও মানবিক করে গড়ে তুলি। এই অংশীদারিত্ব ও মতবিনিময় আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
