নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে

online
জুন ৪, ২০২৬ ২:৩৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

*** মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি
— সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত প্রভাব দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির জন্য দায়ী
— বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর থাকায় অসহায় সাধারণ ভোক্তারা
— রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দুর্বলতায় বিনিয়োগে স্থবির
— কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহবান
নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি দাম। যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে পরিবারের খরচ চালানো আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

দেশের বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির পেছনে প্রধানত জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত প্রভাবকে দায়ী করছেন তারা। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগে বেসরকারিখাতকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। সিপিডি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

এসময় দেশের অর্থনীতির উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক নানা ধাক্কার কারণে অর্থনীতি এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে জানিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূলত জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতের খরচ বৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম। ফলে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ; পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতেও পড়ে। ফলে বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশজুড়ে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও একলাফে অনেক বেড়েছে বলে জানায় সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, গত মার্চ মাসে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এই দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে জুনে এসে হয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা।

জ্বালানি খরচের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতাকেও মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর থাকার কারণে প্রায়ই খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সাধারণ ভোক্তারা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন।

দেশে জ্বালানির দাম দ্বিতীয় দফায় বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না বলে উল্লেখ করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত। তিনি বলেন, কারণ, তখন ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করেছিল। আর সাধারণ মানুষ, তথা যাঁরা কম পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে, যাঁরা বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো যেতে পারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা এখনো আস্থা ফিরে পায়নি বলে উল্লেখ করেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করেছে—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বর্তমানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা দূর হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি।

তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তবে সেই স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে এখনো পর্যাপ্ত নয়।

সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, নতুন সরকার দুই মাস ক্ষমতায় আছেন। সুতরাং তাদের আরেকটু সময় দিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন, বাজেটে কি ধরনের প্রস্তাব ও উদ্যোগের কথা উল্লেখ থাকবে। সংস্কার যেগুলো নেয়া দরকার সেগুলি সরকার কতটুকু নিচ্ছেন, কতটুকু নিচ্ছেন না সেটার জন্যও তারা অপেক্ষা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটি শ্রমিকবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলগত বিবেচনার ফল। তার মতে, বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাণিজ্যনীতি নির্ধারণ করে, যেখানে বাংলাদেশের বাস্তবতা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের চেয়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনেক বেশি শক্তিশালী বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে সরকারের উদ্যোগ যদি এক টাকা হয়, তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ সেখানে চার টাকা। ফলে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং সামনের দিকে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।