নয়াখবর
শনিবার, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেডিকেল কলোনিয়ালিজম

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১৮, ২০২৬ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বৈশ্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের উত্থান, বিস্তার ও বর্তমান বাস্তবতা

সাইফুল খান

উনিশ ও বিশ শতকের ঔপনিবেশিক বিজয়ের সাথে কেবল ভূমি বা সম্পদ দখল হয়নি। দখল হয়েছিল মানুষের শরীর, রোগ নির্ণয়ের ভাষা এবং নিরাময়ের জ্ঞান। আমরা একটু তলিয়ে দেখবো কিভাবে পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার হাজার বছরের দেশীয় চিকিৎসাবিদ্যাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে নিজেদের চিকিৎসাব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। এই আধিপত্য আজও কার্যকর। ওষুধ গবেষণা, উৎপাদন, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতির মধ্য দিয়ে। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ আজ কেবল বাজার নয়, পরীক্ষাগারও।

 

এক. দেশীয় চিকিৎসাবিদ্যা ধ্বংস

১.১ উপনিবেশের আগে যা ছিল

ঔপনিবেশিক যুগের আগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সমৃদ্ধ চিকিৎসাব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যা কয়েক হাজার বছরের পুরনো চরক পদ্ধতি ও সুশ্রুত পদ্ধতি শল্যচিকিৎসার এমন কিছু আধুনিক পদ্ধতি ছিলো যা ইউরোপে পরিচিত হতে আরও শতাব্দী লেগেছে। আফ্রিকার ভেষজ চিকিৎসকরা (Nganga এবং Sangoma) ব্যাপক জৈব-ঔষধি জ্ঞান রাখতেন। এগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছিল। চীনা চিকিৎসাবিদ্যা, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী চিকিৎসা ঐতিহ্য বিশেষত ইবনে সিনার আল-কানুন ফিত-তিব্ব এবং মেসোআমেরিকার অ্যাজটেক ও মায়া ভেষজজ্ঞান ছিল নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত অগ্রগামী ছিলো।

বিশেষত ইসলামী সভ্যতার চিকিৎসা ঐতিহ্য ছিল বিশ্বের তখনকার সবচেয়ে অগ্রসর। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় চিকিৎসাজ্ঞান একত্রিত করে এক নতুন সংশ্লেষণ তৈরি করেছিল। ইবনে সিনা, আল-রাযী ও ইবনে নাফিস যে চিকিৎসা জ্ঞান রচনা করেছিলেন, তা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

“যে জাতির চিকিৎসাজ্ঞান দখল হয়ে যায়, সেই জাতির শরীরও পরাধীন হয়ে পড়ে।”

১.২ উপনিবেশের হাতিয়ার হিসেবে চিকিৎসা

ঔপনিবেশিক অভিযানগুলো প্রথম থেকেই চিকিৎসাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় যে প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, তাতে ধীরে ধীরে দেশীয় হাকিম ও বৈদ্যদের অবজ্ঞা করা শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সরকারি সহায়তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষার দিকে সরে যায়। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়: দেশীয় চিকিৎসাজ্ঞান ‘অপ্রমাণিত’ ও ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’, পাশ্চাত্য চিকিৎসাই ‘বৈজ্ঞানিক’।
আফ্রিকার ছবিটা আরও নির্মম ছিল। বেলজিয়ান কঙ্গোতে ঔপনিবেশিক চিকিৎসক ও মিশনারিরা দেশীয় নিরাময়কারীদের (ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসক) শুধু অবৈধ নয়, বরং ‘ডাইনি’ ও ‘শয়তানের দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি ছিল ইচ্ছাকৃত। দেশীয় জ্ঞানকর্তৃত্বের ধ্বংস ছিল ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

দুই. চিকিৎসাশিক্ষার ঔপনিবেশিকীকরণ: কাঠামোর দখল

২.১ পাশ্চাত্য মেডিক্যাল শিক্ষার প্রতিষ্ঠা ও দেশীয় জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক বিলুপ্তি

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো কেবল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়, জ্ঞানের উৎপাদন ও বৈধতার উপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতে ব্রিটিশরা ১৮৩৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে দেশে মোট ছয়টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। সবই ইংরেজি ভাষায়, পাশ্চাত্য পাঠ্যক্রমে। পাশ্চাত্যশিক্ষিত চিকিৎসকরা সরকারি চাকরি পেতেন, আদালতে বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হতে পারতেন, হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি পেতেন। দেশীয় বৈদ্য বা হাকিমদের জন্য এই সব দরজাই বন্ধ ছিল।

ফিলিপাইনে আমেরিকান ঔপনিবেশিক শাসন (১৮৯৮-১৯৪৬) চিকিৎসাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিলিপাইন মেডিক্যাল স্কুল এবং ১৯০৫ সালে বোর্ড অব মেডিক্যাল এক্সামিনার্স মূলত দেশীয় আলবোলারিও ও মাধলান চিকিৎসকদের লাইসেন্সবিহীন অবৈধ করে দিয়েছে। ঔষধের ব্যবহার ও চিকিৎসা অনুশীলনের উপর কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যের হাতে চলে গেছে।

২.২ কারিকুলামের রাজনীতি

পাশ্চাত্য চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রমে তৃতীয় বিশ্বের রোগের প্যাটার্ন, স্থানীয় পরিবেশ ও দেশীয় ভেষজ উপকরণ কখনো যথাযথ স্থান পায়নি। একজন বাংলাদেশি মেডিক্যাল শিক্ষার্থী আজও মূলত পাশ্চাত্য রেফারেন্স বই পড়েন, পাশ্চাত্য রোগের কেস স্টাডি শেখেন এবং পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় করতে শেখেন। স্থানীয় প্রেক্ষাপট গৌণ। এই ঘটনাটিকে চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানীরা ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ বা জ্ঞান-হিংসা বলে চিহ্নিত করেছেন। যেখানে কেবল পাশ্চাত্য জ্ঞানব্যবস্থাকেই ‘সত্যিকারের বিজ্ঞান’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং অন্যান্য জ্ঞানকাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মুছে ফেলা হয়।
তথ্যসূত্র: Mignolo, W. (2000). Local Histories/Global Designs: Coloniality, Subaltern Knowledges, and Border Thinking. Princeton University Press.

তিন. ওষুধ শিল্পের ঔপনিবেশিক কাঠামো

৩.১ ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের উদ্ভব ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন

বিশ শতকের শুরুতে আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের উদ্ভব হয় মূলত জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে। বায়ার, হফম্যান-লা রোশ, এলি লিলি এই কোম্পানিগুলো শুরু থেকেই রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও ঔপনিবেশিক বাজারের সুবিধা ভোগ করেছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসনগুলো তাদের অধীন অঞ্চলগুলোকে কেবল ওষুধের বাজার নয়, কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবেও ব্যবহার করেছে।
আজকের বিশ্বের চিত্র দেখলে পরিষ্কার হয়: বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল বাজার ২০২৩ সালে প্রায় ১.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দশটি বৃহৎ কোম্পানি। সবই উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের। বিশ্বের মোট ফার্মাসিউটিক্যাল রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানিগুলো। এই কোম্পানিগুলো নিজেরাই গবেষণা করে, নিজেরাই উৎপাদন করে, নিজেদের দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে অনুমোদন নেয় এবং তারপর সেই অনুমোদনকেই বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

“বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র দশটি পশ্চিমা কোম্পানি।”

৩.২ অনুমোদন প্রক্রিয়া: কে ঠিক করে কোন ওষুধ বৈধ?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের FDA (Food and Drug Administration) এবং ইউরোপের EMA (European Medicines Agency) আজ বিশ্বের ওষুধ অনুমোদনের কার্যত একচেটিয়া মানদণ্ড নির্ধারণকারী। বেশিরভাগ দেশ বাংলাদেশসহ তাদের নিজস্ব পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সত্ত্বেও মূলত FDA বা EMA অনুমোদিত ওষুধকেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। এই কাঠামোতে কোনো আফ্রিকান বা এশীয় ভেষজ উপাদান, যতই কার্যকর হোক না কেন, যতক্ষণ না পাশ্চাত্যের অনুমোদনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ ‘প্রমাণিত’ নয়।
এই প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ নয়। একটি নতুন ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়াল থেকে FDA অনুমোদন পর্যন্ত গড় সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ বছর এবং খরচ হয় প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার (Tufts Center for the Study of Drug Development, ২০১৪)। এই পরিমাণ বিনিয়োগ করার সামর্থ্য কেবল পাশ্চাত্যের বড় কোম্পানিগুলোরই আছে। ফলে ওষুধ গবেষণার এজেন্ডাটিই নির্ধারিত হয় পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক স্বার্থ দ্বারা, তৃতীয় বিশ্বের রোগের চাহিদা দ্বারা নয়।

৩.৩ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের চুরি

TRIPS চুক্তি (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights, ১৯৯৪) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর মধ্য দিয়ে ফার্মাসিউটিক্যাল পেটেন্টকে বৈশ্বিক আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। এই ব্যবস্থা মূলত উত্তরের কর্পোরেশনগুলোর পক্ষে কাজ করে। একটি নির্মম বিড়ম্বনার কথা উল্লেখ করা জরুরি: পাশ্চাত্যের বহু ওষুধ মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে নেওয়া। কিন্তু পেটেন্টের মাধ্যমে সেই জ্ঞানের মালিকানা তাদের হয়ে গেছে।

ভারতের নিম গাছের (Azadirachta indica) উদাহরণটি প্রসিদ্ধ। হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে নিমের ব্যাকটেরিয়া-বিরোধী, ছত্রাক-বিরোধী ও কীটনাশক গুণের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ১৯৯০-এর দশকে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলো নিমের বিভিন্ন যৌগের উপর পেটেন্ট নিতে শুরু করে। ভারত সরকারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অনেক পেটেন্ট বাতিল হলেও এই ঘটনা একটি প্যাটার্ন উন্মোচন করেছে। দেশীয় জ্ঞানকে ‘আবিষ্কার’ বলে দাবি করে পেটেন্ট নেওয়া।
তথ্যসূত্র: Shiva, V. (1997). Biopiracy: The Plunder of Nature and Knowledge. South End Press.

 

চার. তৃতীয় বিশ্ব: বাজার না পরীক্ষাগার?

৪.১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ভূগোল

ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল মানব পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ক্রমবর্ধমানভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সরিয়ে নিচ্ছে। কারণগুলো স্বচ্ছ: ভারত, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া বা ব্রাজিলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের খরচ পাশ্চাত্যের তুলনায় অনেক কম; নিয়ন্ত্রক তদারকি দুর্বল এবং ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের পাওয়া সহজ। কারণ দরিদ্র মানুষের কাছে সামান্য অর্থ বা বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রলোভনই যথেষ্ট।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-২০১০ সালের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত একসময় বিশ্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্য হয়ে উঠেছিল। ২০১৩ সালে ভারতের সংসদীয় কমিটি প্রকাশ করে যে ২০০৫-২০১২ সালের মধ্যে ৮০টিরও বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের মৃত্যু হয়েছে যার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা তদন্তকারীদের কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি।
“২০০৫-২০১২ সালে ভারতে ৮০টিরও বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মৃত্যুর ঘটনায় কোনো জবাবদিহি নেই।”

৪.২ ফাইজার ও নাইজেরিয়া: একটি কেস স্টাডি

১৯৯৬ সালে নাইজেরিয়ার “কানো” শহরে মেনিনজাইটিস মহামারির সময় ফাইজার কোম্পানি তাদের পরীক্ষামূলক অ্যান্টিবায়োটিক ট্রোভান (Trovan) শিশুদের উপর পরীক্ষা করে। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিভাবকদের সম্মতি ছিল না বা ছিল প্রতারণাপূর্ণ। ট্রায়ালে অন্তত ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয় এবং আরও অনেকে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্বের শিকার হয়। নাইজেরিয়ার সরকার ও আক্রান্ত পরিবারগুলো মামলা করলে ফাইজার দীর্ঘ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৯ সালে ৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণে রাজি হয়, তবে কোনো অপরাধ স্বীকার না করেই।

এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন: যেখানে নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা, দারিদ্র্যের সুযোগ নেওয়া এবং কর্পোরেট দায়মুক্তি একত্রিত হয়ে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে পরীক্ষামূলক মানব বিষয়বস্তুতে পরিণত করে।
তথ্যসূত্র: Stephens, J. (2000). Where Profits and Lives Hang in Balance. The Washington Post. December 17.

৪.৩ এইচআইভি/এইডস ওষুধ ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াই

১৯৯০-এর দশকে এইচআইভি/এইডস দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সমগ্র সাব-সাহারান আফ্রিকায় ভয়াবহ মহামারির আকার নেয়। পাশ্চাত্যে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (ARV) ওষুধ পাওয়া গেলেও সেগুলোর পেটেন্ট মূল্য এত বেশি ছিল যে আফ্রিকার জন্য তা ছিল অকল্পনীয়। প্রতি রোগীর জন্য বার্ষিক চিকিৎসার খরচ ছিল প্রায় ১০,০০০-১৫,০০০ মার্কিন ডলার। এমন একটি মহাদেশে যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক স্বাস্থ্যব্যয় কয়েক ডলার।

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার যখন ভারত ও ব্রাজিল থেকে সস্তা জেনেরিক ARV আমদানির চেষ্টা করল, তখন ৩৯টি আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মামলা করে। এই আন্তর্জাতিক চাপ এবং আন্দোলনের মুখে ২০০১ সালে মামলা প্রত্যাহার করা হলেও এই ঘটনা বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে দেয়: পেটেন্ট সুরক্ষা মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, পাশ্চাত্যের কোম্পানির কাছে।

পাঁচ. চিকিৎসার রাজনীতি: সুস্থ না করার ব্যবসা

৫.১ ক্রনিক রোগের অর্থনীতি

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের ব্যবসায়িক মডেলটি একটি গভীর বৈরিতায় আক্রান্ত। যে রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যায়, সে রোগের ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে রেভিনিউ দেয় না। বরং এমন ওষুধ সবচেয়ে লাভজনক যা রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু নির্ভরশীল রাখে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কোলেস্টেরল এগুলো ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা যায়, ‘নিরাময়’ করা যায় না বলে যে ধারণা প্রচলিত, সেটা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। বরং এই ধারণার পেছনে শিল্পের বিনিয়োগ রয়েছে।

অধ্যাপক মার্সিয়া অ্যাঞ্জেল, যিনি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনের সাবেক প্রধান সম্পাদক, তাঁর The Truth About the Drug Companies (২০০৪) গ্রন্থে দেখান যে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো গবেষণার চেয়ে বেশি খরচ করে বিপণনে। ২০০২ সালে বৃহত্তম মার্কিন কোম্পানিগুলো গবেষণায় ব্যয় করেছে ৩১.৫ বিলিয়ন ডলার, আর বিপণনে ব্যয় করেছে ৬৭ বিলিয়ন ডলার।

“বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো গবেষণার দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করে বিপণনে।”

৫.২ ‘অরফান ডিজিজ’ ও গ্লোবাল হেলথ এজেন্ডার পক্ষপাত

বৈশ্বিক ওষুধ গবেষণা এজেন্ডার একটি প্রকট বৈষম্য রয়েছে। Drugs for Neglected Diseases initiative (DNDi)-এর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে অনুমোদিত ১,৩৯৩টি নতুন ওষুধের মধ্যে মাত্র ১৩টি ছিল তৃতীয় বিশ্বের ক্রান্তীয় রোগের জন্য। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশেরও কম। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ঘুমানোর রোগ (sleeping sickness), চাগাস রোগ এগুলো কোটি কোটি মানুষকে আক্রান্ত করে, কিন্তু যেহেতু আক্রান্তরা গরিব, তাই তারা কর্পোরেট গবেষণায় অগ্রাধিকার পায় না।

অন্যদিকে স্থূলতা, টাক পড়া বা যৌন অক্ষমতার মতো সমস্যার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গবেষণা চলে। কারণ উত্তরের ভোক্তারা এই ওষুধের দাম দিতে পারে। এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের একটি মৌলিক ঔপনিবেশিক বৈষম্য: কার জীবন বাঁচানোর জন্য বিনিয়োগ হবে তা নির্ধারণ করে বাজার, মানবিক প্রয়োজন নয়।
তথ্যসূত্র: Trouiller, P. et al. (2002). Drug development for neglected diseases: a deficient market and a public-health policy failure. The Lancet, 359(9324), 2188-2194.

 

ছয়. বৈশ্বিক স্বাস্থ্যশাসন: WHO ও ক্ষমতার ভূগোল

৬.১ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গঠনগত সমস্যা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাত্ত্বিকভাবে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট। WHO-এর বাজেটের বড় অংশ আসে স্বেচ্ছাধীন অনুদান থেকে যেগুলো প্রায়ই নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য চিহ্নিত থাকে। ফলে WHO আসলে সর্বোচ্চ দাতাদের অগ্রাধিকার মেনে চলতে বাধ্য।

বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন WHO-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম দাতা (কিছু বছরে মার্কিন সরকারের পরেই)। এই ফাউন্ডেশন একই সাথে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিকে প্রভাবিত করে। এই স্বার্থের সংঘাত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরছেন।

৬.২ কোভিড-১৯ মহামারি: ঔপনিবেশিক কাঠামোর সর্বশেষ প্রমাণ

কোভিড-১৯ মহামারি মেডিকেল কলোনিয়ালিজমের সব রেখাগুলো নগ্নভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। টিকা উৎপাদন হয়েছে মূলত উত্তরের দেশগুলোতে; মেধাস্বত্ব সুরক্ষার কারণে জেনেরিক উৎপাদন সীমিত রাখা হয়েছে; ধনী দেশগুলো প্রয়োজনের বহুগুণ বেশি টিকা মজুদ করেছে; এবং আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া মাসের পর মাস টিকার জন্য অপেক্ষা করেছে।
People’s Vaccine Alliance-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের শুরুতে বিশ্বের উৎপাদিত টিকার ৮৫ শতাংশ গেছে ধনী দেশগুলোতে। আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে বহু দেশ তখনো তাদের ১% জনগণকেও টিকা দিতে পারেনি। অথচ টিকা তৈরিতে সরকারি অর্থায়ন অর্থাৎ করদাতাদের অর্থ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল।

“২০২১ সালে বিশ্বের ৮৫% কোভিড টিকা গেছে ধনী দেশগুলোতে, আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষ অপেক্ষায়।”

সাত. প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও বিকল্প পথ

৭.১ দেশীয় জ্ঞানের পুনরুদ্ধার আন্দোলন

এই ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্যকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ভারতের আয়ুষ মন্ত্রণালয় (AYUSH—Ayurveda, Yoga, Unani, Siddha, Homeopathy) দেশীয় চিকিৎসা ঐতিহ্যকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে, যদিও এর বাস্তবায়ন বিতর্কিত। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ঘানায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসককে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সমন্বিত করার প্রচেষ্টা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসার পৃথক কাউন্সিল রয়েছে, কিন্তু সম্পদ বরাদ্দ ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে এগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রান্তিক। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ভেষজজ্ঞান সংরক্ষিত, সেটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরেই থেকে গেছে।

৭.২ জেনেরিক ওষুধ ও দক্ষিণের প্রতিরোধ

ভারত ও ব্রাজিল বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ভারতের Patent Act ১৯৭০ (সংশোধিত ২০০৫) বিশেষভাবে ওষুধের পেটেন্টের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড আরোপ করেছে। তথাকথিত ‘এভারগ্রিনিং’ বন্ধ করার জন্য, যেখানে কোম্পানিগুলো সামান্য পরিবর্তন করে বারবার পেটেন্ট নবায়ন করত। সিপলা, ডক্টর রেড্ডি’স ও র‍্যানবাক্সির মতো ভারতীয় জেনেরিক ওষুধ কোম্পানিগুলো কোটি কোটি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশও এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আছে। স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে বাংলাদেশ TRIPS চুক্তির আওতায় ওষুধ পেটেন্ট মানতে বাধ্য নয়। এই সুবিধা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ তৈরির সুযোগ দিয়েছে। স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপ্টাসহ বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো আজ বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে।
তথ্যসূত্র: BGMEA Drug Export Report, 2023; WTO LDC Pharmaceutical Waiver.

উপসংহার: জিম্মিদশা থেকে মুক্তির প্রশ্ন

মেডিকেল কলোনিয়ালিজম কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। এটি ইতিহাসে নথিভুক্ত, কাঠামোগতভাবে বিদ্যমান এবং পরিসংখ্যানে প্রমাণিত একটি বাস্তবতা। দেশীয় চিকিৎসাজ্ঞানের ধ্বংস থেকে শুরু করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ভূগোল, পেটেন্ট ব্যবস্থার কাঠামো থেকে কোভিড মহামারির টিকা বৈষম্য সবকিছু একটি ধারাবাহিক আখ্যানের অংশ।

এই নীতিমালার কেন্দ্রে আছে একটি মৌলিক নীতি: যার কাছে জ্ঞান নেই, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, সে নির্ভরশীল; এবং যে নির্ভরশীল, সে শোষণযোগ্য। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ঠিক এই ত্রিভুজেই আটকে আছে।
তবে এই চিত্র সম্পূর্ণ হতাশার নয়। ভারতের জেনেরিক ওষুধ শিল্প, বাংলাদেশের LDC সুবিধার সদ্ব্যবহার, আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার পুনর্মূল্যায়ন, এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আন্দোলনের চাপে TRIPS চুক্তির নমনীয়তা এগুলো প্রতিরোধের জীবন্ত নজির। প্রশ্নটা হলো: এই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধগুলো কি কোনোদিন একটি সংগঠিত দক্ষিণের কণ্ঠস্বরে রূপান্তরিত হবে?

মেডিকেল কলোনিয়ালিজম থেকে মুক্তি কেবল ওষুধ তৈরির প্রশ্ন নয়। এটি জ্ঞানের রাজনীতির প্রশ্ন। কে জ্ঞান তৈরি করে, কে বৈধতা দেয়, কে গ্রহণ করে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাল্টালে শরীরের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
“চিকিৎসার স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।”

লেখক- নিউজ এডিটর ও কলামিস্ট