নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর:ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

অনলাইন ডেস্ক
জুন ২৭, ২০২৬ ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে বেইজিং। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে দেশটি। শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার ধারণাটি নতুন নয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রস্তাবিত এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য যেমন অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে, তেমনি দেশের সার্বভৌমত্ব, কূটনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছু জটিল চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে।

প্রস্তাবিত করিডোরের রূপরেখা ও সংযোগ কাঠামো

চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অংশ হিসেবে এই করিডোরটি আলোচিত হচ্ছে। মূলত চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশের একটি কৌশলগত স্থল-পথ (Land Route) তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।

সম্ভাব্য রুট ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক:
• উৎস বিন্দু: চীনের ইউনান প্রদেশ (Kunming, Yunnan)।
• ট্রানজিট জোন: মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন রাজ্য (সিত্তওয়ে/কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর সংলগ্ন এলাকা)।
• গন্তব্য ও সংযোগ: বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা এবং পরবর্তীতে মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

এই করিডোরটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চার ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর ঘটতে পারে:

১. আঞ্চলিক লজিস্টিক ও ট্রানজিট হাবে রূপান্তর

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই করিডোরের মাধ্যমে দেশ কেবল একটি উৎপাদনকারী দেশই থাকবে না, বরং চীন ও আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলের বাজারে প্রবেশদ্বার বা ‘কৌশলগত ট্রানজিট গেটওয়ে’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

২. বন্দর ও অবকাঠামোগত মহাবিপ্লব

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি কক্সবাজারের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের লজিস্টিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চীনের বিশাল পুঁজি ও প্রযুক্তির সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে।

৩. বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ও শিল্পায়ন

করিডোরের রুট ধরে বাংলাদেশে নতুন নতুন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। চীনের স্থানান্তরিত হতে যাওয়া ভারী ও হালকা উৎপাদনমুখী শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তরের (Relocation) সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

৪. বাণিজ্য ব্যয় ও সময় হ্রাস

বর্তমানে চীন থেকে সমুদ্রপথে পণ্য বাংলাদেশে আসতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, এই স্থল ও রেল করিডোর চালু হলে তা মাত্র কয়েক দিনে নেমে আসবে। এতে কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পণ্য রপ্তানির লিড-টাইম (Lead Time) কমে যাবে।

ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ

এই করিডোর কেবল একটি অর্থনৈতিক সংযোগ প্রকল্প নয়, এটি মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক শক্তির খেলা (Geopolitical Power Play)।
[চীন (ইউনান)] ──► [মিয়ানমার (রাখাইন)] ──► [বাংলাদেশ (চট্টগ্রাম/কক্সবাজার)] ──► (ভারত মহাসাগরে প্রবেশ)

• চীনের মালাক্কা সংকটের বিকল্প: চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্য আমদানির একটি বিশাল অংশ বর্তমানে ‘মালাক্কা প্রণালী’ দিয়ে যায়, যা কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। মিয়ানমার-বাংলাদেশ হয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে পারলে চীন সেই ঝুঁকি (Malacca Dilemma) এড়াতে পারবে।

• আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য: এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের (Quad) নজরদারিতে থাকবে। ফলে বাংলাদেশ এই বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে চলে আসবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিসমূহ

প্রকল্পটি কাগজে-কলমে যতটা সম্ভাবনাময়, বাস্তবে এর রূপায়ন ততটাই জটিল। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:

১. মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গৃহযুদ্ধ

করিডোরের সবচেয়ে দুর্বল অংশটি হলো মিয়ানমার। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্য (Rakhine State) বর্তমানে সামরিক জান্তা এবং ‘আরাকান আর্মি’র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর তীব্র সংঘাতের কারণে চরম অস্থিতিশীল। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই প্রকল্পের টেকসই বাস্তবায়নকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

২. ভূ-কৌশলগত কূটনৈতিক ভারসাম্য (The India Factor)

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (Seven Sisters) নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের একাধিপত্য ঠেকাতে নয়াদিল্লি এই করিডোরকে ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। বাংলাদেশকে প্রধান প্রতিবেশি ভারত এবং প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার চীন—উভয় পক্ষের মধ্যে একটি নিখুঁত ও নিপুণ কূটনৈতিক ভারসাম্য (Diplomatic Tightrope Walk) বজায় রাখতে হবে।

৩. ‘ঋণ-ফাঁদ’ (Debt-Trap) এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা

শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বা পাকিস্তানের সিপেক (CPEC)-এর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নিতে হবে। এই মেগা প্রকল্পের অর্থায়নের শর্তাবলী যেন বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঋণের ঝুঁকিতে না ফেলে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের আর্থিক লাভ (ROI) যেন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে চাপা না পড়ে সেটি বিবেচনায় আনতে হবে।

৪. রোহিঙ্গা সংকট ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

মিয়ানমার কর্তৃক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আন্তরিকতার অভাব এবং এই মানবিক সংকটের সমাধান না করে এমন কোনো মেগা প্রকল্পে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় কিনা সেটি দেখতে হতে পারে।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (BMCEC) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘গেম-চেঞ্জার’। তবে এর বাস্তবায়ন কোনো সরল রেখা নয়।
বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পথ হবে—”অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, কিন্তু কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা।”
বাংলাদেশকে এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগে একটি ত্রি-মুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে:

১. অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study): প্রতিটি অবকাঠামোগত ঋণের শর্ত অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা, যাতে সার্বভৌমত্ব বা কোনো বন্দর দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি নিয়ন্ত্রণে না যায়।

২. বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা: এই করিডোরকে কেবল চীন-কেন্দ্রিক না রেখে এর সাথে আঞ্চলিক অন্যান্য ব্লক বা সংস্থাকে (যেমন: BCIM বা BIMSTEC) সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা, যাতে অন্য পক্ষগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রশমিত হয়।

৩. মিয়ানমার নীতি: মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে চীনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালনে বাধ্য করা।

সংক্ষেপে, এটি বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি অনন্য অর্থনৈতিক সুযোগ, ঠিক তেমনি একটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষাও বটে।

মাসুমুর রহমান খলিলীর  ফেসবুক  ওয়াল থেকে