বিশেষ কূটনৈতিক প্রতিবেদক-
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন (সোমবার) রাতে চীনের বন্দর নগরী দালিয়ানে পৌঁছান। তাঁর চীন সফরের আনুষ্ঠানিক প্রথম দিনটি ছিল ২৩ জুন, ২০২৬ (মঙ্গলবার)।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা সিনহুয়া (Xinhua) এবং চায়না মিডিয়া গ্রুপ (CMG/CRI)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস (যা সামার দাভোস ফোরাম ২০২৬ নামে পরিচিত) সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম দিনের কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন।
লাল গালিচা সংবর্ধনা ও আনুষ্ঠানিক সূচনা
চীনা সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার বরাতে, সোমবার গভীর রাতে দালিয়ান ঝুশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে উষ্ণ লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। লিয়াওনিং প্রদেশের ভাইস গভর্নর বাই ইয়িং এবং ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তাঁকে স্বাগত জানান। এরপর ২৩ জুন সকাল থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক ব্যস্ততা শুরু হয়।
২৩ জুন স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি (Alois Zwinggi) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে একটি বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আলোইস জভিংগি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁকে সুইজারল্যান্ডের মূল দাভোস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা ও ডেল্টা প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করেন। ফোরামের প্রধান বাংলাদেশের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০,০০০ কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখনন উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, এই জলবায়ু সহনশীলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করবে।
প্রথম দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সামার দাভোস ফোরামের একটি বিশেষ সেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। “Climate Leadership in a Shifting Global Landscape” (পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব) শীর্ষক সেশনে তিনি বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের কাছে ৩টি প্রধান দাবি বা অগ্রাধিকার তুলে ধরেন:
Loss and Damage Fund:এই তহবিলটিকে কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে না রেখে দ্রুত ভুক্তভোগী দেশগুলোর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
সহজলভ্য ক্লাইমেট ফাইন্যান্স: জলবায়ু অর্থায়নকে আরও সহজ, নমনীয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর চাহিদার অনুকূলে আনতে হবে।
মিটিগেশন ও অ্যাডাপ্টেশন: পরিবেশের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মূল বার্তা: “বাংলাদেশ মনে করে জলবায়ু মোকাবিলা কোনো খরচ বা অপচয় নয়; বরং এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং অংশীদারিত্বের ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।”
চীনা গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ জুন প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি কিয়াং (Li Qiang) কর্তৃক আয়োজিত একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে বিশ্বনেতাদের সাথে তাঁর অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় হয়।
চায়না মিডিয়া গ্রুপ (CMG) বাংলা এবং চীনের সরকারি মুখপত্রগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের “সোনালি ৫০ বছর” (Golden 50 Years)-এ প্রবেশের মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বেইজিংয়ের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেইজিং এই নতুন সরকারের সাথে উচ্চ-মানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
আজ ২৪ জুন (বুধবার) দুপুরেই তিনি চীনের দালিয়ান শহর থেকে হাইস্পিড ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। এই সফরের মাধ্যমে মূলত আজ বিকেল/সন্ধ্যা থেকে বেইজিংয়ে তাঁর মূল দ্বিপাক্ষিক ও রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
বেইজিং পৌঁছানোর পর আগামী দুই দিন (২৫ ও ২৬ জুন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হলো:
১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU)। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতসহ প্রায় ১৫-১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ “তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প” বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে এবার মূল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে তাঁর আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
