২৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানোর উদ্যোগ; তরুণদের জন্য খুলছে ডিজিটাল কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় পরিসরের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে অংশ নিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ তরুণ আবেদন করেছেন। বাছাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার আবেদনকারী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তৃত সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের তরুণদের দক্ষ করে তোলাই এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে তরুণরা ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার সুযোগ পাবেন, যা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত আয়ের পথ খুলবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখবে।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে নির্বাচিত বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ আলম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কারিগরি ও আর্থিক স্কোরের ভিত্তিতে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করে। সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
“দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (১ম সংশোধিত)” শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় পঞ্চম ব্যাচে তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
এই প্রশিক্ষণের মোট সময় ৬০০ ঘণ্টা। এপ্রিল ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে প্রশিক্ষণ চলবে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আধুনিক ডিজিটাল দক্ষতা, অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজের কৌশল এবং আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পেলে বাংলাদেশের তরুণরা বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। এ প্রকল্প সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের অংশগ্রহণ
প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগের মোট ৪৮ জেলার তরুণ-তরুণীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বড় শহর নয়—প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত ডিজিটাল দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারীদের ন্যূনতম এইচএসসি বা সমমান পাস হতে হবে। বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৩৫ বছর। প্রতিটি ব্যাচে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যাদের কম্পিউটার ব্যবহারে প্রাথমিক জ্ঞান রয়েছে এবং নিজস্ব ল্যাপটপ আছে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা
প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত সহায়তা হিসেবে প্রতিদিন ২০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণ চলাকালে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং বিকেলের নাস্তার ব্যবস্থাও থাকবে।
প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করলে অংশগ্রহণকারীদের সনদ প্রদান করা হবে, যা ভবিষ্যতে পেশাগত কাজে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভর্তি ও পরীক্ষার সময়সূচি
এই কর্মসূচির জন্য আবেদনের শেষ সময় ছিল ৩ মার্চ ২০২৬ রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৬ মার্চ, এরপর ৭ মার্চ মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। সবশেষে ১০ মার্চ চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
যোগ্য প্রার্থীদের পরীক্ষার সময়সূচি ও ফলাফল এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর জোর
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় বাজেটের প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের আইটি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তাদের মতে, যদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবমুখী হয় এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণরা আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ পান, তাহলে এটি দেশের বেকারত্ব হ্রাস ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই উদ্যোগ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের
