নয়াখবর
রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গীতাঞ্জলি: আত্মার অর্ঘ্য থেকে নোবেল জয়ের মহাকাব্যিক যাত্রা

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬ ২:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

বাংলা কাব্যগ্রন্থের সৃষ্টি ও সৌন্দর্য

‘গীতাঞ্জলি’ শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বাঙালির চিরন্তন চেতনার প্রতীক। ১৯১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর (১৩১৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে) কলকাতার ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় এই গ্রন্থটি । এতে মোট ১৫৭টি গীতিকবিতা সংকলিত হয়েছে, যার বেশিরভাগেই সুরারোপ করেছিলেন স্বয়ং কবি ।

১৯০৮ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের নিভৃত সাধনার ফসল এই কবিতাগুলি। রবীন্দ্র-গবেষক সুকুমার সেনের মতে, পুত্রশোকে বিচলিত কবির হৃদয় থেকে ‘গীতাঞ্জলি’র ভক্তিরস উদ্গীত হয়েছিল । এটি মূলত ব্রাহ্মভাবাপন্ন ভক্তিমূলক রচনা, যেখানে কবি জীবনের গভীর রসের সন্ধান পেয়েছিলেন।

ইংরেজি অনুবাদ: ‘সং অফারিংস’-এর জন্মকথা

১৯১২ সালের শুরুতে অর্শ রোগে আক্রান্ত হয়ে পদ্মানদীতে বিশ্রামরত অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর কবিতাগুলির ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেন । কিন্তু অনেকেই জানেন না, ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ কিন্তু সম্পূর্ণ বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ নয়। রবীন্দ্রনাথ এই সংকলনে মোট ৯টি কাব্যগ্রন্থের কবিতা নিয়ে ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ সাজান ।

বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’র ১৫৭টি কবিতার মাত্র ৫৩টি স্থান পেয়েছিল ইংরেজি সংস্করণে। বাকি ৫০টি কবিতা আনা হয়েছিল :

· গীতিমাল্য থেকে ১৬টি
· নৈবেদ্য থেকে ১৫টি
· খেয়া থেকে ১১টি
· শিশু থেকে ৩টি
· এবং একটি করে কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, স্মরণ ও অচলায়তন নাটক থেকে

অনুবাদক কে কে? প্রধান অনুবাদক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি কবিতার অনুবাদে সাহায্য করেছিলেন ব্রাদার জেমস । পরবর্তীকালে ব্রিটিশ কবি ও অনুবাদক জো উইন্টার বাংলাভাষা শিখে সম্পূর্ণ ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। এছাড়া কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস অনুবাদগুলি সম্পাদনা করে ভূমিকা রচনা করেছিলেন ।

১৯১২ সালের ২৭ মে বোম্বাই বন্দর থেকে লন্ডনযাত্রার সময় রবীন্দ্রনাথ পাণ্ডুলিপি সঙ্গে নেন। লন্ডনের টিউব রেলে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলেও পুত্র রথীন্দ্রনাথ তা উদ্ধার করেন । চিত্রকর উইলিয়াম রোথেনস্টাইনের হাত ধরে পাণ্ডুলিপি পৌঁছায় কবি ইয়েটসের কাছে। ১৯১২ সালের নভেম্বরে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি ৭৫০ কপি বই প্রকাশ করে, যার ২৫০ কপি সাধারণের জন্য নির্ধারিত ছিল ।

নোবেল পুরস্কার: ঐতিহাসিক স্বীকৃতির নেপথ্য কারণ

১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বিশ্ব চমকে উঠল। সুইডেনের স্টকহোম থেকে পাঠানো সংবাদ সংস্থা রয়টারের টেলিগ্রামে জানা গেল, এশিয়ার প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কিন্তু কী বিচারে এই পুরস্কার?

প্রথমত, অনুবাদের অনন্য গুণ। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি অনুবাদ আক্ষরিক ছিলোনা , বরং ভাবানুবাদ। ‘আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার’ কবিতাটির অনুবাদে তিনি লিখেছিলেন, “My song has put off her adornments” – যা বাংলার মূল সুর অক্ষুণ্ন রেখে ইংরেজি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছিল । নিজের অনুবাদ নিয়ে কবির দ্বিধা থাকলেও ইয়েটসের সম্পাদনা একে প্রাণ দিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্যের বিস্ময়। ইংরেজ কবি ইয়েটসের ভূমিকা ছিল অভিভূত হওয়ার মতো। তিনি লিখেছিলেন, “এই কবিতায় আমি আমার দৈনন্দিন জীবনের চেয়ে অধিক কিছু পেয়েছি।” কবি মে সিনক্লেয়ার মন্তব্য করেন, “রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মানুষের সাধারণ আবেগমথিত নিবেদনের মিলন হয়েছে এমন এক সঙ্গীত ও ছন্দে যা সুইনবার্নের চেয়েও পরিশীলিত” ।

তৃতীয়ত, আধ্যাত্মিক বার্তা। গীতাঞ্জলির কবিতায় উপনিষদের দর্শন, মানব-আত্মার পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আকুতি এবং বিশ্বমানবতার বাণী প্রতিফলিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে পাশ্চাত্য এই শান্তির বাণীতে মুগ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছিলেন, “এ কেবলমাত্র আমার নিজের মনের কথা, আমারই প্রয়োজনে লেখা” । কিন্তু সেই ‘নিজের মনের কথাই’ বিশ্বমানবের হৃদয় ছুঁয়েছিল।

চতুর্থত, সুপারিশের সরলতা। ইংরেজ কবি টি. স্টার্জ মুর খুব সাদামাটা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের নাম সুপারিশ করেছিলেন । কিন্তু সেই সরল সুপারিশের আড়ালে ছিল অসাধারণ কবিতার শক্তি।

শেষ কথা

গীতাঞ্জলি শুধু একটি বই নয়, এটি একটি ঘটনা। যে ঘটনা বাঙালিকে বিশ্বসভায় সম্মানের আসনে বসিয়েছিল। বাংলার ১৫৭টি কবিতার ৫৩টি নিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘সরল বাঁশি’ আজও বেজে চলেছে বিশ্বের প্রান্তরে প্রান্তরে।