নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ফ্যাসিবাদের কবর রচনার নির্বাচন

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬ ২:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 

 

 

 

 

সাইফুল খান

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কোনো সাধারণ নির্বাচনের দিন নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক জবাবদিহির দিন। যেদিন বাংলাদেশের জনগণ বিগত ১৫ বছরের শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যালটের মাধ্যমে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই নির্বাচন কোনো দয়া বা সাংবিধানিক সৌজন্য নয়; এটি অর্জিত হয়েছে রক্ত, নিপীড়ন, কারাগার, গুম ও শহীদের বিনিময়ে।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ একটি ভোটহীন একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে একটি দল, একটি পরিবার ও একটি নিরাপত্তা বলয়ের স্বার্থে। নির্বাচন ছিল প্রহসন, সংসদ ছিল হাততালি দেওয়ার ক্লাব, বিচারব্যবস্থা ছিল নীরব দর্শক, আর প্রশাসন ছিল দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী। ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন মানেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এই সময়কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ভোটাধিকার পরিকল্পিত হত্যার কাল হিসেবে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; এটি ছিল ধারাবাহিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রকল্প। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল এই অপরাধের চূড়ান্ত প্রকাশ। তথাকথিত ‘রাতের ভোট’ কোনো প্রশাসনিক অনিয়ম বা বিচ্ছিন্ন কারসাজি নয়; এটি ছিল জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর রাষ্ট্রের প্রকাশ্য ডাকাতি। কোটি কোটি ভোটারের অধিকার এক রাতেই ছিনতাই করে প্রমাণ করা হয়েছিল ক্ষমতা আর জনগণের সম্মতিতে নয়, বরং জালিয়াতি ও বলপ্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই অপমান ছিল ঐতিহাসিক। জনগণকে শুধু ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়নি; তাদের নাগরিক মর্যাদাকেও পদদলিত করা হয়েছিল। সেই অপমান, সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ২০১৮ সালের গণআন্দোলন। যেখানে তরুণ সমাজ প্রথমবার স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে , এই রাষ্ট্র আর জিম্মি থাকতে রাজি নয়। এটি ছিল একটি প্রজন্মের জাগরণ, যারা ভয়কে অস্বীকার করে রাস্তায় নেমে বলেছিল ভোট ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো বৈধতা নেই।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্যাসিবাদ কখনো যুক্তির কাছে মাথা নত করে না। ২০১৮ সালের আন্দোলনের জবাবে এসেছে গুলি, গণগ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা, গুম ও ভয়াবহ দমন–পীড়ন। রাষ্ট্র তার নাগরিককে শত্রুতে পরিণত করে ক্ষমতা রক্ষার পথে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু সেই ভয়ই শেষ পর্যন্ত জমে ওঠে আগ্নেয়গিরির মতো, চেপে রাখা লাভার মতো ক্ষোভ, যা আর আটকে রাখা যায়নি।

তারই বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের গণবিপ্লবে। সেটি কোনো আকস্মিক আবেগ বা বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল নয়; সেটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের নিপীড়ন, বঞ্চনা ও অপমানের ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। জনগণ তখন আর কেবল সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছিল একটি দমনমূলক শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান। ২০২৪ এর বর্ষা বিপ্লব প্রমাণ করে দেয়, যে রাষ্ট্র জনগণের ভোট ছিনিয়ে নেয়, একদিন জনগণই সেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দিতে বাধ্য হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন কোনো রুটিন সাংবিধানিক আয়োজন নয়; এটি ফ্যাসিবাদ পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রথম ও নির্ণায়ক ধাপ। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়। এই নির্বাচন কি সত্যিই ফ্যাসিবাদের কবর রচনা করবে, নাকি পুরোনো দমননীতিকে শুধু নতুন মোড়কে, নতুন মুখে এবং নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনবে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্যাসিবাদ পরাজিত হওয়ার পরও রাষ্ট্রযন্ত্রে টিকে থাকতে চায় আইন, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ভেতর লুকিয়ে থেকে।

জনগণ এবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে আর কোনো ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ চলবে না, যেখানে ফল আগেই নির্ধারিত থাকে। আর কোনো ‘পছন্দের দল’ গ্রহণযোগ্য নয়, যারা ক্ষমতার অলংকার হয়ে গণতন্ত্রের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে বৈধতার নাটক করে। আর কোনো প্রশাসনিক থিয়েটার নয়। যেখানে পুলিশ, ডিসি, ইউএনও ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জনগণের নয়, শাসকের পাহারাদার হয়ে ওঠে। এসব কৌশল আর রাজনৈতিক চালাকি সরাসরি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবার ইতিহাসের কাঠগড়ায়। তারা যদি আবার সাংবিধানিক দায়িত্ব ভুলে ক্ষমতার দালালে পরিণত হয়, যদি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার বদলে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করে, তবে এই নির্বাচনও অতীতের মতোই রাষ্ট্রীয় অপরাধের দলিল হিসেবে চিহ্নিত হবে।
প্রশাসন যদি আবার জনগণের ভোটাধিকারকে দমন করতে মাঠে নামে, তবে সেটি আর ‘কর্তব্য পালন’ নয়। সেটি হবে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

এই নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও নির্মম পরীক্ষা। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত লড়াইয়ের ভাষা ব্যবহার করে ক্ষমতায় যেতে চায়, ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনার ওয়াদা করে ভোট চায় তাদের জন্য এটি চরম সতর্কবার্তা। জনগণ আর নতুন মুখে পুরোনো স্বৈরতন্ত্র দেখতে চায় না। অতীতে যারা ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করেছে, তাদের পুনরাবৃত্তি এবার সহ্য করা হবে না। ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণের লাইসেন্স নয়; ক্ষমতা মানে জবাবদিহি এবং জনগণের সামনে মাথা নত করা। সেরকম কিছু ঘটলে আরেকটা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাই কোনো বিকল্প সুযোগ নয়। এটি শেষ সুযোগ। রাষ্ট্রকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করে নাগরিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার শেষ সুযোগ। যদি এই সুযোগ ব্যর্থ হয়, তবে দায় ইতিহাসের ঘাড়ে চাপিয়ে পালানোর পথ থাকবে না। দায় বর্তাবে যারা নির্বাচন পরিচালনা করবে, যারা রাষ্ট্রযন্ত্র চালাবে এবং যারা ক্ষমতা চাইবে সবার ওপরই। কারণ তখন প্রমাণিত হবে সমস্যা শুধু কেবল শাসকের নয়; সমস্যা পুরো শাসনব্যবস্থার চরিত্রে।

রাষ্ট্র হয় জনগণের হবে, নয়তো জনগণই আবার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ইতিহাস বারবার সেই শিক্ষাই দিয়েছে।

বাংলাদেশ আর জিম্মি রাষ্ট্র হতে চায় না। এই নির্বাচনে গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটবে নয়তো প্রমান হবে ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র শাসক বদলায়, চরিত্র বদলায় না।

লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।