সাইফুল খান
মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ী শহীদ হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি সামরিক অপারেশন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক ধাক্কা। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম Islamic Republic News Agency (IRNA) এই ঘটনায় জাতীয় প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে। রুশ রাষ্ট্রীয় মাধ্যম RT এই ঘটনাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে বিশ্লেষণ করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমা বার্তা সংস্থা Reuters ও Associated Press ঘটনাটিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পর্যায়ের অনিশ্চয়তার সূচনা হিসেবে দেখছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক, রাজনৈতিক, মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।
ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) সীমিত কিন্তু প্রতীকী পাল্টা আঘাতের মাধ্যমে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘোষণার বদলে “ধাপে ধাপে প্রতিশোধ” কৌশল হতে পারে। যাতে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে চাপ বজায় রাখা যায়। তবে ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত আঘাত দ্রুত বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, বিশেষত যদি লেবানন, সিরিয়া বা ইরাকের মিত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক দিক থেকে ইরান এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। খামেনেয়ীর দীর্ঘ নেতৃত্বের পর ক্ষমতার উত্তরাধিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ‘Assembly of Experts’ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেছে বা করতে যাচ্ছে। পরবর্তী নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনেয়ীর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে বাস্তবে IRGC-র প্রভাব বাড়তে পারে। এতে ইরানের নীতি আরও কঠোর নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার হবে। সংকটকালীন সময়ে ইরানী জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকে।
মানবিক দিকটি ইতোমধ্যে খুবই উদ্বেগজনক। তেহরান ও অন্যান্য শহরে বিমান হামলার কারণে অবকাঠামোগত ক্ষতি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শরণার্থী স্রোত তুরস্ক, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সরবরাহ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হতে শুরু করেছে। ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালীর নিকটে অবস্থান করছে। সেখানে অস্থিরতা দেখা দিলে বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও শিপিং খাতে অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইউরোপীয় ও এশীয় অর্থনীতি বিশেষত জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো নতুন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর বিরুপ প্রভাব পড়বে। অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে থাকা দেশটিতে নতুন সরকার এসেই এই যুদ্ধের প্রভাবে নানান ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। রাশিয়া প্রকাশ্যে ইরানের প্রতি সহানুভূতি জানালেও সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ তারা ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ সামলাচ্ছে। চীন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘে জরুরি বৈঠক ডাকা হলেও কার্যকর সমাধান এখনো অনিশ্চিত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এটি কি সীমিত সংঘর্ষেই থামবে, নাকি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে? যদি ইরান সরাসরি মার্কিন ঘাঁটি বা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যাপক আঘাত হানে। তবে প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বৃহৎ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। আবার, কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিশোধ ও পরোক্ষ লড়াইয়ের পথও খোলা রয়েছে। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি বড় আঘাত বহুস্তরীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও পড়ে।
অতএব, খামেনেয়ীর মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত বা জাতীয় ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক মোড়। সামরিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, মানবিক ঝুঁকি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন সত্যিকার অর্থেই অগ্নিগর্ভ এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহে নেওয়া কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোর উপর। বিশেষত তেহরান, তেলআবিব ও ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের উপর।
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
