একটি ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
সাইফুল খান
বাংলাদেশে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প সংক্ষেপে ‘তিস্তা মেগা প্রজেক্ট’ এখন শুধু একটি নদী উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। একদিকে চীন এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতায় আসা নতুন বিএনপি সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই প্রকল্প এগিয়ে নেবে কিনা এবং নিলে কীভাবে। এই সিদ্ধান্তের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের চীনা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ, কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি এবং দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ।
তিস্তা প্রকল্প: পরিকল্পনা ও প্রেক্ষাপট
তিস্তা নদী বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জনজীবনের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই নদী বছরের পর বছর ধরে দুটি সংকটে জর্জরিত। বর্ষায় বন্যা ও ভাঙন, আর শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিশূন্যতা। ভারতের উজানে বাঁধ ও সেচ খাল নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ ১,২০০-১,৫০০ কিউসেক প্রয়োজনের বিপরীতে মাত্র ২০০-৩০০ কিউসেকে নেমে আসে।
এই সংকট মোকাবেলায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন অব চায়না (PowerChina) একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর ভিত্তিতে তৈরি হয় ‘তিস্তা রিভার কম্প্রিহেন্সিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ বা TRCMRP। এই প্রকল্পের মোট প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯১.৫ বিলিয়ন টাকা), যার মধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চীনের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালে শুরু এবং ২০২৯ সালে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত।
প্রকল্পে প্রস্তাবিত কাজের মধ্যে রয়েছে নদীর প্রশস্ততা প্রায় ৩ কিমি থেকে কমিয়ে মূল চ্যানেলকে সংহত করা, ১১০ কিমি নদী খনন ও গভীর করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণে ১০০ কিমিরও বেশি বাঁধ নির্মাণ, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি সংরক্ষণের খাল ও পুকুর খনন এবং উদ্ধার করা জমিতে শিল্পপার্ক, স্যাটেলাইট শহর ও সড়ক নির্মাণ।
চীনের প্রস্তুতি ও সাম্প্রতিক অবস্থান
চীন এই প্রকল্পে বিনিয়োগে স্পষ্টভাবে আগ্রহী। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিলে চীন তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করতে পারবে।’ তিনি আরও জানান যে চীন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সহযোগিতায় বিশ্বাসী।
মার্চ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের পর উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। এরপর থেকে প্রকল্পটি দ্রুত গতি পায়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দেয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) চীনা দূতাবাসকে চিঠি দেয়। ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে। এককথায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
ভূরাজনৈতিক চাপ: ভারত-চীন প্রতিযোগিতা
তিস্তা প্রকল্পটি নিছক একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি ভারত-চীন দক্ষিণ এশীয় প্রভাব-বিস্তারের লড়াইয়ের একটি ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়েছে। ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর। উত্তর-পূর্ব ভারতকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্তকারী সংকীর্ণ এই ভূমিপথের কাছে চীনা উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
এই কারণেই ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিনয় কোয়াত্রা ঢাকায় ছুটে এসে হঠাৎ তিস্তা প্রকল্পে ভারতীয় অর্থায়নের প্রস্তাব দেন। মূলত চীনকে বাইরে রাখার কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন, হাসিনার ভারতে আশ্রয় ও প্রত্যর্পণ বিতর্ক এবং দশকের পর দশক ধরে তিস্তার পানি বঞ্চনার ইতিহাস সব মিলিয়ে ভারতের প্রস্তাবকে ঢাকা সন্দেহের চোখেই দেখছে।
বিএনপি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। ফেব্রুয়ারি ১৭ তারিখে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার একটি জরুরি অগ্রাধিকার। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, মুদ্রাস্ফীতি, ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি এবং ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারানোর আগে অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা।
বিএনপির ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বৈদেশিক নীতি অনুযায়ী, নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক হবে না। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে সরকার মাল্টিপোলার কূটনীতি অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু তিস্তা প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে না।
প্রকল্প বাতিল হলে কী হবে?
যদি বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্প থেকে সরে আসে বা পুনর্বিবেচনা করে, তাহলে বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিণতি আসতে পারে। প্রথমত, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি শীতলতা আসতে পারে। যদিও গভীরতর কাঠামোগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘চীনের বাংলাদেশ নীতি প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত নয়। এটি বন্দর, অবকাঠামো, সংযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত।’ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীনও চীন কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।
তবে বাস্তবতা হলো, একটি $৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব যা বাস্তবায়নের পথে অনেক দূর এগিয়েছিল বাতিল করা হলে চীনা বিনিয়োগকারী মহলে নেতিবাচক সংকেত যাবে। ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান পেয়েছে। চট্টগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিনিময়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতাও চলমান রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তিস্তা প্রকল্প বাতিল হলে উত্তরবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বস্তি মিলবে না। বন্যা, ভাঙন ও খরার কোনো কার্যকর সমাধান না থাকলে নতুন সরকারের উপরও জনগণের ক্ষোভ বাড়তে পারে। বিশেষত রংপুর বিভাগের মতো অঞ্চলে যেখানে তিস্তা সংকট সরাসরি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করে।
চীন কীভাবে নতুন সরকারকে দেখছে?
নির্বাচনের পরদিন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বিএনপির জয়কে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশকে ‘ঐতিহ্যবাহী বন্ধু ও প্রতিবেশী’ বলে উল্লেখ করেন। চীনা প্রিমিয়ার লি কিয়াং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়ে দুই দেশকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’ আখ্যা দেন।
সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ লিউ জংই বলেছেন, বিএনপি ‘ভারসাম্যমূলক কূটনীতি’ অনুসরণ করবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা, অবকাঠামো অর্থায়ন, শিল্প আধুনিকায়ন সরকার পরিবর্তনের ফলে কমেনি। চীনের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের মূল কাঠামো নির্বাচনে পরিবর্তন হবেনা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং ওয়াশিংটন বাংলাদেশে চীনা প্রভাব বৃদ্ধিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিও করেছে। ফলে বিএনপি সরকারকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা খেলতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের সামনে তিস্তা নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।
প্রথম পথ হলো চীনের সাথে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া। এতে অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে, পানি সংকটের সমাধান হবে, কিন্তু ভারতের সাথে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে এবং মার্কিন চাপও বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় পথ হলো প্রকল্পের শর্ত পুনর্আলোচনা করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, পরিবেশগত উদ্বেগ মেটানোর ব্যবস্থা রেখে এবং ঋণের চাপ কমিয়ে একটি পুনর্গঠিত চুক্তিতে সই করা।
তৃতীয় পথ, প্রকল্প বাতিল করা। এটা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এতে চীনা বিনিয়োগে প্রত্যাশিত শীতলতা, উত্তরবঙ্গের জনগণের নিরাশা এবং একটি বিকল্প অর্থায়নকারীর অনুপস্থিতি একত্রে বাংলাদেশকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। কেননা ভারত ওই প্রকল্প করার ‘প্রতিশ্রুতি’ দিলেও দশকের পর দশক তিস্তার পানি চুক্তিই করেনি। ভারতের বিকল্প প্রস্তাবকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করার সংগত কারণ নেই।
চীনা বিনিয়োগের বৃহত্তর চিত্র
চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) আওতায় চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকার ক্ষমতাকেন্দ্রের মতো অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তিস্তা প্রকল্প বাতিল হলেও এই সামগ্রিক বিনিয়োগ সম্পর্ক রাতারাতি বদলে যাবে না।
তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি সংকেত তৈরি হবে। চীন সবসময়ই পারস্পরিক সুবিধার হিসেবে বিনিয়োগ করে। যেখানে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ আছে, সেখানে আগ্রহ বেশি। তিস্তা প্রকল্পটি ছিল চীনের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার একটি বিশেষ সুযোগ। ভারতের ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে। এটি বাতিল হলে ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পে চীনা উৎসাহে কিছুটা ঘাটতি আসতেই পারে।
উপসংহার
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্ত কেবল একটি নদীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির প্রথম বড় পরীক্ষাও হবে। প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, চীনের প্রস্তুতি স্বীকৃত, আবার পরিবেশগত উদ্বেগ ও ভূরাজনৈতিক জটিলতাও উপেক্ষার উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি পুনর্গঠিত, স্বচ্ছ ও পরিবেশসম্মত চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা, উত্তরবঙ্গের জনগণের প্রয়োজন মেটানো এবং একই সাথে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা। এই তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সত্যিকার পরীক্ষা হবে এখানেই। বড় শক্তির চাপ আর দেশের মানুষের প্রয়োজনের মাঝে কতটা সুচতুরভাবে ভারসাম্য রাখা যায়।
লেখক-ইতিহাস,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
