নয়াখবর
মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দিরিলিশ আরতুগ্রুল’: পর্দায় ইতিহাস গড়ার নেপথ্য কাহিনি

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬ ২:৩৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

২০১৪ সালের ডিসেম্বর। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় চ্যানেল টিআরটি ১-এ সম্প্রচার শুরু হলো নতুন এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিক। কে জানত, এই ধারাবাহিকই একদিন বিশ্বের বৃহত্তম পর্দায় ইতিহাস গড়বে? ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ (Diriliş: Ertuğrul) শুধু একটি টিভি সিরিজ নয়, বরং এক সাম্রাজ্যের উত্থানের মহাকাব্যিক আখ্যান, যার নেপথ্যে রয়েছে রক্ত-ঘাম আর অক্লান্ত পরিশ্রমের এক অনবদ্য গল্প ।

স্রষ্টার স্বপ্ন থেকে বাস্তব

মেহমেত বোজদাগ নামের এক তুর্কি প্রযোজক-চিত্রনাট্যকারের স্বপ্ন ছিল তুর্কি ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়কে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার। উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজির পিতা আরতুগ্রুলের জীবনকাহিনি নিয়ে কাজ শুরু করলেন তিনি। ১৩শ শতকের আনাতোলিয়ার প্রেক্ষাপটে রচিত এই কাহিনিতে ফুটে উঠেছে এক মুসলিম তুর্কি যোদ্ধার সংগ্রাম, যিনি মোঙ্গল ও ক্রুসেডারদের দ্বিমুখী আক্রমণ উপেক্ষা করে নিজের গোত্রের জন্য একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন ।

কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে বোজদাগকে পাড়ি দিতে হয়েছিল দীর্ঘ পথ। প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন কেমাল তেকদেন, তাঁর টেকদেন ফিল্ম প্রযোজনা সংস্থা এই বিশাল প্রকল্পের দায়িত্ব নেয় ।

চরিত্রে প্রাণ দেওয়ার গল্প

সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র আরতুগ্রুলের ভূমিকায় কে হবেন? এমন প্রশ্ন যখন ভাবছেন নির্মাতারা, তখন সামনে এলেন এনজিন আলতান দোজিয়াতান। শক্তিমান এই অভিনেতা আরতুগ্রুল বে-এর চরিত্রে নিজেকে এতটা মানিয়ে নিয়েছিলেন যে পর্দায় তাঁকে দেখলে দর্শক বিশ্বাস করতেন, তিনিই সত্যিকারের আরতুগ্রুল। তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও সংযম চরিত্রটিকে বাস্তবের মতো ফুটিয়ে তোলে ।

অভিনয়শিল্পী বাছাই ছিল কঠোর। চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া হয় উপযুক্ত শিল্পী। ইসমাইল হাক্কি উরুন, কানবোলাত গুরকেম আরসলান, নুরেত্তিন সোনমেজ, জেঙ্গিজ জকসুনের মতো প্রতিভাবান শিল্পীরা ধীরে ধীরে জুটিয়ে নেন ভক্তদের ভালোবাসা । উল্লেখযোগ্য, প্রথম চার মৌসুমে হালিমে সুলতানের চরিত্রে এসরা বিলগিচ ও শেষ মৌসুমে ইলবিলগে হাতুনের চরিত্রে হান্দে সোরাল অভিনয় করেন ।

চিত্রগ্রহণ: যেখানে ফিরে গেছে ইতিহাস

আরতুগ্রুলের গল্প শুধু পর্দায় দেখা যায়নি, তার পেছনে রয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম। ইস্তাম্বুলের বেইকোজ জেলার রিভা নামের একটি গ্রামে সিরিজটির চিত্রগ্রহণ হয় । এই গ্রামকে ১৩শ শতকের তুর্কি গ্রামে রূপান্তরিত করতে কারিগররা তৈরি করেন অসংখ্য কাঠামো, তাঁবু ও প্রাকৃতিক দৃশ্য। শীতের রুক্ষতা থেকে গ্রীষ্মের দাবদাহ প্রতি আবহাওয়াতেই অভিনয় করতে হয়েছে কলাকুশলীদের।

এক একটি পর্বের দৈর্ঘ্য ছিল ১০৫ থেকে ১৬৫ মিনিট। পরবর্তীতে নেটফ্লিক্স ও পিটিভি হোমের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলির জন্য পর্বগুলিকে ৪২-৪৫ মিনিটে সম্পাদনা করা হয় । ৫টি মৌসুমে মোট ১৫০টি পর্ব সম্প্রচারিত হয়, যা নেটফ্লিক্সে ৪৪৮টি ও পাকিস্তানের পিটিভি হোমে ৪৭০টি খণ্ডে বিভক্ত হয় ।

ইতিহাসের ছায়া অবলম্বনে

ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হলেও বাস্তবে আরতুগ্রুলের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই। নির্মাতারা কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাজিয়েছেন গল্পের বিন্যাস। ঐতিহাসিক বর্ণনার সঙ্গে জনপ্রিয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। তবে উসমানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেমন কোসে দাগের যুদ্ধ ইত্যাদি যথাযথভাবে দেখানো হয়েছে ।

ঐতিহাসিক নির্ভুলতা বনাম নাটকীয়তা এই দ্বন্দ্বে নির্মাতাদের পড়তে হয়েছে সমালোচনার মুখেও। তুরস্ক সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রচারের অভিযোগ ওঠে সিরিজটির বিরুদ্ধে। কিছু আরব দেশ সিরিজটি নিষিদ্ধ করে এবং এর বিরুদ্ধে ফতোয়াও জারি হয় ।

আন্তর্জাতিক সাফল্য ও নেপথ্যের বাস্তবতা

সমালোচনা সত্ত্বেও ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। পাকিস্তান, আজারবাইজানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সিরিজটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ । পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজে সিরিজটির প্রশংসা করে টুইট করেন, যা সিরিজটির জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

নেটফ্লিক্স ২০১৬-১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সিরিজটি স্ট্রিম করে । তুরস্কের পাশাপাশি বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে সিরিজটি দেখানো হয়। সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে ২০১৯ সালে শুরু হয় সিরিজটির সিক্যুয়েল ‘কুরুলুস: ওসমান’, যা আরতুগ্রুলের পুত্র ওসমানের জীবন নিয়ে নির্মিত ।

চূড়ান্ত পর্ব: সমাপ্তি নয়, শুরু

২০১৯ সালের ২৯ মে পর্দায় আসে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর শেষ পর্ব। আরতুগ্রুল চরিত্রের ইলবিলগে হাতুনের সঙ্গে বিবাহ এবং গোত্রের নতুন পথচলার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে পাঁচ মৌসুমের মহাকাব্যের । কিন্তু শেষ পর্বের দৃশ্যে দেখা যায়, ছোট্ট ওসমান ঘোড়ায় চড়ে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তখনই ধ্বনিত হয় ঘোষণা “আরতুগ্রুলের গল্প শেষ হলেও ওসমানের গল্প সবে শুরু হচ্ছে।”

এভাবেই ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ শুধু একটি টিভি সিরিজ নয়, বরং তুর্কি ইতিহাসের এক অধ্যায়কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। পর্দার আড়ালের এই অক্লান্ত পরিশ্রম, অগণিত মানুষের নিঃস্বার্থ নিবেদনই আজ ‘আরতুগ্রুল’ নামটিকে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের মনে অমর করে রেখেছে।