ফরেন এফেয়ার্স পত্রিকায় নাদিয়া শ্যাডলোর “গ্লোবালিস্ট ইলিউশন” অবলম্বনে সাইফুল খানের লেখা-
ক্ষমতার পরিবর্তন কখনো নিঃশব্দে আসে না। কিন্তু এবার যে পরিবর্তন আসছে, তা আগের মতো দুটো পরাশক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়। এবারের লড়াই আরও গভীরে দুটো ভিন্ন দর্শনের মধ্যে, দুটো পৃথক “অপারেটিং সিস্টেমের” মধ্যে। একটি বলে: পৃথিবীর যত সংকট, সবই কেবল বৈশ্বিক সংস্থা আর বহুপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমে সামলানো সম্ভব। অন্যটি বলে: না, ইতিহাস বলছে জাতি-রাষ্ট্রই এখনও বৈধ ক্ষমতার কেন্দ্র এবং শেষমেশ সিদ্ধান্ত, সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা সেখানেই থাকে।
কোনটি ঠিক? উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একটি অদৃশ্য কিন্তু প্রবল মতবাদ আধিপত্য করেছে। বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের মতবাদ। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই যেন একই সুরে গেয়ে উঠেছিল: নিরাপত্তা হোক, অভিবাসন হোক, মহামারী হোক বা জলবায়ু পরিবর্তন হোক, সমাধান আসতে হবে ওপর থেকে, বৈশ্বিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রবেশ এই বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করে মনে হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোই হবে একবিংশ শতাব্দীর কাণ্ডারি।
কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়াল?
বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রতি বছর রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও নেই কোনো বড় অর্থনীতি। রেকর্ড সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত, অভিবাসন সমস্যা অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে ওলটপালট করে দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা এখন সবচেয়ে বেশি। কোভিড মহামারী বৈশ্বিক স্বাস্থ্য শাসনের ফাঁকফোকর অকপটে উন্মোচন করে দিয়েছে। এই তালিকা আরও দীর্ঘ ।
তবু যারা এই ব্যবস্থার প্রবক্তা, তারা প্রশ্নটাই তুলতে রাজি নন। ব্যর্থতার দায় কি এই বৈশ্বিক কাঠামোরই? বরং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আক্ষেপ করেন বহুপাক্ষিকতা “আক্রান্ত” হচ্ছে এবং সতর্ক করেন আরও সম্মিলিত পদক্ষেপ ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সমস্যার শিকড়টা হয়তো ঠিক সেখানেই।
এই বৈশ্বিক স্থাপত্যের জন্ম কোথায়? ইতিহাস বলে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে। দুই কোটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই যুদ্ধ জাতি-রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে দেয়। জন্ম নেয় লীগ অফ নেশনস। সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রথম বড় আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। উড্রো উইলসন স্বপ্ন দেখলেন “ক্ষমতার সম্প্রদায়ের”। কিন্তু সেই লীগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন করে চেষ্টা হলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার প্রধান স্থপতির ভূমিকায়। জাতিসংঘ, আইএমএফ, গ্যাট একে একে তৈরি হলো বৈশ্বিক শাসনের স্তম্ভগুলো। ইউরোপে যেখানে জাতীয়তাবাদ দুটো ভয়ংকর যুদ্ধ ডেকে এনেছিল, সেখানে তৈরি হলো ইউরোপীয় সম্প্রদায়। এই বিশ্বাস নিয়ে যে অর্থনৈতিক পরস্পরনির্ভরতা সংঘাতকে অসম্ভব করে তুলবে। সময়ের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তে থাকল, ডালপালা ছড়াল। কিন্তু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটল একটা বিপজ্জনক পরিবর্তন। এগুলো ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের হাতিয়ার থেকে নিজেদের এজেন্ডাওয়ালা সংস্থায় পরিণত হলো, জবাবদিহিতার বাইরে।
বৈশ্বিক কাঠামোর একটা মৌলিক সমস্যা আছে, যেটা অনেকটা ইংরেজি ভাষার “passive voice”-এর মতো: এটি সুবিধামতো দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে, প্রকৃত কারণকে ঝাপসা করে রাখে। জটিল আমলাতন্ত্রের জালে সত্যিকারের কর্মকাণ্ড থমকে যায়। এমনকি বৈশ্বিকতার সমর্থকরাও স্বীকার করেন যে আন্তর্জাতিক আলোচনা প্রায়ই কর্মকর্তাদের সভা, পদ্ধতি আর নিয়মের গোলকধাঁধায় গিয়ে আটকে পড়ে। ফলাফলের দিকে মনোযোগ সরে গিয়ে মনোযোগ পড়ে প্রক্রিয়ার উপর।
একটা সহজ সত্য আছে যেটা অনেকে মানতে চান না। সমস্যা তৈরি করে রাষ্ট্র (তাদের শিল্প দূষণ ঘটায়), সেই সমস্যা ভোগ করে রাষ্ট্রের নাগরিক (তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়), আর সমাধানের সম্পদ থাকে রাষ্ট্রের হাতেই (রাজস্ব, অবকাঠামো, পরিষেবা)। তাহলে সমাধানের কাঠামো কেন রাষ্ট্রের বাইরে খুঁজতে হবে?
২০১০-এর দশকে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো জনমানসে ফুটে উঠতে শুরু করে। ব্রেক্সিট ছিল তার একটি স্পষ্ট প্রকাশ। ইউরোপ জুড়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান বিরক্তি তৈরি হচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করলেন, যদিও শুরুটা তার আগেই হয়েছিল।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে আসা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে “শান্তি বোর্ড” গঠনের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক সাহায্য হ্রাস এগুলো নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এই সব পদক্ষেপের নিচে একটা সুসংগত যুক্তি আছে: বৈশ্বিক-অগ্রাধিকারের গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ জানানো।
চীনের উদাহরণটা এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এই বিশ্বাস নিয়ে একীভূতকরণ তাকে নমনীয় করবে, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনে অভ্যস্ত করবে, ধীরে ধীরে উদার শৃঙ্খলার দায়িত্বশীল অংশীদার বানাবে। হলো উল্টোটাই। চীন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবেশাধিকার ব্যবহার করে ধনী হলো এবং সেই শৃঙ্খলাকেই হুমকির মুখে ফেলল।
এটা কেবল চীনের কাহিনি নয়। এটা বৈশ্বিক মডেলের কাহিনি, যেটা ধরে নিয়েছিল পরস্পরনির্ভরতাই শান্তি আনে, বাণিজ্যই মূল্যবোধ পরিবর্তন করে। বাস্তব অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইতিহাসের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে একটা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। বৈশ্বিক সহযোগিতা কি অপ্রয়োজনীয়? না, তা নয়। কিন্তু বৈশ্বিক সংস্থাকে জাতি-রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে ভাবা কি ঠিক হয়েছে? বহু দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, ফলাফল পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্রগুলো সরাসরি দায়িত্ব নেয়, কার্যকর জোট বাঁধে এবং জবাবদিহিতার কাঠামো স্পষ্ট থাকে। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তারা যখন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হওয়ার ভান করে, তখন আসলে দায়বদ্ধতার শূন্যতা তৈরি হয়।
জলবায়ু সংকট, মহামারী, সংঘাত এগুলো মোকাবিলায় বৈশ্বিক আলোচনার চেয়ে রাষ্ট্রীয় সংকল্প আর পারস্পরিক চুক্তির ফলাফল অনেক বেশি বাস্তব হয়েছে। যে দেশগুলো নিজেদের শিল্প রূপান্তর করেছে, নিজেদের সীমান্ত পরিচালনা করেছে, নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে তারাই এগিয়ে আছে। বৈশ্বিক কাঠামো ভাঙা দরকার, এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু সেই কাঠামো যদি দায়বদ্ধতা ছাড়া স্ফীত হতে থাকে, যদি রাষ্ট্রের সম্পদ শুষে নিয়ে ফলাফল না দেয়, তাহলে তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
একুশ শতকের সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জলবায়ু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহামারী এগুলো মোকাবিলায় নতুন একটি ভারসাম্য দরকার। যেখানে বৈশ্বিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র। যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হবে রাষ্ট্রের হাতিয়ার, রাষ্ট্রের প্রভু নয়।
বৈশ্বিক মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা অনেক দশক পার করে দিয়েছি। এবার হয়তো সময় এসেছে বাস্তবের মাটিতে পা রাখার।
