আরব নিউজ-এ হাসান আল মুস্তাফার লেখা
ভাষান্তর সাইফুল খান
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ইসলামি বিপ্লব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী একজন বিশ্লেষক হিসেবে বলা যায়, রুহুল্লাহ খোমেনির প্যারিস থেকে তেহরান প্রত্যাবর্তনের ৪৭তম বার্ষিকী এবার আগের সব বছর থেকে স্পষ্টতই ভিন্ন। এই উপলক্ষটি এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এই ব্যবস্থাই একদা মধ্যপ্রাচ্যের নীতি ও অগ্রাধিকার পাল্টে দিয়েছিল, মোহাম্মদ রেজা পাহলভির মুকুট খোমেনির পাগড়ির কাছে হেরে গিয়েছিল এবং ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে প্রকাশ্য শত্রুতার পথ বেছে নিয়েছিল।
বর্তমান ইরান এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশটির ওপর চাপের মাত্রা এখন তার সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে: একদিকে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি, অন্যদিকে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিনিয়োগ, জ্বালানি রপ্তানি এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী বাণিজ্য পরিচালনার পথ রুদ্ধ করছে। অভ্যন্তরীণ চিত্রও উদ্বেগজনক। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামাজিক সমস্যা চরম আকার ধারণ করছে। মাঝে মধ্যেই বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে, যার অনেকগুলোই পৌঁছে যাচ্ছে সংঘর্ষ ও সহিংসতার পর্যায়ে।
তেহরান-তেলআভিভ-এর ১২ দিনের সামরিক সংঘর্ষের সময় ইরানের গোয়েন্দা কাঠামোর যে বড় ধরনের দূর্বলতা স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল, তাও উপেক্ষা করার উপায় নেই। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, মোসাদের প্রত্যক্ষ বা স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে দেশটির সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে শাসকগোষ্ঠীকে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ৪৭ বছর বয়সী এই বিপ্লবের পটভূমিকায় শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছেন, ইরানকে এখন স্পষ্ট দ্বিমুখী পছন্দের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন: কূটনৈতিক চুক্তি, না অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত নৌবহরের মুখোমুখি হওয়া।
এই সমস্ত কিছুর মাঝে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো ইরান কোন পথে যাচ্ছে, কোন পথটি তারা বেছে নেবে?
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই পরিবর্তন ইরানি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণের সামর্থ্যকে পরীক্ষা করছে। বৈধতার উৎস কি বিপ্লবী সংহতি ও বাহ্যিক দ্বন্দ্ব থেকে সরে গিয়ে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর দাঁড়াবে? এই রূপান্তর এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক সম্পর্কের জটিল কাঠামো কর্তৃক আরোপিত এক অনিবার্যতা।
বিপ্লবের বার্ষিকীর ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, “জাতীয় শক্তি” কেবল অস্ত্রের উপর নির্ভর করে না; বরং সর্বোপরি এটি সমাজের ধৈর্যধারণের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। খামেনেই এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, রাষ্ট্র “অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ফ্রন্ট”কেই প্রধান নিরাপত্তা বলয় হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই ঐক্যের মাধ্যমেই বৈধতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি তখনই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যখন “ধৈর্যধারণ” নামক বিষয়টি মধ্যবিত্তের জন্য দৈনন্দিন বোঝায় পরিণত হয় এবং ইরানি রিয়ালের ক্রয়ক্ষমতার পতনের ফলে সৃষ্ট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও নিম্ন আয়ের মানুষের অসন্তোষ বারবার সামাজিক পরীক্ষার সম্মুখীন করে।
কর্তৃপক্ষ এসব জন-আকাঙ্ক্ষা মোকাবিলা করছে ‘প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণ’ নীতির মাধ্যমে, যা জনজীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং বিক্ষোভের ঢেউ প্রতিরোধে সক্ষম। এই পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্যার মূলে না যাওয়া যাচ্ছে এবং ইরানিরা দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব উন্নতি অনুভব না করছে, ততক্ষণ টেকসই সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে না।
ইরান আজ গভীরভাবে জড়িত সামাজিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে পরস্পর সংযুক্ত। এই সমস্যাগুলো আর কেবল উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা ও “কৌশলগত ধৈর্যের” মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ এগুলো নাগরিকদের মর্যাদা ও দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদার সাথে সরাসরি জড়িত। ইরানি নীতিনির্ধারকরাও অর্থনৈতিক অবস্থার গুরুত্ব এবং এর বিপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এই কারণেই তেহরান ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার চাপ কমানোর চেষ্টা করছে, একই সাথে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা বন্ধে নিজস্ব লালরেখা বজায় রাখছে।
রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং এই বিষয়ে যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত; একই সাথে তারা বাইরের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে এবং সংলাপ ও কূটনীতির জানালা খোলা রাখে। তবে এই জানালা দিয়ে আগের মতো সময়ক্ষেপণের পন্থা অবলম্বন করা চলবে না; বরং এটি একটি গুরুতর ও প্রকৃত কাঠামো দাবি করে, যাতে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রকৃত বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের আগুন ঠেকানো যায়। এই অগ্নিকাণ্ড বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার দুয়ার খুলে দেবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ইরানের আরব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এই ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নিতে দেখতে চায় না এবং তারা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ যুদ্ধ নয়, বরং সংলাপ হয়।
ইরানের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারিত হবে মূলত তিনটি সমান্তরাল পরিবর্তন সফলভাবে বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হ্রাস এবং উপসাগরীয় ও অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক একীকরণ জোরদার করা।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে টেকসই বৈধতার ভিত্তি হিসেবে সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, বিপ্লব রপ্তানির নীতি থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে আঞ্চলিক সুপ্রতিবেশী নীতি গ্রহণ করা।
এই তিনটি প্রেক্ষাপট ইরানি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ছাড়া ইরান চিরকাল মার্কিন চাপের মুখে টিকে থাকার চেষ্টারত একটি রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে, যার দিকে ইসরায়েল নতুন যুদ্ধের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে তাকিয়ে থাকবে। এটি তখনও সীমিত উৎপাদনের অসমর্থ একটি দেশ হিসেবেই বিবেচিত হবে। এটাই হলো সেই “বিপ্লব”-এর ট্র্যাজেডি, যে বিপ্লব এখনও পূর্ণ অর্থে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি। এই রূপান্তরকে আঞ্চলিক দেশগুলো সমর্থন করে এবং কামনা করে, কারণ এটি ইরানের জনগণের এবং দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব-ক্লান্ত একটি অঞ্চলের মানুষের স্থায়ী নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করবে।
হাসান আল-মুস্তফা, সৌদি লেখক ও গবেষক, ইসলামি আন্দোলন, ধর্মীয় বক্তৃতার বিবর্তন এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) রাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন।
