নয়াখবর
সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইরান ছাড়া কি চীন রাশিয়ার চলে

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬ ৮:১০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সাইফুল খান

চীনের মহাপরিকল্পনা এবং রাশিয়ার অস্তিত্বের লড়াইয়ে কেন ইরান এত জরুরি
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ইরান কি কেবল ইসরায়েলের জন্যই হুমকি! সেটাই বেশি দেখানো হয় আমাদের। কিন্তু পশ্চিমাদের কাছে ইরানের আরেকটা গুরুত্বও আছে। চীন ও রাশিয়ার সক্ষমতার কেন্দ্রে দাড়িয়ে আছে ইরান। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের মুখোমুখি। এরকম পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ইস্যুর বাইরে গিয়ে দেখতে চাই রাশিয়া ও চীনের কাছে ইরানের গুরুত্ব কেমন।

মানচিত্রে একবার চোখ বোলান। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া আর ককেশাস। এই চারটি অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে একটি দেশ। দেশটির নাম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান। চীন চায় সিল্ক রোডের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে। রাশিয়া চায় ইউরোপের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে বাঁচতে। দুটো লক্ষ্যই এসে আটকে যায় একটি জায়গায়, ইরানে।

এটি বন্ধুত্বের গল্প নয়। এটি বাধ্যবাধকতার গল্প। তিনটি দেশ তিনটি আলাদা কারণে একে অপরকে প্রয়োজন অনুভব করে এবং সেই চাহিদার কেন্দ্রে থেকে ইরান হয়ে উঠেছে আধুনিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাঁড়িপাল্লা।

চীনের মাথাব্যথা মালাক্কা ডিলেমা

চীনের সবচেয়ে বড় ভয়টা সমুদ্রে। প্রতিদিন প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করতে হয় দেশটিকে। এর বড় একটা অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, মালাক্কা প্রণালী পেরিয়ে। সমস্যা হলো, এই সরু জলপথে সবসময় ঘুরে বেড়ায় মার্কিন নৌবহর। যেকোনো বড় সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই প্রণালী বন্ধ করে চীনের অর্থনীতির মুখ থুবড়ে দিতে পারে।

চীনের কৌশলবিদরা এটাকে বলেন ‘মালাক্কা ডিলেমা’। এর একমাত্র সমাধান হলো স্থলপথে বিকল্প তৈরি করা। আর সেই বিকল্প পথের নাম ইরান।

ইরানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস মজুদ এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেল মজুদ রয়েছে। চীন এই ভাণ্ডার থেকে রেয়াতি মূল্যে জ্বালানি পেতে চায় — এবং বিনিময়ে দিচ্ছে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ।

২০২১ সালে চীন ও ইরান একটি ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি সই করেছে। চীন ইরানে অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ তৈরি করবে। বিনিময়ে পাবে সস্তায় তেল-গ্যাস। কিন্তু এর চেয়েও বড় পাওনা হলো ইরানের মধ্য দিয়ে একটি স্থলপথের করিডোর, যা মালাক্কা প্রণালীর বিপদ থেকে চীনকে অনেকটা মুক্ত করবে।
BRI-র ইরানি অংশে রয়েছে চাবাহার বন্দর থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত রেল সংযোগ, বন্দর আব্বাসের উন্নয়ন এবং ইরানের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা। ইরান ছাড়া BRI একটি অসম্পূর্ণ ধাঁধা মাত্র। ঠিক যেন একটি সেতু যার মাঝখানের স্তম্ভটি নেই।

রাশিয়ার জীবনরেখা দক্ষিণের পথ

২০২২ সালের পর রাশিয়ার অবস্থা কল্পনা করুন। ইউরোপের বাজার বন্ধ। SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন। শত শত পশ্চিমা কোম্পানি চলে গেছে। হঠাৎ করেই একটি পারমাণবিক মহাশক্তি দেখল তার চারপাশের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় রাশিয়ার দরকার ছিল দক্ষিণমুখী একটি পথ। ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। এই পথের নাম INSTC বা ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ইরানের বন্দর হয়ে ভারতের মুম্বাই পর্যন্ত এই করিডোর সুয়েজ রুটের চেয়ে প্রায় ৩০% দ্রুত পণ্য পরিবহন করতে পারে। এবং এই পথের মাঝখানে কে? দেশটি ইরান।

শাহেদ ড্রোনঃ যুদ্ধের হিসাব পাল্টে দেওয়া অস্ত্র

সামরিক দিক থেকে রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে একটি সাশ্রয়ী কিন্তু মারাত্মক অস্ত্র। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম যেখানে লক্ষ লক্ষ ডলার, সেখানে একটি শাহেদ ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক হাজার ডলার। কিন্তু ক্ষতি করতে পারে একইভাবে।

ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় এই ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা পেয়েছে। বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে দিচ্ছে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান। যা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাতে ইরানের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার দাবার চাল

রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব রাখতে চায়। কিন্তু সরাসরি সামরিক উপস্থিতি রাখা ব্যয়বহুল। এই কাজটা করে দেয় ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের মিলিশিয়া। এরা সবাই ইরানের অনুগত। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখতে পারছে।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি এই ত্রিভুজ কতদিন টিকবে?

তিন দেশের এই জোটকে ‘অক্ষ শক্তি’ বলা ভুল হবে। কারণ এর মধ্যে আদর্শিক ঐক্য নেই, আছে পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা। চীন, রাশিয়া ও ইরান তিনটি দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার শিকার। এই অভিন্ন শত্রু তাদের একত্রিত রাখছে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে টানাপোড়েনও আছে। চীন পশ্চিমা বাজার হারাতে চায় না, তাই ইরানের সাথে অতি-প্রকাশ্য সম্পর্কে অস্বস্তি আছে তাদের। চীনা ব্যাংকগুলো সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ইরানের সাথে সরাসরি আর্থিক লেনদেন এড়িয়ে চলে। রাশিয়া ও চীনের মধ্য এশিয়ার প্রভাব নিয়েও পর্দার আড়ালে প্রতিযোগিতায় আছে।

ইরানের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সে একটি অসম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। চীন ও রাশিয়া উভয়ই ইরানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। প্রয়োজন ফুরালে কী হবে সেই প্রশ্নটা ইরানের ভেতরেই উঠছে।

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে কি দুই মহাশক্তির হাতিয়ার, নাকি একটি স্বাধীন খেলোয়াড়? চীনের সাথে ২৫ বছরের চুক্তিকে অনেক ইরানি বিশ্লেষক ‘নতুন ধরনের পরনির্ভরতা’ বলছেন। ইতিহাস বলে, বড় শক্তি ছোট অংশীদারকে নিজের প্রয়োজনে বলিদান করতে দ্বিধা করে না।
বিশ্বের বাকি দেশগুলোর জন্যও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। BRI সম্পূর্ণ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্র পাল্টে যাবে। মালাক্কা ও সুয়েজের উপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে। ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি হবে। আর এই সব পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি থাকবে তেহরানের হাতে।

শেষ কথা

ইরান ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর এমন একটি জায়গায় বসে আছে, যেটা দখল না করলে বড় কোনো স্থলপথের মানচিত্র সম্পূর্ণ হয় না। চীনের BRI সেই মানচিত্র এঁকেছে। ইরানকে কেন্দ্রে রেখে। রাশিয়ার বেঁচে থাকার পথ সেটাও ইরানের মধ্য দিয়ে।

এই সম্পর্ক চলবে যতদিন পশ্চিমা চাপ থাকবে, ততদিন। কিন্তু এই ত্রিভুজের ভেতরে যে অসমতা ও অবিশ্বাস রয়েছে, সেটা ভবিষ্যতে একটি বড় ভাঙনের বীজও বহন করছে। ইতিহাস বলে বাধ্যবাধকতার জোট বেশিদিন টেকে না।

লেখক-ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।