সাইফুল খান
ইরানের মিসাইল কর্মসূচি মূলত যুদ্ধের প্রয়োজন থেকেই শুরু হয় এবং সময়ের সাথে ধীরে ধীরে তা পূর্ণাঙ্গ শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এর সূচনা ঘটে ১৯৮০র দশকে, বিশেষ করে ইরান-ইরাক (১৯৮০–১৯৮৮) যুদ্ধ চলাকালে। ওই যুদ্ধে ইরাক সোভিয়েত-নির্মিত স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়। সে সময় ইরানের নিজস্ব কোনো ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ছিল না, ফলে পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বড় ধরনের দুর্বলতার মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫–৮৬ সালের দিকে ইরান প্রথমে লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়া থেকে স্কাড ক্ষেপনাস্ত্র সংগ্রহ করে। পরে উত্তর কোরিয়ার হুয়াসং (Hwasong) সিরিজের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কাজ শুরু করে। এই সময় থেকেই দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
১৯৯০র দশকে ইরান ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতার পথে এগোয় এবং নিজস্বভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করে। এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল Shahab-3, যার সফল পরীক্ষা হয় ১৯৯৮ সালে। প্রায় ১,৩০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার এই মিসাইলটিই ইরানের প্রথম কার্যকর মিডিয়াম রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (MRBM)। এর মাধ্যমে ইরান আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে গবেষণা-নির্ভর উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যায়।
২০০০র দশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে একটি সংগঠিত সামরিক শিল্পে রূপ দেয়। এই সময়ের বড় অগ্রগতি ছিল Sejjil, যার প্রথম পরীক্ষা হয় ২০০৮ সালে। এটি সম্পূর্ণ সলিড-ফুয়েল চালিত এবং প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার। সলিড-ফুয়েল প্রযুক্তি ইরানকে দ্রুত উৎক্ষেপণ, কম প্রস্তুতি সময় এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির সুবিধা দেয়, যা কৌশলগতভাবে বড় অর্জন। একই সময়ে ইরান অসংখ্য শর্ট-রেঞ্জ ও মিডিয়াম-রেঞ্জ মিসাইল সিরিজ যেমন Fateh সিরিয়াল প্রোডাকশনে নেয়। এ পর্যায়ে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প, বিশেষ করে Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) এর তত্ত্বাবধানে গবেষণা, উৎপাদন, পরীক্ষা ও মোতায়েন সবকিছু দেশের ভেতরেই সংগঠিতভাবে পরিচালিত হতে থাকে।
২০১০ এর পর ইরান আরও উন্নত ও নির্ভুল প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হয়। তারা প্রিসিশন-গাইডেড বা উচ্চ নির্ভুল ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করে এবং সলিড-ফুয়েল প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে। ২০২৩ সালে ইরান Fattah নামে একটি হাইপারসনিক মিসাইল প্রকাশ করে। যা তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন মাত্রা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এ পর্যায়ে এসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি শুধু সামরিক প্রতিরোধের উপায় নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি কমপ্লেক্সে পরিণত হয়। যেখানে গবেষণা, নকশা, উৎপাদন ও কৌশলগত পরিকল্পনা সবই সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়।
হাইপারসনিকের দুনিয়ায় প্রবেশ প্রমান করে ইরান মিসাইল প্রযুক্তিতে নিজেকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হাইপারসনিক সাধারনত ইন্টারসেপ্ট করা অসম্ভব।
ইরান ২০২৩ সালে তাদের প্রথম ঘোষিত হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল Fattah উন্মোচন করে এবং পরে উন্নত সংস্করণ Fattah-2 প্রদর্শন করে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এসব মিসাইল ম্যাক ১০–১৫ গতিতে চলতে সক্ষম এবং টার্মিনাল ফেজে (শেষ আঘাতের আগে) ম্যানুভার করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ইন্টারসেপ্টকে প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
প্রথমত, গতি। ম্যাক ১০ বা তার বেশি গতিতে চলা মানে লক্ষ্যবস্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত কিলোমিটার অতিক্রম করতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এই সময়ের মধ্যে লক্ষ্য শনাক্ত, ট্র্যাক, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়। বাস্তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিক্রিয়ায় সামান্য বিলম্বও ব্যর্থতার কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের হাইপারসনিক নকশার মূল শক্তি হচ্ছে ম্যানুভারিং ওয়ারহেড বা গ্লাইড ফেজ। যদি মিসাইল টার্মিনাল পর্যায়ে দিক পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে প্রচলিত ব্যালিস্টিক ট্রাজেক্টরি ধরে আগাম হিসাব করা সম্ভব হয় না। প্রতিরক্ষা রাডার সাধারণত সম্ভাব্য আঘাতের স্থান পূর্বাভাস দিয়ে ইন্টারসেপ্টর পাঠায়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তু মাঝপথে গতিপথ বদলালে সেই হিসাব ভেঙে পড়ে।
তৃতীয়ত, ফ্লাইট প্রোফাইল। প্রচলিত ব্যালিস্টিক মিসাইল মহাকাশের উচ্চ স্তরে উঠে পরে নিচে নামে, ফলে দূরপাল্লার রাডারে আগে থেকেই ধরা পড়ে। কিন্তু হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল বায়ুমণ্ডলের ভেতরে অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় গ্লাইড করতে পারে। এতে পৃথিবীর বক্রতার কারণে স্থলভিত্তিক রাডার অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত করে। শনাক্তকরণে কয়েক সেকেন্ড দেরিও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ক্ষতি।
চতুর্থত, উচ্চ গতির কারণে তাপ ও প্লাজমা স্তর তৈরি হয়, যা রাডার সিগন্যালের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে টার্গেটের সঠিক অবস্থান ও গতিবেগ নির্ণয় জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ইন্টারসেপ্টরকেও সমান দ্রুত এবং অত্যন্ত নির্ভুল হতে হয়। কারণ এখানে “হিট-টু-কিল” প্রযুক্তিতে সামান্য ভুলও মিসে পরিণত হয়।
পঞ্চমত, মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতা ইরানের পক্ষে কাজ করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চল তুলনামূলক ছোট দূরত্বের যুদ্ধক্ষেত্র। ফলে ইরান থেকে ছোড়া হাইপারসনিক মিসাইল কয়েক মিনিটেই লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন Patriot বা THAAD কার্যকর প্রতিক্রিয়ার জন্য খুব সীমিত সময় পায়। বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা থাকলেও এত স্বল্প সময়ের মধ্যে সব স্তর সক্রিয় করা কঠিন।
সব মিলিয়ে, হাইপারসনিক মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করা “তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব” হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ এখানে শুধু গতি নয়, অনির্ধারিত গতিপথ, নিচু উচ্চতায় চলাচল, অল্প প্রতিক্রিয়া সময় এবং উচ্চ-প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সবকিছু মিলেই প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করে দেয়। তাই সামরিক বিশ্লেষণে এগুলোকে প্রায় “গেম-চেঞ্জার” অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও বাস্তব যুদ্ধে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সেন্সর নেটওয়ার্ক, সমন্বিত প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার উপর। এই মিসাইলগুলো ইরান এখনো পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার শুরু করেনি। করলে এর সফলতা ব্যর্থতা বিচার করা যাবে।
একই সাথে সাতটি দেশে মিসাইল হামলা এটা প্রমান করে তাদের ভান্ডারে প্রচুর মিসাইল আছে। নাহলে এই দুঃসাহস করা অসম্ভব৷ মিসাইল প্রযুক্তি ইরানের হাত থেকে তাদের প্রক্সির কাছে পৌছে গেছে। মিসাইল প্রযুক্তি ইরান আসলে শিল্প শুধু নয় কুটিরশিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
